শুভ্র পঙ্খিরাজ: Royal Enfield Hunter 350

ছবিঃ ইমরান আবিদ

“Made like a gun, goes like a bullet” — স্লোগানটি Royal Enfield-এর। এককালের ব্রিটিশ এবং বর্তমানে ভারতীয় শতবর্ষী এই মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডটি বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখে কয়েক বছর আগে। আর আমি নিশ্চিত, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে কি পাগলাটে ছিল সেই সময়টা।

তাদের শো রুমের সামনে তৈরি হয়েছিল দীর্ঘ লাইন, বারবার ক্রাশ করছিল তাদের ওয়েবসাইট। কিন্তু তারপরও শত শত মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের প্রিয় Royal Enfield-টি প্রি-অর্ডার করার জন্য।

বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশে এই ব্র্যান্ড টির একদল শক্ত অনুসারী আছে, যারা একটি Royal Enfield কেনার জন্য বছরের পর বছর তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছিল। তবে আমাদের প্রশ্নসাপেক্ষ সিসি সীমাবদ্ধতার কারণে এতদিন এই ঐতিহাসিক ব্যান্ডটি ছিল সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এরপর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। অনেকেই এখন তাদের স্বপ্নের বাইকটি কিনতে পেরেছে, ফলে বাইকটি নিয়ে সেই উন্মাদনাও অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছে।

তবে সত্যিকারের সমঝদাররা মুখোমুখি হয়েছিলেন ভিন্ন এক সমস্যার।

Royal Enfield Bangladesh বাজারে যোগ দিয়েছিল তিনটি মডেল দিয়ে: Classic, Bullet এবং Hunter। আর এখানেই বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন Hunter ভক্তরা।

প্রথম দিকে দেশে এই বাইকটি শুধু দুটি রঙে পাওয়া যেত: লাল ও নীল. কিন্তু অনেক ভক্তের কাছে তার একটিও খুব একটা পছন্দের ছিল না। তারা চেয়েছিল সাদার ওপর কালোর নিখুঁত ছোঁয়া। আর আজ, প্রায় এক বছর পর সেই সাদা-কালোর কম্বিনেশন এসেছে বাজারে, আর সেই চমৎকার বাইকের প্রথম উদাহরণ আজ আমাদের হাতে।"

একটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করে নেওয়া ভালো। যারা Royal Enfield কেনেন, তারা দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রয়োজন বিবেচনা করে মোটরসাইকেল কেনেন না। তারা মূলত সৌখিন মানুষ; যারা বাইক কিনে রুচিপূর্ণ নকশা আর রাজকীয় উপস্থিতির জন্য।

বাইকটির দিকে একবার তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। Hunter-এর শরীরে কোন চকচকে প্লাস্টিক নেই বললেই চলে। আপনি যা স্পর্শ করবেন তার প্রায় সবকিছুতেই একটি শক্তপোক্ত ভাব আছে—ধাতব ট্যাংক, চামড়ার সিট, ক্লিক ক্লিক করা সুইচ—“Built like a gun” স্লোগানটি যেন এই বাইকের প্রতিটি অঙ্গে সত্য হয়ে উঠেছে।

এই বাইকের রোড প্রেজেন্স সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই।

সাধারণ কমিউটার বাইকের মতো এতে কোনো কৃত্রিম বা জোরপূর্বক বাঁকানো খোলস নেই। এর প্রতিটি লাইন মসৃণ, মার্জিত এবং নান্দনিকভাবে প্রবাহমান; এটি কেবল আপনাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায় না, বরং রাজকীয়ভাবে আপনার উপস্থিতি জানান দেয়।

আর সেই জানান দেওয়ার কাজটিতে বাইকটির ইঞ্জিন অত্যন্ত পারদর্শী। এর খাঁটি “ডুগ ডুগ” শব্দ দূর থেকেই আগমন ঘোষণা করে। শক্তির কথা বললে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর ৩৪৯ সিসির সিঙ্গেল সিলিন্ডার ইঞ্জিনটি ৬,১০০ RPM-এ ২০.২ হর্সপাওয়ার এবং ৪,০০০ RPM-এ ২৭ N·m টর্ক উৎপন্ন করে। তবে কে হিসেব করতে যাচ্ছে? তাড়াহুড়ো করে ঘুরে বেড়ানোর জন্য কেউ এই বাইকটি কিনে না।

এই বাইকের আরোহীরা প্রতিদিন সকালে তাদের হেলমেটটা হাতে নেয়, এর লম্বা সিটে আয়েশ করে বসে, চাবিতে মোচড় দেয়, আর প্রথম গিয়ারটি দিয়ে অলস মেজাজে সামনে এগিয়ে যায়।

