ফিরে এল Citroën 2CV, দাম হবে ২০ লাখ
ছবিঃ Citroën
পুরোনো ইংরেজি সিনেমায় দেখা হাঁসের মতো গাড়িটার কথা মনে আছে? সেটি আবার ফিরে এসেছে। তবে এবার আর পেট্রল বা ডিজেলে নয়, চলবে বিদ্যুতে।
২০২৬ সালের Paris Motor Show-তে Citroën উন্মোচন করেছে 2CV Concept, ফ্রান্সের জনপ্রিয় সাশ্রয়ী গাড়িটির আধুনিক সংস্করণ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ফরাসি প্রতিষ্ঠানটি “Duck” বা ফরাসী ভাষায় “La Deuche”-কে অত্যন্ত সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক শহুরে গাড়ি হিসেবে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে।
উৎপাদনে গেলে Citroën-এর মডেল তালিকায় এটি ছোট্ট Ami quadricycle এবং C3-এর মাঝখানে জায়গা করে নেবে।
ইতিমধ্যেই এই নস্টালজিয়া নির্ভর নকশার কার্যকারিতা অন্য ফরাসি গাড়ি নির্মাতা Renault দেখিয়েছে। আধুনিক Renault 4, Renault 5 এবং সর্বশেষ Twingo—সবগুলোই পুরোনো নকশার আকর্ষণকে কাজে লাগিয়েছে। এবার সেই নস্টালজিয়াতে ভাগ বসাতে চায় Citroën। তাদের লক্ষ্য এমন একটি গাড়ি তৈরি করা, যেখানে পুরোনো দিনের স্মৃতির সঙ্গে থাকবে কম পরিচালন খরচ এবং শহরে চলাচলের সহজ সমাধান।
নতুন কনসেপ্টটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৭ মিটার বা ১৪৭.৬ ইঞ্চি। অর্থাৎ, মূল 2CV-এর প্রায় ৩.৮ মিটার দৈর্ঘ্যের তুলনায় এটি কিছুটা ছোট। Citroën চায় নতুন গাড়িটি ওজনে হালকা, চেহারায় বন্ধুত্বপূর্ণ এবং যানজটে ঠাসা শহরে সহজে পার্ক করার উপযোগী হোক। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ওজন প্রায় ২,২০০ পাউন্ড। এতে তুলনামূলক ছোট ব্যাটারি ব্যবহার করেও দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য যথেষ্ট রেঞ্জ পাওয়া সম্ভব হবে।
পুরনো দিনের চেহারার সাথে এই গাড়িটিতে ব্যবহার করা হয়েছে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সর্বনিম্ন করার অভিনব কিছু কৌশল। বডিতে ব্যবহার করা হয়েছে চওড়া, সমতল প্যানেল। উইন্ডস্ক্রিনের নিচে আছে সাধারণ এয়ার ইনটেক, আর সামনের ও পেছনে রয়েছে সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য বাম্পার। লক্ষ্য হল, পার্কিংয়ের জায়গা আন্দাজ করতে সামান্য ভুল হলেও মালিককে যেন মেরামতের পেছনে বিপুল টাকা গুনতে না হয়।
নকশায় মূল 2CV-এর চরিত্র ধরে রাখা হয়েছে। গোলাকার বডি, খাড়া উইন্ডস্ক্রিন, বাঁকানো ছাদ এবং উঁচু চাকার খোপ—সবই সেই পুরোনো গাড়িটির কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯ ইঞ্চির স্টিলের চাকা কনসেপ্টটিকে দিয়েছে সাদামাটা চেহারা। আলাদা করে বসানো গোলাকার হেডলাইটে রয়েছে আধুনিক LED লাইটিং, আর পেছনের কালো টেলগেটের মধ্যে বেশ সংযতভাবে বসানো হয়েছে অনুভূমিক LED টেইললাইট।
গাড়ির বনেটেও রয়েছে ঐতিহাসিক TPV বা “Toute Petite Voiture” (খুব খুদে গাড়ী) প্রকল্পের পরীক্ষামূলক গারীগুলির ছোঁয়া, যেখান থেকে আসল 2CV জন্ম হয়েছিল। অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে বাইরে থেকে দৃশ্যমান উইন্ডস্ক্রিন ওয়াইপার, সামনের বডিতে সমন্বিত এয়ার ওপেনিং, পেছনের ছাদের স্তম্ভে সরু ইন্ডিকেটর এবং মূল গাড়ির আদলে তৈরি দরজার হাতল। পুরো নকশাটায় পূর্ণতা দিয়েছে কাপড়ের তৈরি ভাঁজ করা যায় এমন ছাদ।
কনসেপ্টটির রংয়ের নাম “Infra Red”। এতে কমলা, হলুদ ও লালের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ক্লাসিক 2CV Spot-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, গাড়িটির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এর গৌরবময় অতীত। নম্বর প্লেটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে 2CV-এর পরিচিত ডাকনামগুলো তুলে ধরা হয়েছে। উইন্ডস্ক্রিনে থাকা ৪৮, ৯০ এবং ২৬ সংখ্যাগুলো যথাক্রমে ১৯৪৮ সাল—যখন মূল গাড়িটি বাজারে আসে, ১৯৯০ সাল—যখন এর উৎপাদন বন্ধ হয়, এবং ২০২৬ সাল—যখন নতুন কনসেপ্টটি উন্মোচন করা হয়, সেই সময়গুলোকে নির্দেশ করে।
2CV Concept-এর ভেতরেও পুরোনো দিনের আকর্ষণের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন করা হয়েছে। চালকের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সাজানো হয়েছে একটি নলাকার কাঠামোর চারপাশে, যেখানে রয়েছে স্টিয়ারিং হুইল, কন্ট্রোল স্টক এবং গিয়ার বদলানোর প্যাডেল। এর সাথে আছে Citroën-এর Smart Vision Display যা চালকের সরাসরি দৃষ্টিসীমায় প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরে।
আট ইঞ্চির বর্গাকার টাচস্ক্রিনে রয়েছে কমিক বই থেকে অনুপ্রাণিত গ্রাফিকস। এর পাশাপাশি রাখা হয়েছে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য ফিজিক্যাল কন্ট্রোল। গাড়িটিতে আরও রয়েছে Radioën—একটি খুলে নেওয়া যায় এমন রেডিও, যা বহনযোগ্য স্পিকার হিসেবেও কাজ করে। বাজেট গাড়িতে এমন দারুণ ফিচার সত্যিই প্রশংসনীয়। দিনশেষে ড্যাশবোর্ডে ডজনখানেক অনাকাঙ্ক্ষিত ফাংশনে ঠাসা বিশাল স্ক্রিনের চেয়ে এমন দরকারি ও বাস্তবধর্মী ফিচারই তো ক্রেতারা বেশি চান!
