হারিয়ে যাওয়া ৫টি গাড়ির ফিচার
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সাথে সাথে আমাদের চারপাশের অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে। একসময় গাড়ির যেসব বৈশিষ্ট্য বা ফিচারকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিংবা আভিজাত্যের প্রতীক মনে করা হতো, সময়ের বিবর্তনে সেগুলো এখন বিলুপ্তির পথে। স্ক্র্যাপইয়ার্ড বা ভাঙার দোকানে জায়গা করে নেওয়া এমন ৫টি গাড়ি ফিচারের গল্প তুলে ধরা হলো এখানে:
১. কার ফোন (গাড়ির নিজস্ব ফোন)
স্মার্টফোন মানুষের হাতের মুঠোয় আসার আগে, পোর্টেবল সেলুলার ডিভাইস বা ফোন ছিল কেবলই উচ্চবিত্ত ও কর্পোরেট এলিটদের আভিজাত্যের প্রতীক। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত বিলাসবহুল গাড়িগুলোতে ফ্যাক্টরি-ইনস্টলড বা বিল্ট-ইন টেলিফোন থাকাটা ছিল ভীষণ গরিমা ও সম্মানের বিষয়।
তবে মোবাইল ফোনের আকার ও দাম দুটোই কমে আসায়, গাড়ির ভেতরের এই ফোনের আবেদন ফিকে হতে শুরু করে। এরপর ২০০০ সালের শেষের দিকে যখন নেটওয়ার্ক অপারেটররা অ্যানালগ সিগন্যাল বন্ধ করে দেয়, তখন এই কোটি টাকার স্ট্যাটাস সিম্বলগুলো রাতারাতি ড্যাশবোর্ডের প্লাস্টিকের শোপিসে পরিণত হয়।
২. ফুল-সাইজ স্পেয়ার হুইল (অতিরিক্ত চাকা)
সাধারণত গাড়ি নির্মাতারা ক্রেতাদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে গাড়ির ফিচার বদলান। তবে অতিরিক্ত আস্ত চাকার (Spare Tyre) বিদায়টা একটু ব্যতিক্রম। সময়ের সাথে সাথে গাড়ির চাকার আকার যত বড় হয়েছে, ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য বুট স্পেস বা পেছনের ডিকিতে একটি আস্ত চাকা জায়গা দেওয়া ততটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বড় চাকা রাখার ঝক্কি আর চাকার রিমের ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে নির্মাতারা আস্ত চাকার বদলে পাতলা, ছোট আকারের এক ধরণের চাকা দেওয়া শুরু করেন—যাকে বলা হয় "ডোনাট"। কোনো কোনো ব্র্যান্ড তো স্পেয়ার চাকা পুরোপুরি বাদ দিয়ে রান-ফ্ল্যাট টায়ার বা টায়ার সিল্যান্ট কিট দেওয়া শুরু করেছিল, যা চালকেরা একদমই পছন্দ করেননি। বর্তমানে কেবল অফ-রোড বা শক্তপোক্ত ৪x৪ (ফোর-বাই-ফোর) গাড়ি ছাড়া সাধারণ গাড়িতে এই ফুল-সাইজ স্পেয়ার হুইল দেখাই যায়না।
৩. সিডি প্লেয়ার
ঢাকার জ্যামে আটকে থাকা গাড়িগুলোতে এখনো সিডি প্লেয়ারের দেখা মেলাটা খুব সাধারণ ঘটনা হলেও, শোরুমের নতুন গাড়িগুলো থেকে সিডি প্লেয়ার দ্রুত উধাও হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ অবশ্য খুবই যৌক্তিক। ২০১০ সালের শুরুর দিকেই ফিজিক্যাল সিডির জায়গা দখল করে নেয় পেনড্রাইভ বা ইউএসবি স্টিক।
পরবর্তীতে স্মার্টফোন এবং মিউজিক স্ট্রিমিং অ্যাপের জোয়ারে গাড়ির সান-ভাইজারে সিডি গুজে রাখার দিন শেষ হয়ে যায়। যখন ফোনে অনলাইনেই দুনিয়ার সব গান শোনা যায়, তখন আর সিডির ঝামেলা কে পোহায়? গানপাগল মানুষদের মন খারাপ হলেও সত্যি যে, সিডি প্লেয়ার আর গাড়িতে ফিরছে না।
৪. সিগারেট লাইটার
লিস্টের বাকি ফিচারগুলোর বিদায়ে মানুষের আফসোস থাকলেও, এই একটি ফিচারের বিদায়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন সবাই। গত শতাব্দীর শেষভাগেও গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে লাল-গরম হিটিং এলিমেন্ট বের করে সিগারেট ধরানো এবং অ্যাশট্রে পরিষ্কার করাটা ছিল নিয়মিত দৃশ্য। যা চালকের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি গাড়ির ভেতরেও স্থায়ী ক্ষতি করতো।
আধুনিক গাড়িগুলো এই ক্ষতিকর অভ্যাসকে বিদায় জানিয়ে সিগারেট লাইটারের জায়গায় নিয়ে এসেছে ১২-ভোল্টের পাওয়ার সকেট কিংবা হাই-স্পিড ডুয়াল ইউএসবি পোর্ট। এটি যেমন জনস্বাস্থ্যের জন্য ভালো হয়েছে, তেমনি গাড়িপ্রেমীদের জন্যও স্বস্তির। এখন অন্তত সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনার সময় ভেতরের ছাদ বা সিটে কালচে দাগ কিংবা তামাকের দুর্গন্ধের ভয় থাকে না।
৫. পাওয়ার রেডিও অ্যান্টেনা
একটা সময় ছিল যখন গাড়ির বডি থেকে প্রায় ৩১ ইঞ্চির এক বিশাল মেটাল রড বা অ্যান্টেনা বাইরের দিকে উঁকি দিত। এএম/এফএম রেডিও সিগন্যাল ধরার জন্য এই মেকানিক্যাল রডগুলো ছিল অপরিহার্য। এমনকি গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে হাত দিয়ে টেনে এগুলোকে উঁচিয়ে দিতে হতো।
পরবর্তীতে বিলাসবহুল গাড়িগুলোতে এই প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় করা হয়, যেখানে রেডিও চালু করলেই অ্যান্টেনাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজকীয় ভঙ্গিতে ওপরের দিকে উঠে আসত। আধুনিক গাড়িগুলো এখন সেই পুরোনো মেকানিক্যাল রডের বদলে ব্যবহার করছে অ্যারোডাইনামিক "শার্ক ফিন" (হাঙরের পাখনার মতো ছোট অ্যান্টেনা) কিংবা ছোট রবারের এরিয়াল। এগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি কার-ওয়াশ বা গাড়ি ধোয়ার সময় ভেঙে যাওয়ার ভয়ও থাকে না। তবে এটা ঠিক যে পুরোনো সেই রাজকীয় ভাবটা আধুনিক এই শার্ক ফিনে আর পাওয়া যায় না।
মাঝে মাঝে কিছু পুরনো গাড়িতে এমন সব বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যা দেখে মনে হয় গাড়িটি ডিজাইনার ভবিষ্যৎ থেকে নিয়ে থেকে এসেছেন। আর কখনো কখনো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলি এমন ভবিষ্যৎমুখী গাড়ি তৈরি করে যা বাজারের চাহিদা ও সময়ের থেকেও যুগ যুগ এগিয়ে থাকে। এরকম চারটি গাড়ি নিয়ে কিছু কথা বলব আজ।