জন্ম চায়নায়, স্বভাবে ফরাসী, গতি বিদ্যুতের: JMEV Elight
ছবিঃ ইমরান আবিদ
একটি ছবি আঁকা যাক।
তেলের পাগলা ঘোড়া দামে আপনি অতিষ্ঠ। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তেলচালিত আর কিছু চালাবেন না, সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক কিছু কিনবেন। কিন্তু আপনি ছোট হ্যাচব্যাক বা বিকট ক্রসওভারে আগ্রহী নন। আপনি সেডান ভক্ত এবং আপনি সেডানই কিনবেন। বাজেট ৫০ লাখ।
আপনার কাছে দুটো অপশন আছে— প্রথমটা BYD-র Seal 6। দেখতে কিছুটা জার্মান, চাকা ঘোরে পেছনে, চালাতে বেশ মজা। কিন্তু প্রযুক্তিতে গাড়িটা একেবারেই সাদামাটা। আর ১ লাখ টাকা বাজেট বাড়ালে আপনি পেয়ে যাবেন একটি JMEV Elight। যাতে আছে ফরাসিদের নকশার ছোঁয়া, অনেক প্রযুক্তি আর কাঁচের ছাদ।
অবশ্যই, প্রথম প্রশ্নটা হবে, "আমি তো BYD-র নাম শুনেছি, JMEV-টা কি?" JMEV একটা চাইনিজ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান—বা দুটি চাইনিজ কোম্পানি আর একটি ফরাসি কোম্পানির শংকর। পুরো নামটা একটু গাল ভরা: Jiangxi Jiangling Group New Energy Vehicle। ২০ বার বললে এক গ্লাস পানি খেতে হবে।
এই দাঁত ভাঙ্গা নামের পেছনের কোম্পানিগুলির একটি হলো বিখ্যাত ফরাসি গাড়ি নির্মাতা Renault। আর আপনি যদি ফ্রান্সের গাড়িগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে থাকেন তবে খেয়াল করবেন, এই গাড়িতে সেই গাড়িগুলোর মত অনেকগুলি বিদঘুটে বৈশিষ্ট্য আছে।
সোজা কথা, গাড়িটির উৎপত্তি ফ্রান্সে, তৈরি হয়েছে চীনে।
চেহারাটা নিয়ে শুরু করা যাক। Elight লুকানোর কোন চেষ্টাই করেনি যে এটি একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি। এর সামনে কোনো বিশাল গ্রিল নেই, আছে ব্যাটারি ঠান্ডা করার জন্য একটি ছোট খোলা অংশ। তার উপরে আছে একটা ক্যামেরা, একগাদা পার্কিং সেন্সর, আর JMEV-র কাত করা ব্যাজ। দুপাশে দুটি ঝরনা আকৃতির LED DRL, যা হেডলাইট দুটিকে ঘিরে রেখেছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি হওয়া সত্ত্বেও Elight-এ কোনো ফ্রাঙ্ক (Frunk) বা ফ্রন্ট ট্রাঙ্ক নেই। তবে আপনি যখন হুডটা খোলার চেষ্টা করবেন, আপনি এই গাড়ির ফরাসি পরিচয়টা টের পাবেন। কোন একটা বিচিত্র কারণে এই এই গাড়ির ট্রাঙ্ক রিলিজটা প্যাসেঞ্জার সাইডে ড্যাশবোর্ডের নিচে লুকানো। বলাবাহুল্য, আগে থেকে জানা না থাকলে প্রয়োজনের সময় খুঁজে পেতে আপনার ঘাম ছুটে যাবে।
তারপর আবার আপনি যখন হুডটা তুলতে যাবেন—তখনই টের পাবেন অন্য ১০টা গাড়ির মতো এখানে কোনো টান দেবার রিলিজ লিভার নেই, আছে চাপ দেবার। মন্দের ভালো হলো, ভেতরে একটা গ্যাস স্ট্রাট আছে, অর্থাৎ হুডটি দাঁড় করিয়ে রাখতে আপনাকে ডান্ডা খুঁজতে হবে না।
