BYD Seal 5: প্রিমেলিয়ন-এর আত্মিক উত্তরসূরী
ছবিঃ ইমরান আবিদ
দশ বছর আগেও মানুষ যদি কারো কাছে বলতো আমি একটা ভালো গাড়ি কিনতে চাই। বাঁধাধরা উপদেশ ছিল, একটা প্রিমিও বা এলিয়ন নিয়ে নেন। বাংলাদেশে ওই দুটি গাড়ির ভক্তের সংখ্যা বলা যায় একেবারে অগণিত, এবং এখনো অনেকেই নতুন গাড়ি কিনতে গেলে রিকন্ডিশন দোকানে একটা লেটেস্ট মডেলের প্রিমিও হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায়।
সমস্যাটা হচ্ছে টয়োটা দুটো গাড়ি বানানো বন্ধ করে দিয়েছে বছরখানেক হলো। অর্থাৎ বাংলাদেশে কেউ যদি ওই গাড়িগুলো কিনতে চায় তাকে টাইম মেশিন ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু তার ভোগান্তির শেষ সেখানেই নয়।
ধরা যাক সে প্রিমিও বাদ দিয়ে নতুন কোন সেডান নিতে চায়। সমস্যাটা হচ্ছে বাজারে এখন সেডান গাড়ি সোনার হরিণের মত। রিকন মার্কেটে বা নতুন গাড়ির বাজারে একটা সেডান গাড়ি ৪০ লাখ টাকার নিচে পাওয়া খুবই দুর্লভ, আর পেলেও পাওয়া যাবে টার্বোচার্জ বা নন হাইব্রিড ইঞ্জিন সহ, যা আমাদের বর্তমান 165 টাকা লিটারে চালাতে ব্যাংক ব্যালেন্সের লাল বাত্তি চলে যাবে।
কিন্তু আমি যদি বলি বাংলাদেশে এখন এমন একটি গাড়ি আছে যা দেখতে অনেকটা প্রিমিওর মত, প্রযুক্তিতে ভরপুর এবং এমন এক ইঞ্জিন ব্যবহার করে যাতে শুধু তেলই বাঁচেনা বরং গাড়ি বেশ দ্রুত চলতে পারে?
আমি অবশ্যই BYD-র Seal 5-এর কথা বলছি। বলাবাহুল্য যদিও গাড়িটির নামের প্রথম অংশের সাথে BYD Bangladesh এর ৩.৮ সেকেন্ডে ০ থেকে ১০০ তোলা অল-ইলেকট্রিক রকেটের মিল আছে, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জন্তু। বাস্তবতা হচ্ছে এই গাড়িটি অনেকাংশেই গত বছর বাজারে আসা আসা Sealion 5 ক্রসরোভারের সেডান সংস্করণ।
ইচ্ছাকৃত হোক বা না হোক, Seal 5-এর ডিজাইনের সাথে Premio আর Allion-এর বেশ মিল আছে। Premio-র শেষ মডেলের মত এর সামনে আছে বিশাল একটি গ্রিল, যার দু'পাশে রয়েছে সরু LED DRL হেডল্যাম্প। একদিক দিয়ে বলা যায়, কেউ যদি এর BYD ব্যাজটি খুলে ADAS সেন্সরের ওপর একটি নীল Toyota ব্যাজ লাগিয়ে দিয়ে বলে, বন্দর থেকে সদ্য খালাস হওয়া কোনো লেটেস্ট JDM গাড়ি তাহলে অনেকেই চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবে।
এই নস্টালজিক ফ্রন্ট এন্ডের নিচে রয়েছে BYD-র পরিচিত 1500cc-র DM-i hybrid সেটআপ। ইঞ্জিনটি এই সেটআপে শুধু জেনারেটর হিসেবে কাজ করে এবং একটি ইলেকট্রিক মোটরের সাথে মোট ২০৭ হর্সপাওয়ার এবং ৩০০ Nm টর্ক তৈরি করে, যার পুরোটি যায় সামনের চাকায়। এই পুরো সেটআপটির সাথে সংযুক্ত আছে একটি ১৩.০৮ কিলোওয়াট আওয়ার এর ব্যাটারি যা গাড়িটাকে সম্পূর্ণ ৮০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক রেঞ্জ দিতে সক্ষম।
