BYD Sealion 6 DM-i ঃ দারুন রেঞ্জ, দুর্দান্ত পারফরম্যান্স

ছবিঃ ইমরান আবিদ

অভিষেকের পর থেকেই চায়নার BYD বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে। বর্তমানে তাদের প্লাগ-ইন হাইব্রিড, ইলেকট্রিক গাড়ি, এবং ক্রস ওভার এতই বিক্রি হচ্ছে যে বাংলাদেশের বাজারের রিকন্ডিশন গাড়ির রাজত্ব নড়েচড়ে উঠেছে।

তবে তাদের এই দাপটের মূল কারণ যদি চিন্তা করতে হয়, আজ আঙ্গুল তুলতে হবে শুধু একটি মডেলের দিকে।

তাদের প্রথম দুটো গাড়ি বাংলাদেশে তেমন একটি সারা তোলে নি। চাইনিজ এই কোম্পানিটি যাত্রা শুরু করে Seal 3.8 দিয়ে। চোখ ধাঁধানো পারফরমেন্সের এই গাড়িটির দাম ছিল প্রায় এক কোটি টাকা। বলা বাহুল্য, দামটি ছিল অনেকের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এরপর তারা নিয়ে আসে আনে পুরোপুরি বৈদ্যুতিক Atto 3 ক্রসওভার। নজরকাড়া এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে ঠাসা এই গাড়ির দাম ধার্য করা হয়েছিল বেশ প্রযোগিতামূলক ৫০ লাখ টাকা। এর পরেও পুরোপুরি, বৈদ্যুতিক হওয়ায় অনেকেই গাড়িটি কিনতে দ্বিধাবোধ করে।

অবশেষে, BYD বাংলাদেশে আনে এমন একটি গাড়ি, যেটা কিনা বাজারের চাহিদার সাথে একেবারে খাপে খাপ মিলে যায়। সেই গাড়িটি ছিল Sealion 6 DM-i।

বাংলাদেশের বাজারে গাড়ি মালিকানার সবচেয়ে বড় খরচ হচ্ছে দুটিঃ গাড়ির দাম আর গাড়ির তেলের দাম।

বেশিরভাগ মানুষই দেশে মাঝারি আকৃতি ক্রসওভার কিনতে গেলে ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকার ভেতর গাড়ী খোজে। Sealion 6 DM-i এর দাম ছিল মাএ ৬০ লাখের একটু উপরে, কিন্তু এর পারফমেন্স ছিল অনেক কোটি টাকার গাড়ির সমান।

এই পারফমেন্স-এর পিছনে ছিল এই গাড়ির ইঞ্জিন, বা ইঞ্জিনগুলো।

Sealion-এর DM-i Super Hybrid System-টি তে দুটি দুই ধরনের ইঞ্জিন একসঙ্গে কাজ করে। Xiaoyun 1.5-লিটারের একটি হাই-এফিসিয়েন্সি ইঞ্জিন এবং ১৪৫ কিলোওয়াটের একটি মোটর। দুটি মিলে গাড়িতে দেয় ২১৪ HP এবং ৩০০ Nm টর্ক — যা গাড়িটিকে শূন্য থেকে একশ-তে মাএ আট সেকেন্ডে পৌঁছে দেয়।

তবে এই গাড়ির তুরুপের তাস ছিল এর তেল খরচ।

গাড়িটির ১৮.৩ kWh ব্যাটারি প্রায় ৯২ কিমি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক রেঞ্জ দেয়, যা দৈনন্দিন শহরের যাতায়াতের জন্য যথেষ্ট। আর তার সাথে যদি ইঞ্জিন চলে, এর মোট রেঞ্জ বেড়ে দাঁড়ায় ১,১০০ কিমিতে। আর জ্বালানি খরচ? BYD-র দাবি, প্রতি ২০ কিমিতে মাত্র এক লিটার।

বলা ভাল, আমাদের দেশে সাধারণ একটি Corolla রাস্তায় লিটারে মাত্র ৮ কিমি মাইলেজ পেয়ে থাকে।