১৮১ কেজির ওজন সত্ত্বেও চালানোর সময় বাইকটি বিন্দুমাত্র ভারী মনে হয়না। অবশ্যই ওজনের একটা অনুভূতি থাকে, তবে ৯৭০ মিলিমিটার আরামদায়ক এই সিটে বসে শহর ঘুরে বেড়ানোর একটি আলাদা আনন্দ আছে।

এর ১৭ ইঞ্চির চাকাগুলোতে রয়েছে টিউবলেস টায়ার, আর বাইকটি থামানোর জন্য রয়েছে ABS সহ ডিস্ক ব্রেক। ক্লাসিক ডিজাইনের হলেও সামনের এনালগ মিটারের মাঝে আছে একটি ডিজিটাল ডিসপ্লে, যা বাইকটির পুরোনো চেহারার সাথে যুক্ত করেছে আজকের দিনের জরুরি প্রযুক্তি।

আধুনিক Royal Enfield-এর সৌন্দর্য ঠিক এখানেই: দেখতে কয়েক দশক পুরোনো হলেও তার ইঞ্জিনে আছে অত্যাধুনিক ফুয়েল ইনজেকশন এবং ডিস্কে ABS-এর মতো জরুরী সুরক্ষা প্রযুক্তি।

তবে এ বাইকের কিছু সমস্যা আছে। মজার ব্যাপার হলো বেশিরভাগ সমস্যাই বাইকটির নিজস্ব নয়, বরং সমস্যা হচ্ছে ঢাকার ট্রাফিক। Royal Enfield Hunter-টি তৈরি করেছিল খোলা রাস্তায় লম্বা দূরত্ব পার করার জন্য। ঢাকার ঘন ট্রাফিক ঠেলে চলতে চলতে এই বাইকের ইঞ্জিন খুব তাড়াতাড়ি গরম হয়ে যায়। ট্রাফিকে চালানোর সময় ইঞ্জিনটি এতই উত্তপ্ত হয়ে গিয়েছিল যে জিন্সের প্যান্ট ভেদ করেও সেই গরম তাপ আমার পায়ে এসে লাগছিল।

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে বাইকটির ক্লাচ। এই বাইকের পাঁচটি গিয়ার রয়েছে যা একটি স্লিপার ক্লাচের মাধ্যমে বদল করতে হয়। চলন্ত অবস্থায় এটি কোন সমস্যাই না। তবে ট্রাফিকের ভেতর ফলস নিউট্রাল হয় অহরহ।

আর তেলের খরচ তো আছেই। Royal Enfield-এর মোটরসাইকেলগুলি কখনোই তেল সাশ্রয়ী ছিল না, আর প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে এই বাইকটি প্রতি লিটারে ৩২ কিলোমিটার যাবে। বাস্তবে আপনি ধরে নিতে পারেন আমাদের দেশের তেল আর ট্রাফিক মিলিয়ে আপনি এর অর্ধেক পাবেন।

পরিশেষে এই মার্জিত ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আভিজাত্য উপভোগ করার জন্য আপনাকে রাজকীয় খাজনা দিতে হবে। Royal Enfield Bangladesh প্রতিটি Hunter-এর মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রায় ৩,৭১,৫০০ টাকা। আর এই সাদা রংটির জন্য আপনাকে খরচ করতে হবে আরো অতিরিক্ত ২০,০০০ টাকা

তবে বলা বাহুল্য, যারা Royal Enfield-এর খদ্দের, তাদের এতে কিছু আসে যায় না।

এ বাইক কিনবে এক ধরনের পাগল। যাদের কোথাও পৌছানোর কোন তাড়া নাই, নেই তেল খরচের ভয়, হয়তো দৈনন্দিন মোটরসাইকেল ব্যবহারের কোনো বাস্তবিক প্রয়োজনও তাদের নেই তারা কিনছেন এক মনকাড়া, ভাবগম্ভীর্যপূর্ণ ও রাজকীয় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিদর্শন—যা তাদের প্রতিদিনের যাতায়াতকে এক একটি রোমাঞ্চকর ভ্রমণ গাঁথায় রূপ দিবে।

রাহবার আল হক

অটোমোবাইল সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিতে রাহবার আল হকের রয়েছে ১০ বছরেরও বেশি সময়ের পথচলা। দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS), দ্য টারবাইন এবং অটোড্রাইভ বিডি-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মে সম্পাদকীয় পরিচালনা, নতুন কনটেন্ট টিম গড়ে তোলা এবং টেস্ট ড্রাইভের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

Next
Next

ছোট ইঞ্জিনে বড় চমক: TVS Raider 125