৬ মাসে ৭০ লাখ মোটরসাইকেল বেচলো ভারত
ছবিঃ Hero MotoCorp
মোটরসাইকেল বাজার সাম্প্রতিক সময়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দাম বৃদ্ধি, ক্রেতাদের রুচির পরিবর্তন, আর তরুণদের মোটরসাইকেলের প্রতি অনাগ্রহ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে নির্মাতারা। তবে, ভারত এই সকল সমস্যার ব্যতিক্রম।
Autocar India-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় নির্মাতারা ৬৯ লাখ ২০ হাজার মোটরসাইকেল সরবরাহ করেছেন। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬২ লাখ ৭০ হাজার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ। হিসাব করলে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার, আর প্রতিদিন প্রায় ৩৮ হাজার মোটরসাইকেল সরবরাহ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য এটি ক্যালেন্ডার বছরের প্রথম ছয় মাসের হিসাব নয়। এই পরিসংখ্যান ভারতের ২০২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের, যা এপ্রিল থেকে পরের বছরের মার্চ পর্যন্ত চলে। সেপ্টেম্বরেই এক মাসে সর্বোচ্চ ১৪ লাখ ১০ হাজার মোটরসাইকেল সরবরাহের নতুন রেকর্ড হয়েছে। এই ছয় মাসের প্রতিটিতেই সরবরাহের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। অথচ আগের অর্থবছরে প্রথম ছয় মাসে ১০ লাখ ছাড়িয়েছিল মাত্র তিন মাস।
অর্থবছরের প্রথমার্ধে মোটরসাইকেল সরবরাহের আগের রেকর্ড ছিল ৭৩ লাখ ৭০ হাজার ইউনিট, যা ২০১৯ অর্থবছরে হয়েছিল। ভারত এবার সেই রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে ২০২৭ অর্থবছরে দেশটিতে মোটরসাইকেল সরবরাহের সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এটি এখনো অনুমান, নিশ্চিত ফলাফল নয়। আগের বার্ষিক রেকর্ড ছিল ২০১৯ সালে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৯০ হাজার মোটরসাইকেল।
Society of Indian Automobile Manufacturers (SIAM)-এর তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ভারতের সামগ্রিক দুই চাকার গাড়ির বাজারে অভ্যন্তরীণ সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২০ লাখ ৯০ হাজার ইউনিট। এর প্রায় ৫৭ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল। অন্যদিকে স্কুটারের সংখ্যা ছিল ৪৮ লাখ ৬০ হাজার, যা মোট বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ মোটরসাইকেলের সাথে স্কুটার বাজারও বড় হচ্ছে।
ছবিঃ Hero MotoCorp
প্রায় ২৯ লাখ ৪০ হাজার মোটরসাইকেল সরবরাহ করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে Hero MotoCorp। আগের বছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ। বাজারের প্রায় ৪৩ শতাংশ তাদের দখলে, যা Honda-র সরবরাহের দ্বিগুণেরও বেশি। ১০০–১১০ সিসি শ্রেণিতে প্রতিষ্ঠানটি ২৫ লাখ ৮৩ হাজার ৪৬৭টি মোটরসাইকেল বিক্রি করেছে। এতে বোঝা যায়, সাশ্রয়ী দামের দৈনন্দিন যাতায়াতের মোটরসাইকেলের ওপর তাদের ব্যবসা কতটা নির্ভরশীল। Hero-র মোটরসাইকেল ব্যবসার প্রায় ৮৮ শতাংশই এন্ট্রি-লেভেল মডেল থেকে আসে।
Honda-র প্রবৃদ্ধিও ছিল ১২ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি ১৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৬টি মোটরসাইকেল সরবরাহ করে বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ দখলে রেখেছে। ১১০–১২৫ সিসি শ্রেণিতে তাদের সরবরাহ ছিল ৯ লাখ ৯০ হাজার ৩৭০টি মোটরসাইকেল। Honda Unicorn 150-এর সাফল্য ও ছিল উল্লেখযোগ্য। এর বিক্রি ৫৫ হাজার ২৯১ থেকে বেড়ে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৫৩ ইউনিটে পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ২২৯ শতাংশ।
বড় ইঞ্জিনের মোটরসাইকেলের বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে Royal Enfield। প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ ২৩ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ৪২ হাজার ২১ ইউনিট হয়েছে। এতে বাজারে তাদের অংশ বেড়ে প্রায় ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২৫০–৩৫০ সিসি শ্রেণিতে Royal Enfield বিক্রি করেছে ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫৩৯টি মোটরসাইকেল, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। এই শ্রেণিতে এখনো তাদের দখলে প্রায় ৮৫ শতাংশ বাজার। তবে এক বছর আগে এই হার ছিল ৯৪ শতাংশ। Royal Enfield এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীরা ধীরে ধীরে বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে।