একটি চাইনিজ NEV গাড়ি হিসেবে Seal 5-এর সাইড প্রোফাইল আশ্চর্যজনকভাবে বেশ প্রথাগত। চাকা গুলো ১৭-ইঞ্চির ৫-স্পোক, যা গাড়িটিকে প্রায় ১৪৯ মিমি উপরে ধরে রাখে। এর উপর রয়েছে NFC যুক্ত ফ্লোটিং ORVM, সাধারণ ডোর হ্যান্ডেল আর পেছনে ব্যাটারির চার্জ পোর্ট ডোর। গাড়িটির অপর পাশে রয়েছে ৪৫ লিটারের ফুয়েল ট্যাংকের ক্যাপ। BYD-র দাবি, গাড়িটির সঙ্গে আসা চার্জার দিয়ে ব্যাটারিতে চার্জ দিতে লাগবে চার ঘন্টা অর্থাৎ প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে প্লাগ-ইন করলেই চলবে।
গাড়ির পেছনের অংশটিও বেশ সাদামাটা। নীচে আছে এক জোড়া ফেক এয়ার ভেন্ট, ট্রাঙ্ক জুড়ে লাইট বার আর অবশ্যই LED টেইলল্যাম্প। পরিশেষে উপরে আছে একটি বড় তৃতীয় ব্রেক লাইট। মজার ব্যাপার হচ্ছে গাড়িটির ব্যাকআপ লাইট শুধু একটি, বাম পাশে। অন্যটি ফগ ল্যাম্প।
ট্রাঙ্কটি খুললেই পাওয়া যাবে ৪৫০ লিটারের বিশাল বুট স্পেস, যেখানে রাখা আছে গাড়িটির চার্জার। আর দশটা হাইব্রিড গাড়ির মতো ফ্লোরের কভার তুললে কোনো স্পেয়ার টায়ার পাওয়া যাবে না, এর বদলে রয়েছে এক ক্যান সিল্যান্ট, একটি কম্প্রেসর, একটি সেফটি জ্যাকেট আর একটা রিফ্লেক্টিভ ওয়ার্নিং ট্রায়াঙ্গেল।
গাড়িটির পেছনের সিটগুলো বেশ আরামদায়ক, যা দীর্ঘ রোড ট্রিপের জন্য দারুণ। তার সাথে রয়েছে রয়েছে রিয়ার AC ভেন্ট, USB পোর্ট, কাপহোল্ডারসহ সেন্ট্রাল আর্মরেস্ট এবং স্টোরেজ পাউচ। বিনোদনের জন্য আছে ৬টি স্পিকার, তবে দুঃখজনকভাবে এ গাড়িটিতে কোন সানরুফ নেই।
গাড়িটির ড্রাইভিং সিটে বসার সাথে সাথেই স্পষ্ট হয়ে যায় এটি একটি BYD। চালকের সিটটি পাওয়ারড এবং সামনে রয়েছে একটি ৮.৮-ইঞ্চির ডিজিটাল ইনস্ট্রুমেন্ট ক্লাস্টার এবং বাটন ভর্তি একটি স্টিয়ারিং হুইল। মাঝখানে আছে একটি ১২.৮-ইঞ্চির স্ক্রিন। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এই স্ক্রিনে আছে হরেক রকম ফিচার, রয়েছে Android Auto এবং Apple CarPlay সাপোর্ট।
স্ক্রিনটির ঠিক নিচেই রয়েছে এয়ার ভেন্ট, কাপহোল্ডার, গিয়ার সিলেক্টর এবং সেন্টার কনসোল। গাড়িটিতে AC চালু ও বন্ধ করার বাটন থাকলেও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আপনাকে তিন আঙ্গুল দিয়ে স্ক্রিনটি স্পর্শ করতে হবে। সবশেষে নিচে রয়েছে বাড়তি স্টোরেজ স্পেস এবং তার সাথে একটি ১২-ভোল্ট সকেট ও চার্জিং পোর্ট।
এবার আসা যাক চালানোর অভিজ্ঞতায়।
ইলেকট্রিক মোটরে চালিত এই গাড়িটি Premio বা Allion-এর মতো মোটেও শান্তশিষ্ট নয়। ২০০ হর্সপাওয়ারের এবং ৩০০ Nm টর্ক উৎপন্নকারী এই ইঞ্জিন স্পোর্ট মোডে অ্যাক্সিলারেটর চেপে ধরলে মাত্র আট সেকেন্ডের মধ্যেই শূন্য থেকে ১০০ কিলোমিটার গতি স্পর্শ করে। অবশ্য গাড়ির ভেতর বসে সেটি টের পাওয়া যায় না। গাড়িটির সাউন্ড সাপ্রেশন এক কথায় আশ্চর্যজনক। অনেকবার এমন হয়েছে যে আমি গাড়িটি কত দ্রুত চলছে তার স্পিডোমিটারের দিকে তাকানোর আগে বুঝতেই পারিনি।
গতি প্রসঙ্গে শুধু একটি কথাই বলবো। কিছুদিন আগে আমার গাড়িটা ইচ্ছামত চালানোর একটা সুযোগ হয়েছিল আর তখন আমি এতই গতি তুলেছিলাম যে গাড়ির ইঞ্জিনের কোন সমস্যা হয়নি কিন্তু টায়ার আপত্তি জানিয়েছিল। অর্থাৎ এই গাড়ি তার টায়ারের সক্ষমতার তুলনায় বেশি গতি তুলতে পারে।
