সফটওয়্যার সমস্যায় জর্জরিত Toyota

ছবিঃ Toyota

Toyota নিজের সুনাম গড়ে তুলেছে নির্ভরযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে। বছরের পর বছর অবহেলা, প্রশ্নসাপেক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ আর যাচ্ছেতাই রাস্তা পেরিয়েও টিকে থাকার জন্য তদের গাড়িগুলো বিখ্যাত। কিন্তু, আধুনিক Toyota এমন এক ক্রমবর্ধমান সমস্যার মুখোমুখি, যা কিংবদন্তিতুল্য জাপানি প্রকৌশলও উপেক্ষা করতে পারছে না: সফটওয়্যার।

গত কয়েক মাসে সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে কয়েক লাখ গাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব ত্রুটি ডিজিটাল স্পিডোমিটার থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক পাওয়ারট্রেন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। কিছু ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে গেছে গাড়ির ইন্সট্রুমেন্ট ডিসপ্লে, আবার অন্য কিছু ত্রুটির কারণে চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে গাড়ির মোটর।

সর্বশেষ ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩১,০০০টি 2026 Toyota RAV4 Plug-In Hybrid-কে ঘিরে। রিকল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটর জেনারেটরের ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিটে একটি সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে সিস্টেমটি সঠিকভাবে চালু হতে ব্যর্থ হতে পারে। এই ত্রুটি দেখা দিলে চলন্ত অবস্থায় কোন সতর্কতাবার্তা ছাড়াই গাড়ির ইঞ্জিন শক্তি হারাতে পারে অথবা এর হাইব্রিড সিস্টেমটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কোন মোটর জেনারেটরটি আক্রান্ত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে সমস্যার পরিণতি। পেছনের মোটর জেনারেটর বিকল হলে SUV-টি ফেইল-সেফ মোডে চলে যায়। এতে পেছনের চাকার মোটর বন্ধ হয়ে যাবে এবং গাড়িটি শুধু সামনের চাকার সাহায্যে চলতে থাকে। কিন্তু সমস্যাটি যদি সামনের মোটর জেনারেটরে হয় তবে পরিস্থিতি হবে আরও গুরুতর। Toyota-এর পরীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী সামনের মোটরে ক্রটি দেখা দিলে চলন্ত অবস্থায় গাড়িটি সম্পূর্ণভাবে চালিকাশক্তি হারাতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের National Highway Traffic Safety Administration-এর কাছে 26V659000 নম্বরে নথিভুক্ত এই রিকলকে Toyota অভ্যন্তরীণভাবে 26TA22 কোড দিয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য তৈরি গাড়িগুলো। Toyota জানিয়েছে, এখনো পর্যন্ত এ সমস্যা কে ঘিরে তারা সীমিতসংখ্যক প্রতিবেদন ও ওয়ারেন্টি ক্লেইম পেয়েছে। সুখবর হলো; এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা বা আঘাতের ঘটনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সমস্যাটির সমাধান সহজ: ডিলারশিপে গাড়ি নিয়ে গেলে বিনা মূল্যে সফটওয়্যার আপডেট দিয়ে সমাধান করে দেওয়া হবে।

তবে RAV4-ই একমাত্র Toyota গাড়ি নয় যেটি সফটওয়্যার সমস্যায় ভুগছে । সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০,০০০টি 2026 C-HR বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে বিশ্বব্যাপী রিকলের ঘোষণা দেয়। সেগুলোতেও অন্য আরেকটি সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে গাড়িটি চলন্ত অবস্থায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক এই গাড়ির সমস্যাটি রিজেনারেটিভ ব্রেকিং ব্যবস্থায়। ট্র্যাকশন ব্যাটারিতে চার্জের মাত্রা বেশি থাকলে সফটওয়্যারটি রিজেনারেটিভ ব্রেকিংয়ের সময় ব্যাটারিকে তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি চার্জ পাঠিয়ে দিতে পারে। এতে বৈদ্যুতিক ড্রাইভ সিস্টেমটি সুরক্ষার স্বার্থে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং পুরো গাড়িটি নিথর হয়ে পড়ে।