অর্থাৎ যদি BYD-র দাবি সত্য হয়, তবে হিসেব অনুযায়ীএই গাড়ির মালিকের সাপ্তাহিক জ্বালানি খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে এবং মাসে মাত্র একবার পেট্রোল পাম্পে যেতে হবে। আর সে যদি প্রতিদিন রাতে গাড়িটি চার্জে দেয়—যা সাথের চার্জার দিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগে—তবে পেট্রোল ইঞ্জিনের ব্যবহার হয়তো করতেই হবে না।

এবার আসি গাড়িটির ডিজাইনের, Sealion-এর চেহারাতে কিছুটা জার্মান ভাব আছে। চৌকস এই বডিতে রয়েছে LiDAR, LED হেডল্যাম্প, ১৯ ইঞ্চি অ্যালয় হুইল, ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা সেটআপ, প্যানোরামিক সানরুফ সহ আরো অনেক কিছু। সোজা বাংলায়, এই গাড়িতে কী নেই তার তালিকা করা আরো সহজ হবে।

গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স আমাদের দেশের রাস্তার জন্য যথেষ্ট উঁচু, তবে নিচে ব্যাটারি প্যাক কিছুটা বের হয়ে থাকায় রাস্তায় কোন গভীর গর্ত থাকলে একটু সাবধানে চলতে হবে।

পেছনের রয়েছে দুটি লাইট বার—একটি ছাদে আর অন্যটি অটোমেটিক হ্যাচ-এর মাঝখানে। ব্রেক চাপলে দুটিই জ্বলে ওঠে।

হ্যাচটি খুললে পাওয়া যাবে ৪০০ লিটারের কার্গো স্পেস, যা পেছনের সিট ভাজ করলে ১,৪০০ লিটারে রূপান্তরিত হবে। কার্গো ফ্লোরে একটি বাক্সে রয়েছে হোম চার্জার, যা গাড়ির সাথে আসা চার্জিং কেবলের চেয়ে অর্ধেক সময়ে ব্যাটারি চার্জ করে দেবে।

ফ্লোরবোর্ডের নিচে আছে সব ধরনের রোডসাইড অ্যাসিস্ট্যান্স কিট এবং একটি vehicle-to-load (V2L) মডিউল। বিদ্যুৎ চলে গেলে এই V2L-টির মাধ্যমে বাসার বেশ কিছু ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি চালানো সম্ভব, অর্থাৎ প্রয়োজনে গাড়িটিকে একটি বিশাল পাওয়ার ব্যাংক অথবা জেনারেটর হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

Sealion-এর পেছনের সিটগুলো রিক্লাইন করা যায়, যা যখন এই গাড়িটি বাজারে আসে তখন একটি বিরল ব্যাপার ছিল। যাত্রীদের জন্য রয়েছে USB পোর্ট, এসি ভেন্ট, কাপহোল্ডারসহ আর্মরেস্ট এবং BYD-র টাচ-সেনসিটিভ রিডিং লাইট।

ছাদের বিশাল প্যানোরামিক সানরুফ দিনের বেলা কেবিনকে বেশ উজ্জ্বল রাখে, আর অ্যাম্বিয়েন্ট লাইটিং রাতের বেলা চমৎকার আবহ তৈরি করে। সঙ্গীত প্রেমীদের জন্য রয়েছে ১০-স্পিকারের Infinity অডিও সিস্টেম যা ঢাকার ট্রাফিক থেকে আপনার শ্রবণেন্দ্রিয় রক্ষা করতে চমৎকার কাজে দেয়।

সামনের দিকে অভিজ্ঞতা আরও ভালো। দুটি সিটই পাওয়ারড এবং ভেন্টিলেটেড। ড্যাশবোর্ডে রয়েছে ১২.৩ ইঞ্চির ডিজিটাল ইনস্ট্রুমেন্ট ক্লাস্টার এবং একটি বিশাল ১৫.৬ ইঞ্চির BYD-র সিগনেচার রোটেটিং টাচস্ক্রিন। স্ক্রিনের নিচেই আছে ক্লাইমেট ভেন্ট তবে দুঃখজনকভাবে তার সাথে নেই কোন নব বা বোতাম এটি পুরোপুরি টাচস্ক্রিন-ভিত্তিক কন্ট্রোল সিস্টেম। তবে BYD-র তিন আগুলের টেকনিক এই স্ক্রিনটিতে কাজ করে।

