Deepal S05: চার চাকার মহাকাশযান

ছবিঃ ইমরান আবিদ

Deepal—নামটি ভারতীয় শোনালেও গাড়িটি চীনের। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে Changan-এর মধ্যস্তরের বৈদ্যুতিক ব্র্যান্ডটি বাংলাদেশে আসে। এসেই তুলেছিল ঝড়! আক্ষরিক অর্থেই, কেননা তাদের প্রথম উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে।

বাংলাদেশে তারা নিয়ে এসেছে তিনটি গাড়ি— L07 বৈদ্যুতিক সেডান, S07 বৈদ্যুতিক ক্রসওভার, আর এই S05, তাদের Range Extended Electric Vehicle (REEV) ক্রসওভার।

এখন গাড়িটা নিয়ে কথা বলার আগে একটু ব্যাখ্যা করে নেওয়া যাক REEV-টা কী। REEV-টা অনেকটা হাইব্রিডের মতো, কিন্তু তফাৎটা হচ্ছে হাইব্রিডে যেখানে ইঞ্জিনের সঙ্গে চাকার সংযুক্তি থাকে, REEV মূলত একটা বৈদ্যুতিক গাড়ি যার সাথে একটি জেনারেটর লাগানো আছে।

ইঞ্জিনটা এখানে সেই জেনারেটর। বাসায় যেমন কারেন্ট চলে গেলে জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়, তেমনি এই ইঞ্জিনটার কাজ হচ্ছে ব্যাটারির শক্তি কমে গেলে সেটিকে চার্জ দেওয়া।

সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক S07-এর তুলনায় S05-এর নকশায় আগ্রাসী ভাব বেশ কিছুটা কম। ধারালো প্রান্ত ও তীক্ষ্ণ কোণের বদলে এ গাড়িতে ব্যবহার করা হয়েছে মসৃণ বাঁক, তবে অটুট রাখা হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর নকশার দর্শন। সামনের উপরের অংশে রয়েছে LED DRL, আর ফগ ল্যাম্প ও হেডলাইট বসানো হয়েছে নিচে, বাম্পারের ভেতরে। হেডলাইটটি মোটররাইজড, অর্থাৎ কেন্দ্রীয় স্ক্রিনের মাধ্যমে হেডলাইটিকে পাঁচটি ভিন্ন অবস্থানে স্থাপন করা যায়। বাম্পারের ওপর ঠিক মাঝখানে বসানো Deepal-এর ব্যাজ, যার ঠিক নিচেই রয়েছে গাড়িটির অসংখ্য ক্যামেরার একটি। তার ঠিক নিচে রয়েছে গাড়িটির অ্যাকটিভ ভেন্ট, যা পেট্রলচালিত জেনারেটর চালু হলে সেটি ঠান্ডা রাখতে বাতাস টানার জন্য খুলে যায়, আর ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে অ‍্যারোডায়নামিক এফিশিয়েন্সি বাড়ানোর জন্য বন্ধ থাকে।

বৈদ্যুতিক গাড়ি হওয়া সত্বেও, S05-এর কোন ফ্রন্ট ট্রাঙ্ক বা ফ্রাঙ্ক নেই। বড়ং এটি খুললে দেখা যাবে একটি বিশাল প্লাস্টিকের প্যানেল সেখানে ইঞ্জিনটিকে সম্পূর্ণ ঢেকে রেখেছে। Deepal-এর প্রকৌশলীদের পক্ষ থেকে যেন স্পষ্ট বার্তা, “এখানে হাত দেবেন না।” ইঞ্জিনটির সাথে যুক্ত করা আছে অনেক উচ্চ ভোল্টেজের যন্ত্রপাতি, তা অনভিজ্ঞ কেউ খোঁচাখুঁচি করে মুহূর্তেই কয়লা হয়ে যাক, তা স্পষ্টতই Deepal চায় না।

এই আবরণের নিচে রয়েছে ১.৫ লিটারের চার-সিলিন্ডার, ১৬-ভালভ VVT ইঞ্জিন। ইঞ্জিনটি নিজে থেকে ১০০ হর্সপাওয়ার এবং টর্ক ১২০ Nm উৎপন্ন করে। তবে এই ইঞ্জিনের কাজ চাকা ঘোরানো নয়; বরং ২৭.২৮ kWh ক্ষমতার Lithium Ion Phosphate ব্যাটারিটি চার্জ করা। সেই ব্যাটারি শক্তি জোগায় ১৬০ kW-এর একটি ইলেকট্রিক মোটরে, যা উৎপন্ন করে ২১৮ হর্সপাওয়ার ও ৩২০ Nm টর্ক। S07-এর মতো এখানেও পুরো শক্তি যায় শুধু পেছনের চাকায়।