কেবিনে সামনে ও পেছনে রয়েছে চওড়া আসন, যাতে ব্যবহার করা হয়েছে Citroën-এর Advanced Comfort প্রযুক্তি। যাত্রী আসনটি বাইরের দিকে সরিয়ে নেওয়া যায়, ফলে গাড়িতে ওঠানামা সহজ হয়। কেবিনের ভেতরে থাকা বিশেষ স্টোরেজ বাস্কেটগুলো প্রয়োজনমতো সহজেই খুলে নেওয়া যায় এবং এগুলোর বেশ কয়েকটি তৈরি হয়েছে 3D প্রিন্টিংয়ের সাহায্যে। নরম ফিতার দরজার হাতল, বেইজ রঙের Bakelite ট্রিম, কাঠ আর বেতের বুনন থেকে অনুপ্রাণিত উপকরণ ইন্টেরিয়রকে দিয়েছে এক অভিজাত রূপ। নস্টালজিয়া ধরে রাখতে আসনের কাপড়েও রাখা হয়েছে মূল 2CV-র সেই আইকনিক চেকার্ড ডিজাইনের আধুনিক ছোঁয়া।
গাড়িটির ভেতরের ছোটখাটো চমকগুলো কিন্তু এখানেই শেষ নয়! দরজার পকেটগুলো বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে ডিম বহন করার জন্য— যা মূল 2CV তৈরির সময় কৃষক গ্রাহকদের দাবি পুরনের জন্য নকশা করা হয়েছিল। প্যাডেলে রয়েছে ব্রেকের জন্য কচ্ছপ এবং অ্যাক্সিলারেটরের জন্য খরগোশের প্রতীক। হর্ন ও বৈদ্যুতিক মোটরের শব্দও মূল গাড়ির কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। উইন্ডস্ক্রিনের নিচে বাতাস চলাচলের ফ্ল্যাপ এবং ছাতার হাতলের আদলে তৈরি গিয়ার সিলেক্টরও ফিরিয়ে এনেছে পুরোনো মডেলের পরিচিত কিছু বৈশিষ্ট্য।
Citroën “universal digital tire twin” প্রযুক্তি নিয়ে Michelin-এর সঙ্গেও কাজ করেছে। এই ব্যবস্থা টায়ারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে এবং রাস্তা ও পরিবেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী গাড়ির আচরণ সামঞ্জস্য করতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ, অন্য এক যুগ থেকে উঠে এসেছে বলে মনে হওয়া গাড়িটির ভেতরেও লুকিয়ে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি।
গাড়িটির সম্ভাব্য প্রারম্ভিক দাম ধরা হয়েছে প্রায় ১৫,০০০ ইউরো, যা আনুমানিক ১৬,০০০ মার্কিন ডলার বা ২০ লাখ টাকা। উৎপাদনে গেলে এটি ইউরোপের সবচেয়ে সস্তা বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোর একটি হতে পারে। Citroën ইউরোপেই গাড়িটি তৈরি করার পরিকল্পনা করছে, আর উৎপাদন শুরু হতে পারে ২০২৮ সালের মধ্যে। ২০২৮ সালের Paris Motor Show-তে উৎপাদন সংস্করণটির আত্মপ্রকাশও সম্ভব, যা হবে মূল 2CV প্রথম প্রকাশের ঠিক ৮০ বছর পর।
এই গাড়ির সাফল্যের জন্য দামটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। সুলভ বৈদ্যুতিক গাড়ি লাভজনকভাবে তৈরি করা এখনও কঠিন, আর পুরোনো নকশার আকর্ষণ দিয়ে সব সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়—বিশেষ করে শেষ পর্যন্ত গাড়িটির দাম বেশি হয়ে গেলে। মূল 2CV-এর জনপ্রিয়তার কারণ ছিল সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী যাতায়াতের ব্যবস্থা করা, দামি লাইফস্টাইলের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা নয়।
আর Citroën-এর মালিকানাধীন বিশাল গাড়ি নির্মাতা গোষ্ঠী Stellantis-এর বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে, এমন একটি সাফল্য তাদের বেশ কাজে আসবে। তবে এই আকর্ষণকে সত্যিকারের স্বল্প ব্যয়ের উৎপাদনযোগ্য গাড়িতে রূপান্তর করতে Citroën কতটা সফল হবে, তা এখনও দেখার বিষয়।
পুরোনো ইংরেজি সিনেমায় দেখা হাঁসের মতো গাড়িটার কথা মনে আছে? সেটি আবার ফিরে এসেছে। তবে এবার আর পেট্রল বা ডিজেলে নয়, চলবে বিদ্যুতে।