সেন্টার কনসোলটি বেশ সুন্দর করে সাজানো। এতে রয়েছে দুটি ওয়্যারলেস চার্জিং প্যাড, কাপহোল্ডার, একটি গভীর স্টোরেজ কম্পার্টমেন্ট (যার ভেতরে জরুরি কাঁচ ভাঙার একটি টুল আছে) এবং একটি গিয়ার শিফটার যার নাম দিয়েছে BYD “Heart of the Ocean”। সম্ভবত BYD-র প্রতিষ্ঠাতা Wang Chuanfu Titanic চলচ্চিত্রের বেশ বড় ভক্ত!

এবার আসা যাক চালানোর অভিজ্ঞতায়।

স্টিয়ারিং হাতে Sealion 6-এর আচরণ অনেকটা একটি ভারী Atto 3-এর মতো। ইলেকট্রিক মোটর গাড়িটিকে স্মুথভাবে চলতে সাহায্য করে, আর ইঞ্জিন যোগ দেয় প্রায় ৮০ কিমি/ঘণ্টা গতিতে। সাসপেনশন কমফোর্ট ও কন্ট্রোল বেশ ভালোভাবেই সামাল দেয়, তবে বাড়াবাড়ি রকম গতিতে কোন মোড় নিলে ট্র্যাকশন ক্ষণিকের জন্য পিছলে যেতে পারে, অবশ‍্য স্টেবিলিটি কন্ট্রোল সিস্টেম দ্রুত তা সামলে নেয়। উল্লেখ্য, আমাদের N301 এক্সপ্রেসওয়েতে ড্রাইভের সময় ব্রেক যথেষ্ট ভালো পারফর্ম করেছে।

নিরাপত্তার দিক থেকে এটি অস্ট্রেলিয়ার ANCAP সেফটি রেটিংয়ে ফাইভ-স্টার পেয়েছে। অর্থাৎ একটু সাহসী ভাবে চালালে পেছনের সিটের প্যাসেঞ্জারদের কিছু বিশেষ কথা শোনা ছাড়া আর কোন সমস্যা হবার সম্ভাবনা কম, বলে রাখা ভালো পরিবার পরিজন নিয়ে গাড়ি চালানোর সময় সাহসটা একটু নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই শ্রেয়।

এবার আসি জ্বালানি খরচের হিসাবে। আমাদের একটু পাগলাটে ড্রাইভিং সত্ত্বেও গাড়িটি প্রতি লিটারে ১৮ কিমি মাইলেজ দিয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৪ লিটার জ্বালানিতে গাড়িটি প্রায় ৭৫ কিমি পথ অতিক্রম করেছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।

মূল কথায় আসা যাক: ৬২.৯০ লাখ টাকায় ছোটখাটো কয়েকটি ইস্যু ছাড়া Sealion 6-এর খুব বেশি ঘাটতি নেই। ফুয়েল এফিসিয়েন্সি, হাইব্রিড টেকনোলজি এবং আধুনিক ডিজাইন এটিকে এই সেগমেন্টে গ্রাহকদের দারুণ ভ্যালু ফর মানি অফার করে।

যারা আধুনিক প্রযুক্তিতে ভরপুর, দুর্দান্ত রেঞ্জ ও এফিসিয়েন্সির একটি ক্রসওভার খুঁজছেন, BYD Sealion 6 তাদের একবার হলেও চালিয়ে দেখা উচিত।

রাহবার আল হক

অটোমোবাইল সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিতে রাহবার আল হকের রয়েছে ১০ বছরেরও বেশি সময়ের পথচলা। দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS), দ্য টারবাইন এবং অটোড্রাইভ বিডি-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মে সম্পাদকীয় পরিচালনা, নতুন কনটেন্ট টিম গড়ে তোলা এবং টেস্ট ড্রাইভের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

Previous
Previous

BYD Seal 5: প্রিমেলিয়ন-এর আত্মিক উত্তরসূরী