হুডের নিচে দেখার তেমন কিছু নেই। পুরো অংশটি একটি বিশাল প্লাস্টিকের প্যানেলে ঢাকা। প্যানেলটা সরালে দেখতে পাবেন গাড়িটির বৈদ্যুতিক মোটর, যা সামনের চাকায় ১৫৮ হর্স পাওয়ার এবং ২২৫ পাউন্ড-ফুট টর্ক পাঠায়।
বাম পাশ ঘুরলেই আপনি সামনের চাকার উপর দেখতে পাবেন গাড়িটির চার্জ পোর্ট। আর অন্য ১০টা গাড়ির মতোই আছে একটা Type 2 CCS চার্জ পোর্ট। যা DC চার্জিং ব্যবহার করলে গাড়িটির ৬৩ কিলোওয়াট ব্যাটারিটিকে আধা ঘণ্টার মধ্যে ৮০ ভাগে নিয়ে যাবে। আর আপনি যদি AC চার্জিং ব্যবহার করেন, ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা।
এই ব্যাটারির দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা নির্ভর করে আপনি কোন রেটিং সিস্টেম ব্যবহার করছেন তার উপর। চায়না (CTLC) রেটিংয়ে আপনি পাড়ি দিতে পারবেন ৫৫০ কিলোমিটার। কিন্তু আরো বাস্তবসম্মত ইউরোপিয়ান (WLTP) রেটিং এ যেতে পারবেন ৪৬৮ কিলোমিটার। আর ঢাকার ট্রাফিক যদি গোনায় ধরি, তাহলে আরেকটু কমবে—৩৫০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার।
পোর্টটির নিচেই রয়েছে রয়েছে ১৭ ইঞ্চির অ্যালয় হুইল, যার সাহায্যে গাড়িটির গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স প্রায় ১৭০ মিলিমিটার। সাইড মিররগুলো ঝুলন্ত আর দরজার হাতলগুলো হাতল গুলো লুকানো। গাড়িটি আনলক করলে চারটি হাতল ঢেঁকির মতো উঠে আসে।
সেডান গাড়ি হওয়া সত্ত্বেও গাড়ির পেছনটা লিফটব্যাগের মতো। সেটা অবাক হওয়ার কিছু না, কারণ এই গাড়িটা যখন নকশা করা হয়েছিল তখন Tesla Model 3 পুরো দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। আমার ধারণা, গাড়ির ডিজাইনারকে বলা হয়েছিল, "একটা টেসলার মতো গাড়ি বানিয়ে দাও।"
পরিশেষে, পেছনে রয়েছে দুটি বিশাল টেল লাইট। লাইটগুলোর সাথে কোন সাদা রিভার্স লাইট নেই, সেটি বসানো হয়েছে মাঝখানে, বাম্পারের একেবারে নিচে। তার উপরেও রয়েছে আরো কিছু সেন্সর। আর একেবারে উপরে আছে একটি তৃতীয় ব্রেক লাইট।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, গাড়িটিতে কোথাও Elight ব্যাজটি নেই। তার বদলে আছে একটি GSE ব্যাজ। এর কারণ এই গাড়িটি বিশ্ববাজারে বিভিন্ন নামে বিক্রি করা হয়। চায়নায় গাড়িটি Yi নামে পরিচিত। রাশিয়াতে এটা GSE, আর বাংলাদেশে এসে এর নাম হয়ে গেছে Elight। তবে কিভাবে GSE ব্যাজটা আমাদের দেশে চলে এসেছে, এটা আমি নিশ্চিত বলতে পারছি না।
ট্রাঙ্কটি খুললে আপনি পেয়ে যাবেন ৪১০ লিটার জিনিসপত্র রাখার জায়গা। দৈনন্দিন বাজার-সদাইয়ের জন্য যথেষ্ট। সমস্যা হচ্ছে প্রবেশপথ নিয়ে। এই গাড়ির লিফটব্যাকের মতন নকশার জন্য ট্রাঙ্কটির লিপটা বেশ উঁচু আর মুখটা কিঞ্চিত সরু। দৈনন্দিন ব্যবহারে এটি তেমন বড় সমস্যা নয়, কিন্তু দূরপাল্লার যাত্রার লাগেজ ভেতরে তুলতে আপনার একটু কষ্ট হবে।