ধারণা করা হচ্ছে সমস্যাটির উৎপত্তি ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি সেল বা ইলেকট্রিক মোটর থেকে নয়, বরং কন্ট্রোল সফটওয়্যারটি ব্যাটারি নিরাপদে কতটা চার্জ গ্রহণ করতে পারবে, তার ভুল ইনপুট। সমাধানের জন্য গাড়িটির Battery Electric Vehicle Electronic Control Unit-এর সফটওয়্যার বিনা মূল্যে আপডেট করে দেওয়া হবে।

C-HR EV গাড়িটি Lexus RZ, Subaru Solterra এবং Toyota-এর bZ মডেলগুলো-এর সঙ্গে একই e-TNGA প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে।এসব গাড়িও 2026 সালে পৃথক একটি রিকলের আওতায় এসেছে। সেখানেও হাই-ভোল্টেজ ব্যাটারির কন্ট্রোল সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে গাড়ি শক্তি হারাতে পারে। একই প্ল্যাটফর্মে সফটওয়্যার-সম্পর্কিত রিকলের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ক্রেতাদের হাতে পৌঁছানোর আগে এই ক্রমবর্ধমান জটিল সিস্টেমগুলো কতটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এরপর রিকলের তালিকায় রয়েছে Camry, Toyota-এর নির্ভরযোগ্য পারিবারিক সেডান। আগস্টে Toyota যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০৮,০০০টি 2025 ও 2026 Camry সেডান ফেরত নেবার ঘোষণা দেয়।

সৌভাগ্যবশত এবারের সমস্যাটি ড্রাইভিং ইউনিট বা চলন্ত অবস্থায় বন্ধ হয়ে যাবার মত বিপদজনক কিছু নয়। কিছু নিম্ন ও মাঝারি ট্রিমের গাড়িগুলোর 7.0 ইঞ্চির ডিজিটাল ইন্সট্রুমেন্ট ক্লাস্টারগুলো গাড়ি চালু হওয়ার সময় সম্পূর্ণ ফাঁকা ডিসপ্লে দেখাতে পারে। অর্থাৎ চালকেরা গাড়ির গতি, সতর্কবার্তার আলো কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখতে পারেন না। এছাড়াও এই ত্রুটির কারণে টার্ন সিগন্যাল, হ্যাজার্ড লাইট এবং ইন্সট্রুমেন্ট ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত সতর্কতামূলক শব্দও প্রভাবিত হতে পারে।

এই রিকলের আওতায় রয়েছে Camry LE, SE এবং Nightshade ট্রিম। XLE ও XSE এতে অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ সেগুলোতে বড় 12.3 ইঞ্চির ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয়েছে। Toyota-এর সমাধান এখানেও একই: ডিলারশিপে বিনা মূল্যে সফটওয়্যার আপডেট ইনস্টল করা।

Camry-এর ত্রুটিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইন্সট্রুমেন্ট ডিসপ্লে নিয়ে Toyota-এর সমস্যা নতুন কিছু নয়। গত ১৪ মাসে Toyota ও Lexus-এর বিভিন্ন মডেলের ডিজিটাল ইন্সট্রুমেন্ট ক্লাস্টার নিয়ে একাধিক রিকল কর্মসূচি ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ সকল রিকলের মধ্যে রয়েছে Land Cruiser ও Mirai-এর মতো গাড়ির ডিসপ্লেও।

ঘটনাগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি প্রবণতা চোখে পড়ে। Toyota হাইব্রিড মোটর নিয়ন্ত্রণ ও রিজেনারেটিভ ব্রেকিং থেকে শুরু করে চালকের ঠিক সামনের ডিজিটাল ইন্সট্রুমেন্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যবস্থায় সফটওয়্যার নিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

তবে এখানে একটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ: সব সমস্যার মূল কারণ এক নয়, আর প্রতিটি রিকলের পেছনে একই সফটওয়্যার সমস্যা দায়ী নয়। RAV4 Plug-In Hybrid, C-HR EV এবং Camry-তে আলাদা আলাদা ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল সিস্টেমে ভিন্ন ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছে।

