অস্ট্রেলিয়ার গাড়ির বাজারে চীনের দাপট
ছবিঃ BYD
যুক্তরাষ্ট্রে আতঙ্ক, ইউরোপে উদ্বেগ—আর এবার চাপ অনুভব করছে অস্ট্রেলিয়া।
দেশটিতে চীনা গাড়ি এখন আর শুধু সস্তা বিকল্প নয়। বিক্রির দৌড়ে জাপান ও থাইল্যান্ডের গাড়িকে একসঙ্গে পেছনে ফেলে দিয়েছে চীনে তৈরি যানবাহন।
VFACTS-এর সম্মিলিত বিক্রয় প্রতিবেদন, Federal Chamber of Automotive Industries (FCAI) এবং Electric Vehicle Council (EVC)-এর পরিসংখ্যান তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার নতুন গাড়ির বাজারের ৩৮.৯ শতাংশ দখল করেছে চীন। বিক্রি হয়েছে ৪২,০৪৫টি গাড়ি। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় গাড়ির প্রধান সরবরাহকারী জাপান ও থাইল্যান্ড সম্মিলিতভাবে বিক্রি করেছে ৪০,৯৩৩টি গাড়ি। কিছুদিন আগেও যে দেশে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের কোন উল্লেখযোগ্য বাজার উপস্থিতিই ছিল না, সেখানে এমন ফলাফল রীতিমতো বিস্ময়কর।
তবে প্রথমবার চীনের গাড়ি এই মাইলফলক অর্জন করল, বিষয়টি তা নয়। ২০২৬ সালের জুনেও দেশটি জাপান ও থাইল্যান্ডকে সম্মিলিতভাবে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সে মাসে চীন থেকে আসা গাড়ি বিক্রি হয়েছিল ৫৫,৩৩১টি, যেখানে দুই দেশ মিলিয়ে বিক্রি করেছিল ৫০,৩৯৫টি। BYD ও Denza-র প্রায় ৫,০০০ গাড়ির একটি বিশেষ চালান ওই ফলাফল অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
তবে সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রবণতা শুধু একটি বিশাল চালানের ফল নয়। চীনে তৈরি গাড়ির তালিকায় এখন Mazda, Hyundai, Kia, BMW ও Mini-র মতো প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মডেলও রয়েছে। Nissan ও Ford-ও এই তালিকায় যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, চীনের কারখানাগুলো এখন আর শুধু দেশীয় ব্র্যান্ডের গাড়ি তৈরি করছে না; বিশ্বের বড় বড় গাড়ি নির্মাতারাও ক্রমেই তাদের উৎপাদনের জন্য এসব কারখানার ওপর নির্ভর করছে।
ছবিঃ Denza
অস্ট্রেলিয়ায় নতুন গাড়ির চাহিদা পূরণে জাপান ও থাইল্যান্ডের তৈরি Toyota HiLux ও Ford Ranger-এর মতো জনপ্রিয় ট্রাক বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে তাদের সম্মিলিত বিক্রিও চীনকে টেক্কা দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
প্রধান গাড়ি সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে পরের অবস্থানে ছিল South Korea। দেশটি থেকে ৯,৮৯২টি গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা আগের তুলনায় ৫ শতাংশ কম। এরপর Germany থেকে বিক্রি হয়েছে ৪,৩০৯টি গাড়ি, যা ১.৭ শতাংশ কম।
অস্ট্রেলিয়ার সামগ্রিক গাড়ির বাজারেও ক্রেতাদের পছন্দে পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন গাড়ির বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৮ শতাংশ বেড়েছে। তবে ইঞ্জিনের ধরন অনুযায়ী চাহিদার পরিবর্তন ছিল আরও উল্লেখযোগ্য। বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বেড়েছে ১১৭.৭ শতাংশ। অন্যদিকে, পেট্রোলচালিত গাড়ির বিক্রি কমেছে ৩৬.২ শতাংশ এবং ডিজেলচালিত গাড়ির সরবরাহ কমেছে ১৮.৪ শতাংশ।
এই পরিবর্তন চীনা নির্মাতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করছে। তাদের অনেকেই বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। সেই প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক দাম কাজে লাগিয়ে তারা প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব বাজারে ক্রেতারা নতুন কোন বিকল্প ব্র্যান্ড বিবেচনা করতে আগ্রহী, সেখানে এই সুবিধা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ছবিঃ MG
এই পরিসংখ্যানে Tesla Model Y Performance ও Polestar 3 বৈদ্যুতিক SUV-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ, দুটি মডেলই Germany অথবা United States থেকে সরবরাহ করা হতে পারে। ফলে এই তুলনার জন্য তাদের উৎপাদনকারী দেশ নির্দিষ্ট করা কঠিন।
এক দশক আগেও V8 ইঞ্জিন আর ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়ার গাড়ির বাজার চীনের দখলে চলে যাওয়ার ধারণাটি একেবারেই অবাস্তব মনে হতো। যুগের পর যুগ ধরে দেশটি ছিল জাপানি গাড়ি, মার্কিন ট্রাক এবং ইউরোপীয় প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের শক্ত ঘাঁটি। এখন চীনে তৈরি গাড়ি বাজারের ক্রমবর্ধমান অংশ দখল করছে।
এককথায় বলতে গেলে, চীন এখন আর অস্ট্রেলিয়ার গাড়ির বাজারের দরজায় এসে কড়া নাড়ছে না; বরং তারা সরাসরি জাঁকিয়ে বসেছে! আর এতদিন ধরে রাজত্ব করে আসা পুরনো নামী নির্মাতাদের এখন নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে অনেক বেশি তৎপর হতে হবে।
চীন থেকে হাইব্রিড গাড়ি আমদানির লাগাম চেনে ধরার একটি উপায় খুঁজে পেয়েছে ইউরোপ। তবে এর মাধ্যমে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের বাজার দখল ঠেকানো যাবে কি না, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।