ফ্লোরের নিচে আছে একটি বিপদ সংকেত দেবার ত্রিভুজ, নিরাপত্তা ভেস্ট, টো হুক আর বিশাল টায়ার সিল্যান্ট ক্যান। কারণ আর ১০টা আধুনিক গাড়ির মতোই এটিতে কোনো অতিরিক্ত চাকা দেওয়া হয়নি।
এবার ভেতরে যাওয়া যাক।
JMEV Elight-এর পেছনটা বেশ আরামদায়ক। সিটগুলো একরকম কৃত্রিম চামড়ায় মোড়া। দুটো সিটের মাঝখানে আছে একটা কাপ হোল্ডারসহ হাত রাখার জায়গা। তার ঠিক সামনেই আছে দুটো বাতাসের ভেন্ট আর নিচে আছে একটি ইউএসবি পোর্ট। উপরে আপনি পাবেন দুটো ম্যাপ লাইট বা পড়ার বাতি আর দুটো বিশাল কাঁচের ছাদ, যা দিয়ে আকাশটা পরিষ্কার দেখা যায়।
এছাড়া জিনিস রাখার জন্য রয়েছে দুটো নেটের খোপ, দরজায় আছে ডোর কার্ড। আর বিনোদনের জন্য রয়েছে ছয়টি স্পিকার।
তবে পেছনে কিছু সমস্যাও আছে। দরজায় সুন্দর কৃত্রিম ব্রাশড অ্যালুমিনিয়াম ফিনিশের সাথে পুরো গাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বেশ কিছু চকচকে কালো প্লাস্টিকের ট্রিম, যেগুলোতে খুব সহজেই আঙুলের ছাপ পড়ে যায়। এছাড়া গাড়ির পেছনটা লিফটব্যাক ডিজাইনের হওয়ায়, ছয় ফুটের কেউ সোজা হয়ে বসলে তার মাথা ছাদের সঙ্গে ঠেকে যাবে। যা আমার মতো লম্বা মানুষদের জন্য কিঞ্চিৎ বিরক্তির বিষয়।
প্রযুক্তিগতভাবে Elight-এর চালানোর জায়গাটা বেশ উন্নত। সামনের সিটটা পাওয়ারড, মানে এখানে দুটি বোতাম আপনাকে যান্ত্রিকভাবে সিটটা অ্যাডজাস্ট করতে সাহায্য করবে। বসার পর প্রথমেই আপনার চোখে পড়বে সামনের ৭ ইঞ্চি সম্পূর্ণ রঙিন ডিজিটাল ক্লাস্টারটি। তার পাশেই আছে একটি ১৪.৬ ইঞ্চি ইনফোটেইনমেন্ট স্ক্রিন।
সামনের স্ক্রিনটিতে আছে গাড়ি চালানোর সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য: গতি, রেঞ্জ, টায়ার প্রেশার ইত্যাদি। আর মুল স্ক্রিনটাতে আছে রেডিও, ফোন কানেকশন, মিউজিক, মিডিয়া, গাড়ি সেটিংস ইত্যাদি। এই গাড়ির একটি বড় সমস্যা হল এটাতে কোনো Android Auto বা Apple CarPlay নেই। তবে MA Enterprise দাবি করে এই গাড়িতে একটি ওভার দ্য এয়ার আপডেট করলেই সেগুলো যুক্ত হয়ে যাবে।
Android Auto আর Apple CarPlay-র অনুপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে মোবাইল লিঙ্ক। যা ব্যবহার করা আরেক ঝামেলার ব্যাপার। সুরক্ষার জন্য এই গাড়িতে আছে এক সারি এয়ারব্যাগ, ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা, ব্লাইন্ড স্পট ডিটেক্টর, পার্কিং সেন্সরসহ আরও অনেক কিছু। এমনকি আপনি যদি স্ক্রিনে ৩ডি বাটনটাতে চাপ দেন, তাহলে আপনি গাড়ির একটি ডিজিটাল মডেল দেখতে পারবেন, যেটা আপনাকে পার্ক করতে সহায়তা করবে।