এছাড়া হুডের নিচে অল্প কয়েকটা অ্যাক্সেস প্যানেল আছে—VIN প্যানেল, যার নিচে গাড়িটার চ্যাসিস নাম্বার পাওয়া যাবে। আর ইঞ্জিনের কুল্যান্ট ট্যাঙ্ক। এছাড়া গাড়ির পিচকারি রিফিল ক্যাপটা পাওয়া যাবে তার পাশে।

S05-এর চাকাগুলো ১৮ ইঞ্চি, যা কিনা গাড়িটাকে মাটি থেকে ১৬৯ মিলিমিটার উপরে তুলে রেখেছে। টু-টোন চাকাগুলো এই গাড়িটির মতোই ভবিষ্যৎমুখী বা ফিউচারিস্টিক। ফ্রেমবিহীন দরজায় আছে ঝুলন্ত সাইড মিরর আর লুকানো দরজার হাতল।

ফ্রেমবিহীন দরজাগুলোর পেছনেই আছে গাড়িটির চার্জিং পোর্ট। এটি একটি Type-2 CCS পোর্ট যাতে এসি চার্জার ব্যবহার করলে ব্যাটারি চার্জ হতে লাগবে দুই ঘণ্টা। আর যদি ডিসি চার্জিং ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে লাগবে মাত্র ১৫ মিনিট। সবকিছু মিলিয়ে আপনাকে গাড়িটি NEDC স্কেলে ১৫০ কিলোমিটার রেঞ্জ দেবে। বাস্তবে এটা হয়তোবা আরেকটু কম হবে, ১০০ বা ১২০ কিলোমিটার।

এই চার্জিং পোর্টে আরও আছে Vehicle-to-Load সুবিধাও। অর্থাৎ, প্রয়োজন হলে S05-কে আপনি একটি বিশাল পাওয়ার ব্যাংক এ রূপান্তরিত করতে পারবেন।

আর আপনি যদি গাড়িটা তেলে চালাতে চান, গাড়িটির পেট্রোল ট্যাংকের আকার ৪৪.৯ বা ৪৫ লিটার। ওটার ক্যাপ পাওয়া যাবে উল্টো পাশে। দুটো মিলিয়ে Deepal দাবি করে গাড়িটি ১২৩৪ কিলোমিটার পাড়ি দিতে পাড়বে।

S05-এর পেছনে রয়েছে Deepal-এর পরিচিত নকশার উপাদানগুলো। পুরো প্রস্থজুড়ে বিস্তৃত লাইট বার, আলোকিত ব্র্যান্ডের ব্যাজ, পাখনার মতো তৃতীয় ব্রেক লাইট, পাওয়ারড্ টেলগেট, চারদিকে সেন্সর এবং স্বয়ংক্রিয় ওয়াইপার। বুট খুললে পাওয়া যাবে ৪৬৪ লিটারের জায়গা। সঙ্গে রয়েছে একটি ১২ ভোল্টের চার্জিং পোর্ট আর কেবিন লাইট। মেঝের নিচে রাখা আছে জ্যাক, কম্প্রেসর এবং মেরামতের কিট। তবে অতিরিক্ত টায়ার অনুপস্থিত—সেই জায়গাটি ব্যাটারি দখল করে নিয়েছে।

পেছনের সারির প্রধান আকর্ষণ এর কৃত্রিম চামড়ায় মোড়া সিটগুলি। আসনগুলি শরীরকে চমৎকার সাপোর্ট দেয় এবং পিঠের ওপর চাপ কমানোর জন্য সুনিপুণ ভাবে নকশা করা হয়েছে। দীর্ঘ আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য আছে প্রশস্ত পা রাখার জায়গা। পেছনে যাত্রীদের জন্য রয়েছে কাপহোল্ডারসহ ভাঁজ করা আর্মরেস্ট, দুটি USB পোর্ট, একটি AC ভেন্ট এবং ছাদে একটি বিশাল প্যানারোমিক মুনরুফ। পরিশেষে বিনোদনের জন্য আছে ১৪ স্পিকারের সাউন্ড সিস্টেম।

Deepal-এর গাড়িগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য তাদের প্রযুক্তি, যা চালকের আসনে বসামাত্র স্পষ্টভাবে মনে পড়ে যায়। স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে কোন ইনস্ট্রুমেন্ট ক্লাস্টার বা মিটার নেই। তার বদলে রয়েছে একটি উজ্জ্বল, তথ্যসমৃদ্ধ হেড-আপ ডিসপ্লে। সামনের আসনগুলো বৈদ্যুতিকভাবে এডজাস্ট করা যায়, গরম করা যায়, ঠান্ডা করা যায়। তবে সমস্যাটি হলো সবকিছুই করতে হবে হয় মাঝখানের স্ক্রিনটি দিয়ে বা ভয়েস কমান্ড এর মাধ্যমে। গাড়িটি ফিজিক্যাল বাটনে বিশ্বাস করে না।