তবে একটি মৌল বিষয় উপেক্ষা করা কঠিন: আগে যেসব কাজ সরাসরি যান্ত্রিক বা যন্ত্রাংশের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল, এখন সেগুলোর দায়িত্ব ক্রমেই সফটওয়্যারের হাতে চলে যাচ্ছে, আর সেখানেই হচ্ছে সকল সমস্যার উৎপত্তি। একটি আধুনিক গাড়ি আগের যেকোনো সময়ের গাড়ির তুলনায় বেশি সক্ষম। কিন্তু এই গাড়িগুলি জটিল কম্পিউটার নেটওয়ার্কের ওপরও নির্ভরশীল, যেখানে অনেকগুলো সফটওয়্যার একে অপরের সাথে ক্রমাগত যোগাযোগ করে যাচ্ছে। সেই নেটওয়ার্কে যদি সামান্য একটি ত্রুটিও বা ছন্দপতন হয়, সেই ইস্যু ফ্রিজ হয়ে যাওয়া স্ক্রিনের চেয়ে অনেক গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

আর প্রতিটি সমস্যাগুলো সমাধানে Toyota-এর পদ্ধতিও লক্ষণীয়। তিনটি ক্ষেত্রেই বড় ধরনের যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের বদলে সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গাড়ির মালিকদের জন্য এটি সম্ভাব্য ভালো খবর, কারণ মেরামতটি খরচ ও ঝঞ্ঝাট মুক্ত। একই সঙ্গে, আগে যে ত্রুটি সারাতে যন্ত্রাংশ বদলাতে হতো, এখন সেটি কয়েক লাইনের সফটওয়্যার নির্দেশনা পরিবর্তন করেই সমাধান করা সম্ভব।

এছাড়াও এসব প্রতিবেদন থেকে এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায় না যে কোম্পানিটির সব আধুনিক মডেলই নির্ভরযোগ্য নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগুলো নিয়ে বারবার রিকল ঘোষণা একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়; প্রচলিত উৎপাদনমান এখন আর একা যথেষ্ট নয়।

গাড়িতে সফটওয়্যার থাকা উচিত কি না তর্কটি তা নয়। আধুনিক বাজারে বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি তৈরি করা অসম্ভব। আসল চ্যালেঞ্জ হলো, ক্রেতাদের অনিচ্ছুক গিনিপিগ বানানোর আগেই কোড নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

তবে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি Toyota একা নয়। ঐতিহ্যবাহী গাড়ি নির্মাতারা গাড়িতে ইলেকট্রনিক নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ইন্টারফেস আরো হরেক রকম আধুনিক সফটওয়্যার যোগ করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। সমস্যাটি প্রযুক্তি নয়, সমস্যা হচ্ছে প্রত্যেকটি প্রযুক্তি একে অপরের সাথে ঠিকমতো কথা বলছে কিনা তা নিশ্চিত করা। উদাহরণ হিসেবে Volkswagen-এর কথাই বলা যায়। নিজেদের সফটওয়্যার কার্যক্রম ঠিকঠাক করতে কোম্পানিটি কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, তারপরও সহায়তার জন্য নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দ্বারস্থ হয়েছে। Rivian-এর সঙ্গে তাদের অংশীদারত্ব সেই সমস্যা সমাধানেরই একটি প্রচেষ্টা।

এখানে ভাগ্যের পরিহাস টা স্পষ্ট। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা কয়েক দশক ধরে ইঞ্জিন, ট্রান্সমিশন, সাসপেনশন এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়া সুনিপুণভাবে নিখুঁত করে আসছে। অথচ এখন গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করা কোডের কয়েকটি লাইন নিয়ে তাদের হোঁচট খেতে হচ্ছে। নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন তৈরি করা এক বিষয়। আর ডজনখানেক ইলেকট্রনিক সিস্টেমকে নিখুঁতভাবে একসঙ্গে কাজ করানো, সম্পূর্ণ ভিন্ন।

Previous
Previous

Maserati এখনও জাদু দেখাতে জানে

Next
Next

নিজস্ব বৈদ্যুতিক গাড়ি চায় Subaru