খুদে বাহাদুরঃBAW E6 Pudding

ছবিঃ ইমরান আবিদ

বাংলাদেশে গাড়ি পোষাটা অনেকটা গরিবের ঘোড়া রোগের মত। আর বর্তমান তেলের দামে সেই ঘোড়া এখন হাতি হয়ে গেছে। 

আর দামের দিকে তাকালে কারণটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হয় না।

এখন বেশিরভাগ নতুন গাড়ির দাম শুরু হয় ২৫ লাখ টাকা থেকে, আর একেবারে সাধারন ব্র্যান্ড-নিউ মডেলগুলোর দামও ৩৫ লাখের আশপাশে ঘোরাফেরা করে। তার ওপর আছে জ্বালানি খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ ব‍্যয়, প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ যোগাড়, আর দেশের চন্দ্রপৃষ্ঠের মত রাস্তায় গাড়িটাকে সচল  রাখার সার্বিক আর্থিক মানসিক চাপ।

সহজ কথায়, দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি কেনা বা চালানো কেবল টাকা-পয়সাওয়ালা মানুষেরই সাধ্যের মধ্যেই ছিল।

সমস্যা হলো, দেশের গণপরিবহন ব‍্যবস্থা সেই গতিতে উন্নত হচ্ছে না। রাইড-শেয়ারিং সেবাও দিন দিন ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ফলে একটা ছোট কমিউটার বা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবার জন‍্য গাড়ি কেনার চিন্তা এখন মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কাছেও কিছুটা অবাস্তব।

কিন্তু ঠিক এই ফাঁকটাতেই গড়িয়ে ঢুকেছে BAW E6 Pudding।

প্রায় ১৬.৯০ লাখ টাকা দামের এই গাড়িটি বর্তমানে বাংলাদেশের কেবল সবচেয়ে সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়িই (EV) নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অটোমোবাইল বাজারেরই সবচেয়ে স্বল্পমূল্যের গাড়ি।

আর হ্যাঁ, গাড়ির নামটা সত্যিই "পুডিং"।

আশ্চর্যজনকভাবে নামটা কীভাবে যেন একদম মানিয়ে গেছে।

BAW E6 Pudding হলো Beijing Auto Works-এর তৈরি একটা ছোট্ট বৈদ্যুতিক হ্যাচব্যাক। দেখে মনে হয়, কেউ একটা জাপানে বাজারের জন্য kei-কার বানাতে গিয়ে ভুল করে এক সাইজ বড় বনিয়ে ফেলেছে। 

তবে এই দামে প্রত্যাশাটা শুরুতেই ঠিকঠাক করে নেওয়া দরকার। আপনি মূলত পাচ্ছেন চারটা চাকা, চারটা দরজা, একটা ছোট ইলেকট্রিক মোটর, আর শহরের ছোট দুরত্বে যাতায়াত করার মত ব্যাটারি।

Pudding-এ আছে একটা ১৮.৭২ kWh ব্যাটারি প্যাক, যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ১৫ kW-এর রিয়ার-মাউন্টেড ইলেকট্রিক মোটর। 

অর্থাৎ হ্যাঁ, এটি রিয়ার-হুইল ড্রাইভ। 

রেঞ্জ দাবি করা হয় প্রায় ২২০ কিমি। তবে বাস্তবে এসি চালু করলে (আর বাংলাদেশে সেটা চালাতেই হবে) রেঞ্জ নেমে আসে ১৮০ কিমির কাছাকাছি।

বলাএ বাহুল্য এই গাড়ি লম্বা রোড ট্রিপের জন্য বানানো হয়নি। এর উদ্দেশ্য একটাই: জ্বালানির টাকা না পুড়িয়ে বাসা থেকে অফিস আর অফিস থেকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া।

সঙ্গে দেওয়া চার্জার দিয়ে চার্জ হতে লাগে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। মানে গাড়ির ট্যাংকি ভরার ব্যাপারটা "ফুয়েল স্টেশনে যাওয়া" নয়, বরং "ঘুমানোর আগে প্লাগ লাগিয়ে ভুলে যাওয়া"।

