চীনা হাইব্রিড আমদানিতে লাগাম টানল ইউরোপ
ছবিঃ BYD
চীন থেকে হাইব্রিড গাড়ি আমদানির লাগাম চেনে ধরার একটি উপায় খুঁজে পেয়েছে ইউরোপ। তবে এর মাধ্যমে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের বাজার দখল ঠেকানো যাবে কি না, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।
ইউরোপিয়ৈন ইউনিয়ন (EU) ও চীন একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে, যার আওতায় চীন থেকে প্রচলিত হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানির সীমা বছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার ইউনিট নির্ধারণ করা হয়েছে। EU-এর Trade Commissioner Maroš Šefčovič-এর মতে, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানোর অংশ হিসেবেই চীন ইউরোপে এসব গাড়ির রপ্তানি অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে।
আমদানির এই সীমা প্রতি বছর ৬ শতাংশ করে বৃদ্ধি পাবে। তবে এই কড়াকড়ি শুধু চীনে তৈরি গাড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। European Union-এর ভেতরে তৈরি চিনা হাইব্রিড গাড়িগুলো এই বিধিনিষেধের আওতায় পড়বে না। অর্থাৎ এই নিষেধাজ্ঞা চীনা নির্মাতাদের আমদানির ওপর নির্ভর না করে ইউরোপের বুকেই স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পথে ঠেলে দিল।
ইতোমধ্যেই চীন থেকে আমদানি করা সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর EU-এর আরোপ করা উচ্চ শুল্ক এড়িয়ে চলার বিভিন্ন পথ খুঁজছে চীনা গাড়ি নির্মাতারা। যেহেতু হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক তুলনামূলক কম, তাই ইউরোপে বিক্রি বাড়াতে চাওয়া নির্মাতাদের জন্য হাইব্রিড আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
ছবিঃ BAW
Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপে BYD-এর প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির বিক্রি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রিকে ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, স্থানীয় বাজারের সমীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নীতিমালার সাথে তাল মিলিয়ে চীনা নির্মাতারা কত দ্রুত নিজেদের গাড়ির ধরন ও বিক্রির কৌশল বদলে নিতে পারে।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের ওপর চাপ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। তীব্র প্রতিযোগিতর মুখে Volkswagen Group তাদের ১ লাখ কর্মী ছাঁটাই এবং মডেল লাইনআপ ছোট করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। মূলত আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক দাম দিয়ে চীনা ব্র্যান্ডগুলো বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। ফলে ইউরোপীয় নির্মাতাদের নিজেদের গাড়ির মান, উৎপাদন খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নতুন করে ঢেলে সাজাতে হচ্ছে।
আমদানির এই নতুন সীমা চীনা কোম্পানিগুলোকে ইউরোপে স্থানীয় উৎপাদনের পরিকল্পনা আরও দ্রুত বাস্তবায়নে উৎসাহিত করতে পারে। BYD, Leapmotor ও Xpeng ইতিমধ্যে ইউরোপে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে। অন্যদিকে, Geely ও Changan কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। EU-এর ভেতরে গাড়ি তৈরি করলে চীনা নির্মাতারা চীনে তৈরি হাইব্রিড গাড়ির ওপর প্রযোজ্য আমদানি সীমা এড়াতে পারবে। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার সুযোগও পাবে তারা।
এই সমীকরণে কঠিন অবস্থানে পড়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। তারা আমদানি করা গাড়ির সংখ্যা সীমিত করতে পারে, কিন্তু নিজেদের সীমানার মধ্যে চীনা নির্মাতাদের কারখানা স্থাপন সহজে ঠেকাতে পারবে না। এসব কারখানায় স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদন শুরু হলে বাণিজ্যিক বাধাগুলোর কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যাবে।
ছবিঃ GAC
আপাতদৃষ্টিতে এই চুক্তি ইউরোপীয় নির্মাতাদের কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে চীনা গাড়ি নির্মাতারা ইতিমধ্যে এই অঞ্চলে বিনিয়োগ করছে এবং নিজেদের গাড়ির লাইনআপ স্থানীয় বাজারের উপযোগী করার পাশাপাশি ইউরোপে শক্তিশালী উপস্থিতি গড়ে তুলছে।
EU হয়তো একটি লড়াইয়ে জিতেছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এই বাণিজ্যিক যুদ্ধে তাদের জেতার সম্ভাবনা কম। আমদানি সীমিত করে চীনা গাড়ির অগ্রযাত্রা ধীর করা হয়তো সম্ভব, তবে এতে ইউরোপীয় নির্মাতাদের গাড়ি রাতারাতি সস্তা, বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক কিংবা ক্রেতাদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে না।
চীন থেকে হাইব্রিড গাড়ি আমদানির লাগাম চেনে ধরার একটি উপায় খুঁজে পেয়েছে ইউরোপ। তবে এর মাধ্যমে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের বাজার দখল ঠেকানো যাবে কি না, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।