দুই আসনের মাঝখানে রয়েছে বিশাল একটি সেন্টার কনসোল। এতে পানীয় ঠান্ডা বা গরম রাখার জন্য এয়ার ভেন্ট রয়েছে, যা গাড়িতে গ্লাভবক্স না থাকার ঘাটতি কিছুটা পূরণ করে। সামনে আছে কাপহোল্ডার ও দুটি ফোন রাখার জায়গা, যার একটি ওয়্যারলেস চার্জারসমৃদ্ধ।

তবে সব মনোযোগ কেড়ে নেয় ১৫.৪ ইঞ্চির “Sunflower” টাচস্ক্রিন। এই স্ক্রিনটি বুঝতে পারে গাড়িতে কে কোথায় বসছে। আর আপনি বসা মাত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার দিকে ঘুরে তাকাবে।

একটু আগেই বলেছিলাম Deepal স্ক্রিন ভালোবাসে, আর সেই স্ক্রিনের ভেতরেই সব ফিচার গুঁজে দিতে আরও বেশি ভালোবাসে। স্ক্রিনের ওপর থেকে নিচে সোয়াইপ করলেই বুট, টেলগেট, দরজাসহ বিভিন্ন ফিচারের দ্রুত নিয়ন্ত্রণের মেনু পাওয়া যায়। আরও ঘাঁটাঘাঁটি করলে Pet Mode, ভয়েস কমান্ড, Sentry Mode—এমন আরও অনেক কিছু সামনে আসবে। সত্যি বলতে, এসব প্রযুক্তির তালিকা দিতে গেলেই আরও হাজারখানেক শব্দ খরচ হয়ে যাবে। তাই সবচেয়ে ভালো পরামর্শ হলো, একটি টেস্ট ড্রাইভ বুক করুন এবং প্রযুক্তির এই সমুদ্রে ডুবে যান।

রাস্তায় S05 প্রচলিত হাইব্রিড গাড়ির মতো আচরণ করে না। এটি পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো আচরণ করে। এক্সেলারেটর চেপে ধরলে গাড়িটির ঘণ্টায় শূন্য থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র আট সেকেন্ড। গাড়িটির শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা অসাধারণ, তীব্রগতির মধ্যেও বাহিরের শব্দ শোনা যায় না। সাসপেনশনের সেটিংসও প্রশংসনীয়। রাস্তার গর্ত ও উঁচুনিচু অংশ চাকাগুলি সামলে নেয় স্বাচ্ছন্দে।

শব্দ নিরোধক ব্যবস্থার সঙ্গে এই আরামদায়ক সাসপেনশন মিলে এমন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যাতে মনে হয় গাড়িটি আসলে যত দ্রুত ছুটছে , তার চেয়ে ধীরে চলছে—বিশেষ করে এক্সপ্রেসওয়েতে।

যাত্রীদের নিরাপদে রাখতে S05-এ রয়েছে সক্রিয় নিরাপত্তা প্রযুক্তির পূর্ণ প্যাকেজ। অ্যাডাপটিভ ক্রুজ কন্ট্রোল, লেন-কিপ অ্যাসিস্ট, স্পিড কন্ট্রোল এবং চারপাশে এয়ারব্যাগ—সবই রয়েছে। সঙ্গে আছে একটি মজার Summon ফিচার। চাবির রিমোটের নিয়ন্ত্রণগুলো বুঝে নিতে পারলে, আঁটসাঁট জায়গায় গাড়িটি নিজে থেকেই পার্ক করতে পারবে।

পরিশেষে সবচেয়ে বড় খরচটা নিয়ে কথা বলা যাক—গাড়িটির দাম। S05 যখন প্রথম বাংলাদেশে আসে, তখন তার দাম ছিল ৫৩ লাখ টাকা। এখন নতুন ট্যাক্স স্ট্রাকচারের আন্ডারে এটির দাম হয়েছে ৪৯.৫০ টাকা।

মোদ্দা কথা আপনি যদি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ঠাসা একটি গাড়ি চান, আর সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও দ্বিধাগ্রস্থ, তাহলে S05 আপনার জন্য সঠিক সমাধান হতে পারে। হ্যাঁ, এই গাড়ির প্রযুক্তি বুঝতে দু-একটা ক্লাস করা লাগবে। কিন্তু চীনা ব্র্যান্ডের ব্যাজ নিয়ে যদি আপনার কোন অ্যালার্জি না থাকে, আর আপনি সহনীয় দামে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি অভিজ্ঞতা করতে চান, তাহলে Deepal S05-কে একবার টেস্ট ড্রাইভ দিয়ে আসুন।

রাহবার আল হক

অটোমোবাইল সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিতে রাহবার আল হকের রয়েছে ১০ বছরেরও বেশি সময়ের পথচলা। দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS), দ্য টারবাইন এবং অটোড্রাইভ বিডি-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মে সম্পাদকীয় পরিচালনা, নতুন কনটেন্ট টিম গড়ে তোলা এবং টেস্ট ড্রাইভের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

Next
Next

জন্ম চায়নায়, স্বভাবে ফরাসী, গতি বিদ‍্যুতের: JMEV Elight