লুকানো হ্যান্ডেল নিষিদ্ধ করছে চিন

ছবিঃ Nissan

নতুন গাড়ির মসৃণ দরজার হ্যান্ডেলগুলোর খেয়াল করেছেন? যেগুলো বাইরে থেকে প্রায় অদৃশ্য দেখায় আর তাড়াহুড়া করে খোলাটা একটু মুশকিল? চীন সরকার তাদের ওপর চরম অতিষ্ট হয়ে উঠেছে।

২০২৭ সাল থেকে চীনের নতুন আইনে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, দরজা থেকে বেরিয়ে আসা ও আবার ভেতরে ঢুকে যাওয়া হ্যান্ডেলগুলো নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ, কোনো দুর্ঘটনার পর গাড়িতে আগুন ধরে গেলে দরজা যদি বাইরে থেকে দ্রুত খোলা না যায়, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

চীনের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এসব হ্যান্ডেলের ব্যবহার কঠোরভাবে সীমিত করার জন্য খসড়া নিয়ম তৈরি করেছে। ওই তারিখ থেকে নতুন গাড়ির নকশা নিবন্ধনের আবেদন করতে হলে নির্মাতাদের নতুন প্রযুক্তির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জন্য বাড়তি কারিগরি তথ্য ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের নথি জমা দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ সমতল দরজার হ্যান্ডেল, যেগুলো গাড়ির বডির ভেতরে লুকিয়ে থাকে এবং কেবল বৈদ্যুতিক শক্তির সাহায্যে বাইরে বেরিয়ে দরজা খোলার সুযোগ দেয়।

যেসব মডেলগুলোর ইতিমধ্যেই এই ধরনের হাতল ব্যবহার করছে তাদেরও রেহাই নেই। বিক্রির অনুমোদন পাওয়া গাড়িগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি নথি ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের উপকরণ জমা দিতে নির্মাতারা ২০২৭ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত সময় পাবে। China-র বাজারের BMW iX3-এর মতো মডেলও এই নিয়মের আওতায় পড়বে। তবে এর মধ্যে রাস্তায় চলাচল করা গাড়িগুলোর ক্ষেত্রে নির্মাতাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের জন্য আলাদা সময় দেওয়া হবে।

ছবিঃ BYD

এর পেছনের কারণটি ভয়াবহ হলেও বেশ সরল। গত বছর চীনে এমন কিছু প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে গাড়িতে আগুন ধরে যাওয়ার পর আটকে পড়া যাত্রীরা আর বের হতে পারেননি; এমনকি উদ্ধারকারীরাও এই বৈদ্যুতিক দরজার কারণে তাঁদের বের করে আনতে ব্যর্থ হন। যখন প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান, তখন বৈদ্যুতিক দরজা ব্যবস্থা বিকল হওয়া নিছক কোনো নকশাগত ভুল নয়—এটি একটি প্রাণঘাতী ত্রুটি।

প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, বাইরে বেরিয়ে আসা ও দরজা খোলার জন্য সম্পূর্ণভাবে বৈদ্যুতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হ্যান্ডেল নিষিদ্ধ হবে। গাড়ির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও দরজা খোলা সম্ভব হতে হবে। আংশিকভাবে লুকানো এবং বডির ভেতরে বসানো হ্যান্ডেল ব্যবহার করা যাবে, তবে সেগুলো যান্ত্রিকভাবে চালানো সম্ভব হতে হবে এবং হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরার জন্য কমপক্ষে ২.৪ ইঞ্চি বাই ০.৮ ইঞ্চি জায়গা থাকতে হবে।

অর্থাৎ, গাড়ির নকশাকে আধুনিক দেখানোর যথেষ্ট সুযোগ নির্মাতাদের থাকছে। শুধু জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার মতো মৌলিক বিষয়টিকে বৈদ্যুতিক প্রকৌশলের জটিল সমস্যায় পরিণত করা যাবে না। হ্যান্ডেল বডির সঙ্গে সমতল, ভেতরে বসানো কিংবা নিপুণভাবে বডির সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা যেতে পারে। তবে কেউ টান দিলে সেটিকে কাজ করতেই হবে।