Pudding-এর স্টাইলিংয়ে একটা অদ্ভুত আদুরে ভাব আছে। গোলগাল ডিজাইনটা ইচ্ছাকৃতভাবেই আদুরে আর কাছে টানার মতো, বলা যায় এর রূপটি প্রথম দেখাতেই মন কেড়ে নেওয়ার মতো। 

তারপর চোখে পড়ে কিছু উদ্ভট খুঁটিনাটি।

শুরুতেই, এতে আধুনিক LED-র বদলে হ্যালোজেন হেডলাইট ব্যবহার করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, দুটো হেডলাইটের ঠিক মাঝখানেই আছে একটি আলোকিত BAW লোগোসহ ফুল-উইডথ LED লাইট বার।

তারপর আছে বনেট। বা বলা ভালো, প্লাস্টিকের ঢাকনা।

কারণ একে পুরোপুরি বনেট বলাটা একটু উদারতা হয়ে যায়। সাধারণভাবে খোলার বদলে সামনের কভারটা স্ট্র্যাপের সাহায্যে ঝুলে সামনের দিকে নেমে আসে, আর ভেতরে কোনো ইঞ্জিন বা ফ্রন্ট ট্রাঙ্ক নেই বরং একটা বড় ফাঁকা গহ্বরে ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি।

পেছনে আছে একটা রিভার্সিং ক্যামেরা, যেটা মোটামুটি ভালোই কাজ করে। 

বুট স্পেসকে বলা যায় "আশাবাদী"। যদিও  বেশিরভাগ জায়গা চার্জিং ক্যাবল আর একটা ওয়ার্নিং ট্রায়াঙ্গল দখল করে নিয়েছে। তবে অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হলে দুটো বাটনের সাহায্যে পেছনের সিট ভাঁজ করা যায়, তবে তা কখনোই পুরোপুরি সমতল হয় না। যা মানানসই, কারণ এই গাড়ির কোনো কিছুই বিলাসিতার  চিন্তা করে নকশা করা হয়নি।

পেছনের সিটটা আক্ষরিক অর্থেই আঁটসাঁট। তবে পেছনের বেঞ্চে অন্তত কুশন আছে, যা এই দামে রীতিমতো বদান‍্যতাই বলা যায়। এখানে যাত্রীর কাজ হল মূলত চুপচাপ বসে থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো।

সামনের পরিস্থিতিটা তুলনামূলকভাবে ভালো।  সুযোগ-সুবিধা সীমিত, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো এসি আছে। আর সৌভাগ্যবশত সেটা ঠিকঠাকভাবে কাজ করে, যা এই ধরনের সিটি কমিউটারে বেশিরভাগ ফিচারের চেয়েই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মাঝখানে আছে একটা ইনফোটেইনমেন্ট স্ক্রিন, Android Auto সাপোর্টসহ। তবে তার সাথে আছে একটি আলাদা ফোন হোল্ডার। প্রায় নিশ্চিতভাবেই অনুমান করা যায় প্রস্তুতকারকরা জানতেন এই গাড়ির চালকরা নিজেদের ফোন ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ‍্য  বোধ করবে।

ডিজিটাল গেজ ক্লাস্টারটাও ছোট্ট। বাস্তবে এটা গাড়ির ড্যাশবোর্ডের চেয়ে  একটি মোটরসাইকেলেই  ভালো মানাত।

Pudding চালানোর অভিজ্ঞতা একটু অদ্ভুতই মনে হয়।  এটা প্রচলিত গাড়ির চেয়ে বরং কিছুটা  বৈদ্যুতিক গো-কার্ট চালানোর মতো, যেখান থেকে খরচ কমানোর স্বার্থে সব অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

শহরের ভেতরে এটা মোটামুটি ভালোই আচরণ করে। সামনে mcpherson সাসপেনশন আর পেছনে ট্রেইলিং-আর্ম সেটআপ স্বাভাবিক রাস্তায় ভালোই সামলে নিতে পারে। 