তবে এটি কোন স্পোর্টস কার নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্টিয়ারিং এবং ব্রেক কিছুটা অস্পষ্ট ও হালকা মনে হতে পারে। এবং এর সাসপেনশন গতির চেয়ে বরং রাইড কমফোর্ট বা আরামের দিকে বেশি নজর রেখে তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ আপনি যদিও গতিটি পছন্দ করবেন আপনার যাত্রীরা আপনাকে কিছু বাছা বাছা কথা শোনাবে।
তবে এবার আসি গাড়িটার মূল আকর্ষণে। ব্রোশিওর অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক মোডে গাড়িটি ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ২.৫০ টাকার তেল ব্যবহার করবে। বর্তমানে ঢাকায় অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৬৫ টাকা। একটি সাধারণ গাড়ি লিটারে ৮ কিলোমিটার চলে। যদি আমরা হিসাবটা ভাঙ্গি তাহলে প্রতি কিলোমিটার খরচ পড়ছে ১৩ টাকা। অর্থাৎ যদি BYD-র দাবি কাছাকাছিও হয়, ধরে নেই তিন টাকা পার লিটার, তাহলে আপনার প্রত্যেক কিলোমিটারে ১০ টাকা করে সাশ্রয় হবে।
এছাড়া, কিছুদিন আগে অন্য একটি ব্র্যান্ড হিসাব করেছিল বাংলাদেশে একটা গাড়ি শহরের ভেতর দৈনিক কত কিলোমিটার চলে। তাদের হিসাবে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার যাতায়াত করে । এখানে বলে রাখা ভালো হিসাবটি ছিল বিলাসবহুল গাড়ির কিন্তু তারপরও ধরে নেওয়া যায় আপনি যদি গাড়িটি শুধু শহরের ভেতরে ব্যবহার করেন এবং প্রত্যেক রাত্রেই চার্জ দেন তাহলে সম্ভাবনা আছে আপনাকে কয়েক মাস গাড়িতে তেলই ভরতে হবে না।
এবার আসা যাক দামের কথা। গাড়িটি যখন প্রথম বাজারে এসেছিল তখন সব মিলিয়ে গাড়িটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৯.৯০ লাখ টাকা। তবে নতুন ট্যাক্স কাঠামোতে এর দাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬.৯০ লাখ টাকা। যা কিনা বাংলাদেশের বাজারে অতুলনীয়।
এই দামে আপনি আর কোন নতুন গাড়ি পাবেন না যেটাতে আছে বৈদ্যুতিক তেলসাশ্রয়ী ইঞ্জিন, আধুনিক প্রযুক্তি আর একটি চেনা চেহারা।
তাই আপনি যদি আপনার পুরনো Premio বা Allion বেঁচে বাজারে একটি নতুন প্রযুক্তি সম্পন্ন কম জ্বালানি খরচের আরামদায়ক সেডান খুঁজে থাকেন, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গাড়িটি পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়ে দেখতে পারেন।
দশ বছর আগেও মানুষ যদি কারো কাছে বলতো আমি একটা ভালো গাড়ি কিনতে চাই। বাঁধাধরা উপদেশ ছিল, একটা প্রিমিও বা এলিয়ন নিয়ে নেন। বাংলাদেশে ওই দুটি গাড়ির ভক্তের সংখ্যা বলা যায় একেবারে অগণিত, কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে টয়োটা গাড়ি দুটো বানানো বন্ধ করে দিয়েছে বছরখানেক হলো।
কিন্তু আমি যদি বলি বাংলাদেশে এখন এমন একটি গাড়ি আছে যা দেখতে অনেকটা প্রিমিওর মত, প্রযুক্তিতে ভরপুর এবং এমন এক ইঞ্জিন ব্যবহার করে যাতে শুধু তেলই বাঁচেনা বরং গাড়ি বেশ দ্রুত চলতে পারে?