একই সাথে চীনা আইন প্রণেতারা আধুনিক গাড়িশিল্পের আরেকটি অহেতুক প্রবণতার বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিচ্ছে: সবকিছু টাচস্ক্রিনে নিয়ে আসা। খসড়া নিয়মে হেড লাইট, উইন্ডস্ক্রিন ওয়াইপার এবং কাচের কুয়াশা দূর করা সহ নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত ফিচারগুলোর ক্ষেত্রে ফিজিক্যাল কন্ট্রোল বা বোতাম রাখার বাধ্যবাধকতা থাকবে। যুক্তিটা স্পষ্ট: উইন্ডস্ক্রিনে কুয়াশা জমলে তা পরিষ্কারে কিংবা হেডলাইট জ্বালাতে চালকদের ডিজিটাল মেনুর ভেতর ঘাঁটাঘাঁটি করে সময় নষ্ট করতে না হয়।

ছবিঃ BMW

প্রস্তাবিত নিয়মগুলো আরও বিস্তৃত। নতুন গাড়ির নিবন্ধনের জন্য নির্মাতাদের অতিরিক্ত ৫১টি বিষয় সম্পর্কে তথ্য দিতে হবে। এর মধ্যে থাকবে সফটওয়্যার ও কাঠামোগত নির্ভরযোগ্যতা, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা, গরম ও ঠান্ডা করার কার্যকারিতা এবং ধুলা ও পানি প্রতিরোধের ক্ষমতা। নতুন ধরনের নকশার গাড়িগুলোকে বাস্তব পরিস্থিতিতে অন্তত ১৮,৬০০ মাইল চালিয়ে স্থায়িত্ব পরীক্ষাও দিতে হবে।

২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হলে এবং কোনো মডেল বাস্তব নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে বলে প্রমাণিত হলে নির্মাতাদের উৎপাদন তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করতে হতে পারে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে রিকল পরিকল্পনাও জমা দিতে হবে।

ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে সেখানে প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এমন নিষেধাজ্ঞা সেই ব্র্যান্ডগুলোর জন্য অস্বস্তিকর হবে, যারা মিনিমালিস্ট নকশাকে নিজেদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। বিশেষ করে Mercedes-Benz এবং Tesla। উভয় প্রতিষ্ঠানই মসৃণ বডি ও ডিজিটাল কন্ট্রোলকে প্রাধান্য দিয়ে এমন নকশা গ্রহণ করেছে, যেখানে কখনও কখনও প্রচলিত ফিজিক্যাল ফিচারগুলোকে গুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে।

Tesla-র জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে বিব্রতকর হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির গাড়ির কেবিন দেখে অনেক সময় মনে হয়, প্রতিটি বোতাম যেন ডিজাইনারের ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রমাণ। এমন প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ফিজিক্যাল কন্ট্রোল রাখার দাবি নিশ্চয়ই সুখকর হবে না। Mercedes-Benz-ও মসৃণ নকশা ও প্রযুক্তিনির্ভর ফিচারে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। গাড়িশিল্পের অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা এসব বৈশিষ্ট্যকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, এমন নিয়ম কোনো প্রতিষ্ঠানই সহজে মেনে নিতে চাইবে না।

ছবিঃ BMW

তবে গাড়ি নির্মাতারা একটি অতি সাধারণ বিষয় ভুলে যাচ্ছেন: কোনো কাজ সফটওয়্যার দিয়ে করা সম্ভব হওয়ার মানেই এই নয় যে, স্পর্শযোগ‍্য বোতাম বিদায় দিয়ে সেখানে স্ক্রিন বসাতে হবে। বাস্তব বোতামের সুবিধা হলো—এটি সরাসরি স্পর্শের অনুভূতি (Tactile feedback) দেয়, স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়েও অনায়াসে ব্যবহার করা যায় এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটি সচল থাকার জন্য গাড়ির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয় না।

বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় পরিচালিত দরজার লক খোলার সুবিধা থাকতে পারে। সবকিছু ঠিকঠাক কাজ করলে মোটরচালিত হ্যান্ডেল দেখতেও সুন্দর লাগে। কিন্তু জরুরি সরঞ্জামের নকশা এমনভাবে তৈরি করা উচিত, যাতে বাকি সব কিছু বিকল হলেও সেগুলো কাজ করে। কোনো দুর্ঘটনার পর হঠাৎ আবিষ্কার করা যে, দরজার হ্যান্ডেলটি বডির ভেতরে ঢুকে হারিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার জন‍্য এর চেয়ে বাজে সময় আর হতে পারে না!

Previous
Previous

ফিরে এল Fiat-এর বিদঘুটে Multipla 

Next
Next

শ্রীলংকার বাজেরে যোগ দিল BYD-র ছোট্ট Racco