অন্যদিকে, ২৫০–৩৫০ সিসি শ্রেণির বাজার ৪১ শতাংশ বেড়ে ৭ লাখ ৩ হাজার ৩২৯ ইউনিটে পৌঁছেছে। সামগ্রিক মোটরসাইকেল বাজারের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি। এই শ্রেণিতে TVS-এর সরবরাহ ২৩৯ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার ৬৩৬ ইউনিট হয়েছে। অন্যদিকে Honda বিক্রি করেছে ৪৪ হাজার ১৪৮টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৮ শতাংশ বেশি। এই বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো Royal Enfield-এর দখলে, তবে আগের মতো একচ্ছত্র আধিপত্য আর নেই।
ছবিঃ TVS
সামগ্রিকভাবে TVS বিক্রি করেছে ৭ লাখ ৭৪ হাজার ৩৯১টি মোটরসাইকেল, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। ১৫০–২০০ সিসি শ্রেণিতে Apache সিরিজের বিক্রি ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৩৪৭ ইউনিট, যা ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই শ্রেণিতে TVS-এর বাজারের অংশ প্রায় ৪২ শতাংশ।
এই শ্রেণিতে আরও বেশি প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে Yamaha। তাদের মোটরসাইকেল সরবরাহ ৩৪ শতাংশ বেড়ে ২ লাখ ২৭ হাজার ৪০৮ ইউনিট হয়েছে। ১৫০–২০০ সিসি শ্রেণিতে বিক্রি ৬৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৩ ইউনিটে। এসব পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে, সাধারণ যাতায়াতের মোটরসাইকেলের চেয়ে বেশি পারফরম্যান্স দিতে পারে এমন মডেলের চাহিদাও বাড়ছে। তবে সামগ্রিক বাজারের মূল চালিকাশক্তি এখনো সাশ্রয়ী পরিবহন।
বড় নির্মাতাদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল Bajaj Auto। প্রতিষ্ঠানটির মোটরসাইকেল সরবরাহ ৭ শতাংশ কমে ৯ লাখ ৩২ হাজার ৯৮১ ইউনিট হয়েছে। এতে বাজারে তাদের অংশ ১৬ শতাংশ থেকে কমে ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ১০০–১১০ সিসি মোটরসাইকেলের বিক্রি কমেছে ২৬ শতাংশ, আর ১১০–১২৫ সিসি শ্রেণিতে পতন হয়েছে ২২ শতাংশ।
তবে বড় ইঞ্জিনের মোটরসাইকেলে Bajaj-এর পারফরম্যান্স বেশ ভালো। ১৫০–২০০ সিসি শ্রেণিতে তাদের বিক্রি ৩৩ শতাংশ বেড়ে ২ লাখ ১০ হাজার ৭৪৩ ইউনিট হয়েছে। অন্যদিকে ২০০–২৫০ সিসি শ্রেণিতে বিক্রি ৮০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৩৪৩ ইউনিটে। এই শ্রেণির বাজারের ৫৬ শতাংশ Bajaj-এর দখলে। অর্থাৎ পুরো ব্যবসা নয়, বরং ছোট ইঞ্জিনের মোটরসাইকেল বিভাগেই তাদের সমস্যা বেশি কেন্দ্রীভূত।
ছবিঃ Bajaj
ভারতে পণ্য ও পরিষেবা করের কাঠামোয় পরিবর্তনও ৩৫০ সিসির নিচের মোটরসাইকেলগুলোর দাম তুলনামূলক সাশ্রয়ী করেছে। ফলে এই শ্রেণিগুলোতে আরও প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। নির্মাতাদের কাছ থেকে সরবরাহ করা মোটরসাইকেলের সংখ্যা আর নিশ্চিত নিবন্ধন কিংবা ব্যক্তিগত ক্রেতার কাছে বিক্রির সংখ্যা এক নয়। ভারতে মোটরসাইকেল মূলত ব্যবহারিক যাতায়াতের মাধ্যম। তাই বড় ইঞ্জিনের মোটরসাইকেলের প্রবৃদ্ধি মানেই এই নয় যে পুরো বাজার এখন সপ্তাহান্তে ঘুরতে বের হওয়া উৎসাহীদের দিয়ে ভরে গেছে।
তবু বাজারের গতিপথ বেশ আকর্ষণীয়। সাশ্রয়ী দৈনন্দিন যাতায়াতের মোটরসাইকেল বিপুল সংখ্যায় বিক্রি হচ্ছে, আর ২৫০–৩৫০ সিসি ও পারফরম্যান্সকেন্দ্রিক কয়েকটি শ্রেণি আরও দ্রুত বাড়ছে। ফলে নির্মাতাদের এখন একই সঙ্গে দুই ধরনের ক্রেতার চাহিদা মেটাতে হচ্ছে—যাঁদের নির্ভরযোগ্য দৈনন্দিন পরিবহন প্রয়োজন, এবং যাঁরা বাড়তি পারফরম্যান্সের জন্য বেশি অর্থ খরচ করতে প্রস্তুত।
মাত্র ছয় মাসে প্রায় ৭০ লাখ মোটরসাইকেল সরবরাহ করা অবিশ্বাস্য এক সংখ্যা। বাজারের প্রবৃদ্ধি এভাবে অব্যাহত থাকলে ভারত দেখিয়ে দিচ্ছে, মোটরসাইকেল শিল্পের দম এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
জনপ্রিয় ১২৫ সিসির কমিউটার বাইক TVS Raider-এর মার্ভেল কমিকস থিমের নতুন "Doctor Doom Edition" বাজারে এনেছে TVS Motor Company।