ছোট ইঞ্জিনে বড় চমক: TVS Raider 125

ছবিঃ ইমরান আবিদ

প্রযুক্তি ও ডিজাইনে ঠাসা ছোট বাইক তৈরিতে ভারতীয় মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি দিনে দিনে বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এই ট্রেন্ডের অন্যতম উদাহরণ হল Hero-র Xtreme 125R। তবে এই পথের সূচনা হয়েছিলো TVS Raider 125 দিয়ে ।

ফিচার সমৃদ্ধ ১২৫ সিসির এই কমিউটার বাইকটি ২০২১ সালে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। আর তার পাঁচ বছর পর এটিই হয় আমার জীবনের প্রথম বাইক।

Raider-এর বাহ্যিক রূপটি দেখলেই বোঝা যায় ব্র্যান্ডটি কী অর্জন করতে চেয়েছিল। চকচকে ও বাঁকানো প‍্যানেলগুলো দূর থেকে দেখতে বেশ চমৎকার লাগে। তবে কাছে এসে পাতলা প্লাস্টিকের প্যানেলগুলো ধরে দেখলে মনে পড়ে যায় এটি একটি বাজেট বাইক।

আকর্ষণীয় স্টাইলিংয়ের পাশাপাশি TVS এতে যুক্ত করেছিল আধুনিক প্রযুক্তি।

সামনের অল-এলইডি ফ্রন্ট হেডল্যাম্পটি যেন একটি কালো ও হলুদ রঙের রোবটের মুখ, আর ওপরের হ্যালোজেন ইন্ডিকেটরগুলো যেন তাঁর এন্টেনা।

এর “মাথার” পিছনেই পাওয়া যাবে বাইটির রঙিন রিভার্স এলসিডি স্ক্রিনটি, যা স্থানীয় বাজারে এখনো অনেক প্রিমিয়াম বাইকগুলোতেও কিছুটা দুর্লভ।

স্ক্রিনটির দুপাশে সুইচগিয়ারগুলো সাধারণ মানের, তবে হেডল্যাম্প এবং DRL স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় তা বন্ধ করার কোনো নির্দিষ্ট বাটন নেই। চলতে চলতে ডিভাইস চার্জ দেওয়ার জন্য একটি USB চার্জিং পোর্ট রয়েছে, যা ঢাকা শহরে ব্যবহার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আশীর্বাদ বা অভিশাপ দুটিই হতে পারে।

রাইডার ও পিলিয়নের জন্য বাইকের সিটটি দুটি অংশে বিভক্ত। ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির চেয়ে লম্বা যে কেউ দুটিতেই আরামে বসতে পারবে। পিলিয়ন সিটের নিচে রয়েছে একটি ছোট স্টোরেজ কম্পার্টমেন্ট যেখানে টুলকিট ও কাগজপত্র রাখা যায়।

আরও একটি রবোটিক চেহারা পাওয়া যাবে এলইডি টেইল ল্যাম্পটিতে। তবে উল্লেখ্য, সামনের মতোই এখানেও TVS ইন্ডিকেটরের জন্য সেই পুরোনো ধাঁচের হ্যালোজেন ব্যবহার করা হয়েছে।

পাশ থেকেও এই বাইকটি দেখতে বেশ শার্প । ফুয়েল ট্যাংকের দুই পাশেই রয়েছে TVS-এর ব্যাজ, সেই সাথে পাশের প্যানেল ও হেডল্যাম্পে লেখা আছে “Raider” নামটি।

Raider-এর চেহারাসুরত এগ্রেসিভ হলেও এর ইঞ্জিন ডিজাইন করা হয়েছে শহরে চালানোর জন্য। ৩-ভাল্ব ইঞ্জিনটি প্রায় ১৩ হর্সপাওয়ার আর সাড়ে ১১ নিউটন মিটার টর্ক উৎপন্ন করে, যার পুরোটাই একটি পাঁচ স্পিডের গিয়ারবক্সের মাধ্যমে পেছনের চাকায় পাঠানো হয়। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য ইঞ্জিনের সাথে দেওয়া হয়েছে সাধারণ এক্সজস্ট, তবে এর সাউন্ড আমার কাছে মোটেও সাধারন মনে হয় না।