স্ক্রিনটির নিচেইপাবেন দুটো এয়ার ভেন্ট আর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য দুটি নব, আর দুই হালি বোতাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই গাড়িতে টেম্পারেচার বা তাপমাত্রা দেখার জন্য দুটি স্ক্রিন রয়েছে—একটি বোতামগুলোর সাথে, আরেকটি মূল ইনফোটেইনমেন্ট স্ক্রিনে। কেন এটি JMEV করেছে আমার জানা নেই, কিন্তু ধারণা করছি এটা তার ফরাসি উৎপত্তির একটি নমুনা।
তার নিচে আপনি পাবেন একটি লুকানো কক্ষ, যেখানে থাকছে দুটো ইউএসবি পোর্ট, একটি ১২ ভোল্ট প্লাগ আর চাবি রাখার ছোট্ট জায়গা। এর পেছনে আছে গিয়ার লিভার, যেটা কিনা ব্যবহার করতে একটু অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। লিভারটির বাম পাশে আছে ইলেকট্রনিক পার্কিং ব্রেক, অটো স্টার্ট-স্টপ বোতাম। আর ডান পাশে আছে গাড়ির লক আর আনলক বাটন, এবং ড্রাইভ মোড সিলেক্টর। ঠিক পেছনেই আছে একটা মানিব্যাগ বা মোবাইল রাখার জায়গা। পরিশেষে সেন্টার কনসোলে আছে একটা বাতাসের ভেন্ট। অর্থাৎ আপনি যদি এসি চালিয়ে এখানে কিছু রাখেন, তাহলে সেটা ঠান্ডা হয়ে যাবে, বা আপনি যদি হিটার চালান, সেটা গরম হয়ে যাবে।
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এই গাড়িতে কোন ওয়্যারলেস চার্জার নেই। কথাটি সত্য নয়, তবে সেই চার্জারটি খুবই বিদঘুটে এক জায়গায় লুকানো আছে। ঠিক গিয়ার লিভারের নিচে। বলাই বাহুল্য, এটি ব্যবহার করাটাও খুবই বিরক্তির একটা বিষয়। এর আশেপাশের কোণাগুলো কিছুটা ধারালো, তাই সিটবেল্ট বাঁধা অবস্থায় হাত গলাতে গেলে আপনার আঙুলে চিমটি খাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।
পরিশেষে, মাথার উপর আপনি পাবেন দুটো বাতি আর ভ্যানিটি মিরর, যেখানে আপনি নিজের চাঁদবদনটা দেখতে পাবেন।
অনেক কথা হলো, এবার চালানো যাক।
JMEV Elight-এর ড্রাইভিং অভিজ্ঞতাটা সম্পূর্ণ ইউরোপিয়ান। অর্থাৎ ইন্ডিকেটর লিভারটা বাম সাইডে এবং গিয়ার লিভারটা সিকোয়েনশিয়াল। অর্থাৎ আপনাকে টেনে টেনে রিভার্স, নিউট্রাল, ড্রাইভে যেতে হবে। প্রথম দিকেএকটু খটকা লাগতে পারে তবে অভ্যস্ত হয়ে গেলে বিষয়টি আর মাথাতেই আসবেনা।
এই গাড়িটি চালানো শুরু করার পর প্রথম যে জিনিসটা আপনি খেয়াল করবেন, সেটা হচ্ছে আওয়াজ। আরেকটু স্পষ্টভাবে বললে, আওয়াজের অনুপস্থিতি। এই গাড়িটিতে কোনো ইঞ্জিন নেই বলে ইঞ্জিনের নিয়মিত গুঞ্জনটাও নেই। তাই গাড়ির সমস্ত যান্ত্রিক আওয়াজ—ডোর নব, সাইড মিররস—সবগুলো যে কাজ করছে, ওটা আপনি স্পষ্ট শুনতে পাবেন। বাস্তবতা হচ্ছে সাধারণ গাড়িতেও ওই আওয়াজগুলি থাকে, কিন্তু আমরা ইঞ্জিনের আওয়াজের কারণে সেগুলো টের পাই না।