দুর্ভাগ্যক্রমে, বাংলাদেশে স্বাভাবিক রাস্তা বস্তুটা একটু বিরল।

বেশি গতিতে Pudding প্রতিটা গর্ত, ফাটল আর প্রশ্নবিদ্ধ অবকাঠামোর সাথে সংঘর্ষের অনুভূতি সরাসরি কেবিনের ভেতর পৌঁছে দেয়। কিছু ঝাঁকুনি আপনি চোখেও দেখবেন না, শুধু সিটের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিকভাবে আবিষ্কার করবেন।

রোড নয়েজও যথেষ্ট। ভেতরে কথা বলতে হলে গলা একটু চড়াতে হয়, কারণ ডেভেলপমেন্টের কোনো এক পর্যায়ে বাজেট মিটিং-এর টেবিলে সাউন্ড ইনসুলেশন বিষয়টা স্পষ্টতই হেরে গেছে।

তবু একটা জায়গায় সত্যিই চমকপ্রদ কিছু আছে: ওয়ারেন্টি প্যাকেজ।

BAW গাড়ির জন্য দিচ্ছে ৩ বছর/৬০,০০০ কিমি ওয়ারেন্টি, আর ব্যাটারি প্যাকের জন্য ৮ বছর/১,২০,০০০ কিমি। অনেক মিড-রেঞ্জ ক্রসওভারের অপশন লিস্টের চেয়েও কম দামের একটা গাড়ির জন্য এটা বিস্ময়করভাবে আশ্বাসদায়ক।

Pudding বিলাসবহুল নয়। দ্রুত নয়। পরিমার্জিতও নয়। এর আসল চমক এর চালানোর খরচে। 

খরচের দিক থেকে হিসাব করলে, দেশের সর্ববৃহৎ চার্জিং নেটওয়ার্ক 'ChargeEasy'—যাদের বর্তমানে ৩০টিরও বেশি চার্জার রয়েছে—তাদের বেশিরভাগ স্টেশনেই প্রতি কিলোওয়াটের ভাড়া প্রায় ১৯ টাকা। সেই হিসাবে, মাত্র ৪০০ টাকায় আপনি Pudding গাড়িটিকে সম্পূর্ণ (ফুল) চার্জ করে নিতে পারবেন।

এর মানে দাঁড়ায়, আপনার প্রতি কিলোমিটারে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩ থেকে ৪ টাকা। এদিকে পেট্রোলের নতুন দাম প্রতি লিটারে ১৬৫ টাকা এবং একটি গাড়ি গড়ে প্রতি লিটারে ৮ কিলোমিটার চলে, অর্থাৎ পেট্রোলে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় প্রায় ২০.৬৩ টাকা। ফলে আপনি প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১৬.৬৩ থেকে ১৭.৬৩ টাকা পর্যন্ত বাঁচাচ্ছেন।

সুতরাং আপনি যদি মাসে ১,০০০ কিলোমিটার গাড়ি চালান, তবে আপনার মাসে প্রায় ১৬,৬২৫ থেকে ১৭,৬২৫ টাকা বেঁচে যাচ্ছে।

Pudding আসল আকর্ষণ কিন্তু এটাই।

মাত্র ১৬.৯০ লাখ টাকায় আপনি পাচ্ছেন একটা ছোট গাড়ি যা কিনা আপনাকে শহরের ভিতরে সব জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে এবং আপনার যাতায়াত খরচ থেকে প্রতিদিন শত শত টাকা বাঁচাবে।

আর সত্যি বলতে, শুধু এই কারণেই এটা অনেক বেশি দামি যন্ত্রের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়।

ইমরান আবিদ

তরুণ এক গাড়িপ্রেমী—যার আছে একটি বাইক, এক সেট ক্যামেরা এবং নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি চরম উদাসীনতা। আরও আছে উচ্চ গতিতে বাইক চালানোর সময় ফোন হারিয়ে ফেলার অভ্যাস।

Next
Next

BYD Seal 5: প্রিমেলিয়ন-এর আত্মিক উত্তরসূরী