নিজস্ব বৈদ্যুতিক গাড়ি চায় Subaru
ছবিঃ Subaru
Toyota-র বৈদ্যুতিক গাড়িতে নিজেদের ব্যাজ ব্যবহার করতে করতে ক্লান্ত Subaru। তাই এবার হাতে নিয়েছে সম্পূর্ণ নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির প্রকল্প।
জাপানি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি এখন নিজস্ব ইলেকট্রিক প্ল্যাটফর্ম, ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক সিস্টেম তৈরি করছে। লক্ষ্য, এমন সব বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করা, যেগুলো প্রতিষ্ঠানটির লেবাস পরা Toyota নয়, বরং সত্যিকারের Subaru হবে।
প্রতিষ্ঠানটির আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ির পরিসর শুরু হয় ২০২৩ সালে Solterra গাড়িটি দিয়ে, যা Toyota bZ4X-এর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এরপর Trailseeker, Uncharted এবং তিন সারির Getaway যোগ করে এই পরিবার বড় করেছে Subaru। মডেলগুলোর আক্ষরিক অর্থেই Subaru ব্যাজ পড়া Toyota হলেও, Subaru-র দাবি, Trailseeker-এর অল-হুইল ড্রাইভ ব্যবস্থা তৈরি এবং ইলেকট্রিক মোটরের কার্যকারিতা নির্ধারণে তাদের প্রকৌশলীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এখন পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চায় কোম্পানিটি।
Automotive News-এর ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, Tokyo-এর উত্তরে একটি পরীক্ষামূলক ট্র্যাকে নতুন প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে Subaru। প্রোটোটাইপটি প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান Outback গাড়িটির ওপর ভিত্তি করে তৈরি
অল-হুইল ড্রাইভযুক্ত প্রোটোটাইপটি ৫১০ হর্সপাওয়ার উৎপাদন করে এবং শূন্য থেকে ৬২ মাইল/ঘণ্টা (১০০ কিমি/ঘণ্টা) গতিতে পৌঁছাতে সময় নেয় মাত্র চার সেকেন্ড। পরিবার, মালপত্র আর দুটো মাউন্টেন বাইক নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার উপযোগী করে নকশা করা একটি গাড়ির কাছ থেকে এমন পারফরম্যান্স সত্যিই চমকপ্রদ।
ছবিঃ LOVECARS!TV!
Subaru-র লক্ষ্য ও বর্তমান বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোর তুলনায় নতুন প্লাটফর্মটি ওজন ১০০ কেজি কমানো। নতুনভাবে নকশা করা সামনের কাঠামো দুর্ঘটনার সময় যাত্রী ও ব্যাটারি—দুটোকেই সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি। সামনের চাকার ওপর দিয়ে বাঁকানো সাপোর্ট আঘাতের সময় সংঘর্ষের শক্তি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেয়। আর ধাক্কার সময় শক্তি শোষণ করতে সামনের ইলেকট্রিক মোটরটি ঘুরে যাওয়ার মতো করে নকশা করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগুলোর বড় একটি অংশ প্রতিষ্ঠিত সরবরাহকারীদের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করছে Subaru। Toyota Group-এর সরবরাহকারী Aisin-এর সঙ্গে ইলেকট্রিক ড্রাইভ ইউনিটি তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালে এই প্রকল্পে হাত দেয় দুই প্রতিষ্ঠান। মোটরগুলো Subaru-এর বর্তমান EV-গুলোর মোটরের তুলনায় ছোট ও হালকা। প্রকৌশলীদের দাবি, নতুন মোটরগুলোর দক্ষতা ৩০ শতাংশ বেশি, অবশ্য কোন মানদণ্ডের তুলনায়, তা স্পষ্ট করেনি তারা।
ব্যাটারি প্যাক তৈরি হচ্ছে Panasonic Energy-এর সঙ্গে, এই সহযোগিতাও শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালে। এতে রয়েছে ৪,০০০টি নলাকার ব্যাটারি সেল এবং এর ওজন Subaru-এর আগের ব্যাটারির তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। কোম্পানিটির লক্ষ্য, গড় মানের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি এনার্জি ডেনসিটি অর্জন। তবে ব্যাটারির ধারণক্ষমতা, গাড়ির রেঞ্জ ও চার্জিংয়ের কার্যকারিতা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
হার্ডওয়্যারের মতো ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাও পাচ্ছে সমান গুরুত্ব। চালক-সহায়তা প্রযুক্তি, চ্যাসিস, পাওয়ারট্রেন ও ইনফোটেইনমেন্ট নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজস্ব সমন্বিত ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিট তৈরি করছে Subaru। ব্যবহার করা হবে AMD-এর সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি একটি বিশেষ চিপ। পাশাপাশি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূর থেকে সফটওয়্যার আপডেট করার সুবিধাও থাকবে।
ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে Subaru-এর EyeSight চালক-সহায়তা ব্যবস্থার সংস্করণগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
Subaru-এর দাবি, প্রোটোটাইপের প্রযুক্তিগুলো তৈরি করতে সময় লেগেছে স্বাভাবিক সময়ের প্রায় অর্ধেক। এর লক্ষ্য, চীনা নির্মাতাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। চিনা কোম্পানিগুলো ক্রমশ নতুন গাড়ি তৈরি ও বাজারজাত করছে। Subaru ভবিষ্যতের পেট্রোল ও হাইব্রিড মডেল তৈরিতেও এই দ্রুত উন্নয়নপদ্ধতি কাজে লাগাতে চায়। ফলে সুবিধাগুলো শুধু ইলেকট্রিক গাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
গাড়ি চালানোর বৈশিষ্ট্যের কারণেও প্রোটোটাইপটি ইতিমধ্যে নজর কেড়েছে। LOVECARS!TV!-তে প্রকাশিত একটি ড্রাইভিং পর্যালোচনায় উপস্থাপক গাড়িটির BRZ-এর মতো দ্রুত বাঁক নেওয়ার ক্ষমতা এবং অল-হুইল ড্রাইভের বাড়তি গ্রিপের সমন্বয়ের প্রশংসা করেছেন। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে গতিসীমা নির্ধারিত রেখে দুই ল্যাপের পরীক্ষায় গাড়িটি বাঁক নেওয়ার সময় বেশ স্থিতিশীল মনে হয়েছে।
সাসপেনশন ব্যবস্থাও যথেষ্ট উন্নত। সামনে রয়েছে ডাবল-উইশবোন সাসপেনশন, আর পেছনে পাঁচ-লিংক ব্যবস্থা। উপস্থাপক গাড়িটিকে ২০২৫ সালের Japan Mobility Show-তে উন্মোচিত Subaru Performance-E STI কনসেপ্টের পেছনের প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক বাহন হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ, প্রযুক্তিগুলো শুধু পারিবারিক ক্রসওভারে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যতে পারফরম্যান্স গাড়িতেও ব্যবহার করা হতে পারে।
নতুন প্ল্যাটফর্মটি প্রথম কোন উৎপাদন মডেলে ব্যবহার করা হবে, তা এখনও নিশ্চিত করেনি Subaru। প্রদর্শিত কিছু প্রযুক্তি ২০২৯ সালের দিকে উৎপাদন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তবে বাজারে আসার নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।
তবে তার মানে এই নয় যে Toyota-এর সঙ্গে অংশীদারত্ব শেষ করছে প্রতিষ্ঠানটি। বরং নিজেদের গাড়ির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে প্রকৌশলগত প্রযুক্তির ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ চায় তারা। Subaru-এর প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী Takatomo Watamori Automotive News-কে বলেছেন, মূল প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকলে ব্র্যান্ডটির স্বতন্ত্র নিরাপত্তাব্যবস্থা ও চালানোর বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা সহজ হবে।
ইলেকট্রিক গাড়ি নিয়ে Subaru-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষা অবশ্য নতুন নয়। তাদের EV তৈরির ইতিহাস শুরু হয় ২০০০-এর দশকে Tokyo Electric Power Company-এর সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি R1e দিয়ে। এরপর ২০০৯ সালে জাপানের বাজারের জন্য ঘোষণা করা হয় Plug-in Stella। পরের মডেলটি সীমিত পরিসরে উৎপাদিত হয়েছিল, তৈরি হয়েছিল প্রায় ১৭০টি গাড়ি।
Subaru-এর মতো আকারের একটি নির্মাতার জন্য নিজস্ব ইলেকট্রিক গাড়ির কাঠামো তৈরি করা বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ। কিন্তু অন্য কোম্পানির প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লে স্বতন্ত্র একটি গাড়ির ব্র্যান্ড শেষ পর্যন্ত কেবল ডিজাইনের খেলায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
সুতরাং Subaru নিশ্চিত করতে চায়, ক্রেতারা যখন তাদের পরবর্তী ইলেকট্রিক গাড়িটি কিনবেন, তখন সেটি যেন শুরু থেকে Subaru-এর প্রকৌশলীদের তৈরি একটি Subaru হয়—অন্য লোগো লাগানো Toyota নয়, যাতে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
Toyota-র বৈদ্যুতিক গাড়িতে নিজেদের ব্যাজ ব্যবহার করতে করতে ক্লান্ত Subaru। তাই এবার হাতে নিয়েছে সম্পূর্ণ নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির প্রকল্প।