তবে এই গাড়ির আসল মজা এর গতি, বা আরও স্পষ্ট করে বললে, এর গতি তোলার ক্ষমতা।
এই গাড়িতে তিনটি মোড আছে—নরমাল, ইকো আর স্পোর্ট। দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য ইকো মোড যথার্থ। তবে কোনো এক খেয়ালে আপনি যদি গাড়িটাকে স্পোর্ট মোডে দেন, এক্সিলারেটরে চাপ দেওয়া মাত্র গাড়িটি তীরের মত ছুটে 8 সেকেন্ডে ১০০-তে পৌঁছে যাবে।
আর গাড়ির চাকা হুইল স্পিন করতে খুব ভালোবাসে। খুব সহজেই আপনি গাড়ির সামনের চাকাটা স্কিড করতে পারবেন। আপনি যদি ওই আওয়াজে আনন্দ পান তাহলে আপনার বেশ ভালো লাগবে।
এখানে বলে রাখা ভালো, এর মানে এই নয় যে গাড়িটি খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। গাড়িটিতে আছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফোর-হুইল সাসপেনশন, অর্থাৎ যেকোনো বাঁক বা আচমকা টান গাড়িটি খুব সহজেই সামলে নিতে পারে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এই গাড়িটি কোনো স্পোর্টস কার না। এটা দ্রুত গতিতে চালানোর জন্য ডিজাইন করা হয়নি। এটি ডিজাইন করা হয়েছে আরাম করে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাবার জন্য।
তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল। এটি অত্যন্ত হালকা। আপনি খুব সহজেই গাড়িটাকে ডান-বাম করতে পারবেন, এক আঙ্গুল দিয়ে। এবং এর সিটগুলোতেও কোনো বোলস্টারিং নেই। অর্থাৎ আপনি যদি কোনো বাঁক একটু সাহসিভাবে নেন, আপনি সিট থেকে সরে যাবেন। দিনের শেষে এই গাড়ির ডিজাইনাররা চায়, আপনি আরাম করে বসে সোজা রাস্তায় হাইওয়ে দিয়ে ৮০ কিলোমিটার বেগে ছুটে যাবেন। আর আপনার পেছনের প্যাসেঞ্জাররা কাঁচের ছাদ দিয়ে আকাশটা উপভোগ করবে।
আর যদি আপনার আচমকা থামার প্রয়োজন হয়, ব্রেকিং এই গাড়িতে খুবই ভালো। চারপাশে চারটা ডিস্ক আছে, ABS তো আছেই। আর শহরে চলার সময় আপনি যদি রিজেন চালিয়ে দেন, তাহলে আপনার ব্রেক প্যাডেলটা তেমন একটা ব্যবহারের প্রয়োজনই হবে না।
অনেক কিছুই তো শুনলাম। গাড়িটা খুব দ্রুত, চালাতে খুব আরাম। কিন্তু আসল ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলা হয়নি—গাড়িটা কীভাবে আপনাকে টাকা বাঁচাবে? একটু হিসাব করি।
আমাদের দেশে বর্তমানে অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা প্রতি লিটার। আর বাংলাদেশে একটি সাধারণ গাড়ি প্রত্যেক লিটারে ৮ কিলোমিটার যাতায়াত করে। সেটাকে যদি আমরা ভাঙি, তাহলে আমাদের প্রত্যেক কিলোমিটারে ১৫ টাকা ৬২ পয়সা খরচ হচ্ছে।
অন্যদিকে এই গাড়িতে আছে একটি ৬৩ কিলোওয়াট ব্যাটারি। যদি আমরা ক্র্যাক প্ল্যাটফর্ম চার্জিং সলিউশনের ১৯ টাকা পার কিলোওয়াট খরচ হিসেবে ধরি, আমাদের প্রত্যেক কিলোমিটারের খরচ হচ্ছে ৩ টাকা ৪২ পয়সা।