ইঞ্জিনের সাথে মিল রেখে বাইকটির সাসপেনশন ও শহুরে রাস্তার সাথে সামঞ্জস‍্যপূর্ন। সামনে দেওয়া হয়েছে সাধারণ কয়েল-স্প্রিং এবং পেছনে মনোশক। পাশাপাশি ব্রেকিংয়ের জন্য সামনে আছে ২৪০ মিমি ডিস্ক এবং পিছনে ১৩০ মিমি ড্রাম ব্রেক। এই ব্রেকগুলো Sync Braking Technology দ্বারা পরিচালিত, যা TVS-এর Combined Braking System (CBS) এর নিজস্ব বাহারি নাম।

এবার আসা যাক চালানোর অভিজ্ঞতায়।

Raider 125 চালানোর সময় যে বিষয়টি প্রথম চোখে পড়ে তা হলো এর টান বা অ্যাক্সিলারেশন, যাতে মনেই হয় না এটি একটি ১২৫ সিসির বাইক! বরং এর দ্রুত টানে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি একটা ১৫০ সিসির বাইক চালাছি।

তবে আমি মানুষ হিসাবে গঠনে একটু ছোটখাটো, আমার চেয়ে আকার-আকৃতিতে বড় মানুষের অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

ঢাকার তীব্র ট্রাফিক সামাল দিতে Raider যথেষ্ট পটু। কমিউটার হওয়ায় এর গঠন বেশ সরু, একটি ছোট ফাঁকা জায়গা পেলেই দ্রুত জ্যাম থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। চিকন দেখে অনেকেই মনে করে এই বাইকটি ধীরগতির, তাই এর তাৎক্ষণিক টান সবাইকে চমকে দেয়।

এক্সজস্টের এর কথা বলতে গেলে, এটির সাউন্ড বাইকের অন‍্যান‍্য বৈশিষ্ট্যের সাথে দারুণভাবে মানায়। আমি স্টক সেটআপেই চালাচ্ছি, কিন্তু যারা আমার সাথে রাইড করেছে বা দূর থেকে শুনেছে তারা সবাই জিজ্ঞেস করেছে এটি আফটারমার্কেট কিনা। বিশেষ করে ডাউনশিফটে রেভ-ম্যাচিংয়ের সময় এর শব্দ মোটেও ১২৫ সিসির মতো মনে হয় না।

শহরের ধির রাইডিংয়ের সময় CBS ব্রেকগুলি বেশ কাজে আসে, আমাকে আর সবসময় সামনের ব্রেক চেপে ধরার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় না । তারপরও আমার অভিজ্ঞতায় ব্রেকিং কিছুটা ধীরগতির। এখন পর্যন্ত কোনো বিপদ না হলেও হার্ড ব্রেকে বাইটের অভাব স্পষ্ট বোঝা যায়। ব্রেকের আরেকটা সমস্যা পেছনের ব্রেক অ্যাসেম্বলি: বৃষ্টির দিনে এটিতে ময়লা জমে যায় এবং কানের পর্দা ছেঁড়া এক তীক্ষ্ণ শব্দ করে।

তবে আমার কাছে Raider-এর সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো এর টায়ার, যা অত্যন্ত পাতলা। প্রচলিত অনেক বাইকের সামনের টায়ার এই বাইকের পেছনের টায়ারের চেয়ে চওড়া। তাই কর্নারগুলোতে আমাকে চরম সতর্কতার সাথে চলতে হয়, কারণ টায়ারগুলো বাঁক নেওয়ার মতো যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস দেয় না।

কমিউটার বাইক হিসেবে চিন্তা করলে এই পাতলা টায়ার গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সমস্যা হল, TVS বাইকটিতে যে পারফরম্যান্স দিয়েছে তাতে এই টায়ার আমার কাছে একটি আস্ত আপদ।

শহরের রাইডিংয়ের জন্য Raider যতটা চমৎকার, দুরপাল্লার জন্য তা ততটাই বেদনাদায়াক।

সমস্যাটা ইঞ্জিনের না।

আমি বাইকটি নিয়ে ঢাকার বাইরে দুবার গিয়েছি এবং প্রতিবারই মোটামুটি ভালো পারফর্ম করেছে। হাই-এন্ড পাওয়ারের অভাব থাকলেও তা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। হাইওয়েতে এটি ট্রাফিকের সাথে ভালোভাবে তাল মিলিয়ে চলে এবং ওভারটেক করা খুব একটা কঠিন হয় না। তবে হাইওয়ে ধরে ১০০ কিমি/ঘণ্টার বেশি গতিতে গেলে কিছুটা টালমাটাল মনে হয়।

আসল ঝামেলাটা হলো এতক্ষণ বসে থাকায়।

লং ট্যুরের কথা মাথায় রেখে Raider তৈরি করা হয়নি, এর সিট দেখলেই তা বোঝা যায়। যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় কিংবা লম্বা ট্রিপে, শক্ত সিট পশ্চাদদেশের বারোটা বাজিয়ে দেয়. ঢাকার ভেতরে ছোট রাইডের জন্য সমস্যা না হলেও দূরে কোথাও গেলে আপনার কুশন বা যাত্রা শেষে বরফ লাগবে।

তবে মজার বিষয় হলো, আমার পেছনের সিটে বসা প্রতিটা পিলিয়ন যাত্রী প্রশংসা করেছেন যে এটা অন্য কমিউটার বাইকের তুলনায় বেশ আরামদায়ক।

মাইলেজের অনুভূতিটা মিশ্র। TVS-এর ৫০ hhকিমি/লিটার মাইলেজের প্রচারনায় আমি অন্তত ৪২ থেকে ৪৫ কিমি/লিটার আশা করেছিলাম। অথচ থ্রটল শান্ত রেখে চালিয়েও এটি কখনো ৪২ কিমি/লিটার অতিক্রম করেনি, অধিকাংশ সময় ৩৬-৩৮ কিমি/লিটার মাইলেজ পেয়েছি।


অবশেষে TVS-এর আফটার-সেলস সার্ভিস নিয়ে একটু কথা বলবো। আমি বাইকটির দ্বিতীয় মালিক, তবে প্রথম স্বত্বাধিকারীর অধীনে বাইকটির সব সার্ভিসিং নিয়মিত করা হয়েছিল। আমিও অফিসিয়াল TVS সার্ভিসিং বজায় রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটি পরে আমার জন্য হিতে বিপরীত হয়।

আমার প্রথম সার্ভিসিংয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাকে বলে যে TVS-এর সার্ভিস নেটওয়ার্কের বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। যদিও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া এখন পর্যন্ত বাইকটিতে কোনো বড় সমস্যা দেখা দেয়নি।

Raider নিখুঁত নয়। ব্রেকিং আরও উন্নত হতে পারতো, টায়ার আরও ভালো দেওয়া যেত, মাইলেজ বলা যায় গড়পরতা এবং TVS তাদের আফটার-সেলস সার্ভিস দক্ষ আর গ্রাহক বান্ধব করতে পারতো।

কিন্তু প্রথম মোটরসাইকেল এবং ঢাকার ভেতরের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য যা করা দরকার সেই চাহিদা বাইকটি পূরণ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি দেখতে এর দামের চেয়ে অনেক বেশি প্রিমিয়াম লাগে, যার রয়েছে প্রচুর ফিচার, ট্রাফিকের মধ্য দিয়ে চলার নিপুণ দক্ষতা এবং সব মিলিয়ে প্রথম বাইক হিসেবে এটি সত্যিই একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা।

ইমরান আবিদ

তরুণ এক গাড়িপ্রেমী—যার আছে একটি বাইক, এক সেট ক্যামেরা এবং নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি চরম উদাসীনতা। আরও আছে উচ্চ গতিতে বাইক চালানোর সময় ফোন হারিয়ে ফেলার অভ্যাস।

Previous
Previous

শুভ্র পঙ্খিরাজ: Royal Enfield Hunter 350