অর্থাৎ এই গাড়িতে আপনার ৪০০ কিলোমিটার যেতে খরচ হবে ১,১৯৭ টাকা বা ১২০০ টাকা। কিন্তু আপনার একটি সাধারণ জ্বালানি চালিত গাড়িতে একই দূরত্ব যেতে খরচ হবে ৭,২১৮ টাকা। অর্থাৎ আপনি যদি এই বৈদ্যুতিক গাড়িতে ৩৫০ কিলোমিটার যাতায়াত করেন আপনার বাঁচবে ৬,০২১ টাকা।
বিষয়টা একটু বড় করে দেখি। ধরুন আপনি বছরে ১২,০০০ কিলোমিটার যাতায়াত করেন। আপনি যদি একটা তেলচালিত গাড়ি ব্যবহার করেন, তবে আপনার বার্ষিক জ্বালানি খরচ হবে ২,৪৭,৫০০ টাকা। কিন্তু আপনি যদি এই বৈদ্যুতিক Elight ব্যবহার করেন, আপনার খরচ হবে ৪১,০৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রত্যেক বছরে আপনার বেঁচে যাবে ২,০৬,৪৬০ টাকা।
তবে হ্যাঁ, অনেকেই হয়তোবা বলবেন যে গাড়ি তো কিনলাম, কিন্তু গাড়িটা নিয়ে তো সব জায়গায় যেতে পারছি না। সেটি সত্য নয়। বাংলাদেশে এখন এমন একটি চার্জিং নেটওয়ার্ক আছে, ক্র্যাক প্ল্যাটফর্ম চার্জিং সলিউশন নামে, যারা মোটামুটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর অনেকগুলো চার্জিং নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। আপনি যদি গাড়িটা নিয়ে দূরে কোথাও যেতে চান, আপনি গাড়ি চার্জ দিতে পারবেন।
তবে ওই ২.৫ লাখ টাকা বাঁচানোর জন্য আপনাকে প্রথমে একটু অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হবে। বাংলাদেশে একটি ছোট আকৃতির সেডানের গড় দাম ৩০ লাখ টাকা। তার চেয়ে এই গাড়িটার দাম একটু বেশি। এটা বর্তমানে ৪৫.৯০ লাখ টাকা। দামটা শুনে হয়তো অনেকেরই ভূরু উঠবে। কিন্তু বাস্তবতা হল, পাঁচ বছর আগেও এই দামে এরকম গাড়ি পাওয়াটা ছিল একটি অকল্পনীয় বিষয়।
পরিশেষে আপনি বলতে পারেন, "বুঝলাম আমার বছরে ২ লাখ টাকা বাঁচবে। কিন্তু আমি ব্র্যান্ডটা চিনি না, আমি জানি না বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির ভবিষ্যৎ কি, আমি ঝুঁকি নিতে রাজি না।"
কথাটা যৌক্তিক। সবকিছু চিন্তা করলে বর্তমানে বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনাতে খানিকটা ঝুঁকি আছে। কিন্তু আপনি যদি ঝুঁকি নেবার সিদ্ধান্তই নিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি কেন এই বিচিত্র গাড়িটি এড়িয়ে যাবেন? গাড়িটা রাস্তায় হবে দুর্লভ, আছে নিজস্ব গল্প, আর কিছু আজব স্বভাব যেগুলো নিয়ে আপনি আপনার বন্ধুদের সাথে হাসতে পারবেন।
আপনি যদি বৈদ্যুতিক যুগের বিচিত্র কিছু নিয়ে ঝুঁকিটা নিতে রাজি থাকেন, তবে একেবারে নাকচ করে দেওয়ার আগে আমি বলবো গাড়িটা একবার টেস্ট ড্রাইভ করে দেখুন। এরপর আপনার সিদ্ধান্ত নিন।