ঢাকার রাস্তায় MG-র জোড়া বৈদ্যুতিক ধামাকা
ছবিঃ ইমরান আবিদ
MG বাংলাদেশে নিজেদের বৈদ্যুতিক উপস্থিতি বাড়াতে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছে। শুরুটা হয়েছিল HS মাঝারি ক্রসওভার দিয়ে—যা ব্র্যান্ডটির Super Hybrid ড্রাইভ সিস্টেমের সহায়তায় কেবল ব্যাটারি শক্তিতেই ১০০ কিলোমিটারের বেশি চলতে পারে। এরপর আসে তুলনামূলক ছোট ZS। তবে MG তাদের তৃতীয় হাইব্রিড গাড়ির জন্য উল্টো পথ অনুসরণ করে দেশের মাটিতে নিয়ে এসেছে তিন সারির আসনবিশিষ্ট বিশাল MGS9 রেঞ্জ-এক্সটেন্ডেড SUV।
আর স্বাভাবিকভাবেই, MG সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই গাড়ির উন্মোচনটি তার আকারের মতোই রাজকীয় ও বিশাল হওয়া উচিত।
এরই জের ধরে গত শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬-এ রাজধানীর Bangladesh-China Friendship Conference Center (BCFCC)-এ আয়োজিত এই জমকালো অনুষ্ঠানে MG তাদের দুটি নতুন গাড়ির মোড়ক উন্মোচন করে।
হ্যাঁ, একটি নয় দুটি। তবে দ্বিতীয়টা ছিল লুকানো একটি চমক।
প্রথমে অনুষ্ঠানটা নিয়ে একটু কথা বলা যাক। আয়োজনের পার্কিং লট ছিল টেস্ট-ড্রাইভের জন্য গাড়িতে ভরা—সারি সারি ZS আর HS থেকে শুরু করে একাধিক MGS9 সাজানো ছিল একটি সংক্ষিপ্ত টেস্ট ট্র্যাকের পাশে, যাতে অতিথিরা গাড়িগুলো চালিয়ে দেখার সুযোগ পান। সম্পূর্ণ খোলা রাস্তা না হলেও ইলেকট্রিক মোটরের তাৎক্ষণিক পাওয়ারের অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য জায়গা ছিল যথেষ্ট।
তবে মূল চমকটি ছিল হলের ভেতরে। MG ঢাকার বুকে তৈরি করেছিল ছোট্ট এক টুকরো ব্রিটেন। ঢোকার মুখেই ছিল বাকিংহাম প্যালেসের King’s Guard-এর আদলে পোশাক পড়া দুজন নিরাপত্তাকর্মী। আর ভেতরে পা রাখা মাত্রই মনে হবে পৌছে গেছেন লন্ডনের কোন এক রাস্তায়, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পার্ক করা ছিল একাধিক Cyberster এবং একটি ১৯৭১ সালের ক্লাসিক MGB। চারপাশে ছিল ফুড কোর্ট, গানবাজনা এবং অবশ্যই একটি লাল টেলিফোন বুথ।
হলের শেষ প্রান্তে অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চ। যেখানে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় সাড়ে ছয়টার দিকে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই মঞ্চে ওঠেন MG বাংলাদেশের ডিভিশনাল ডিরেক্টর এবং দেশের দ্রুততম মানব ইমরান জামান খান। বাজার পরিস্থিতি এবং ইলেকট্রিক গাড়ির সুবিধা নিয়ে একটি হাস্যরসপূর্ণ উপস্থাপনা দেন তিনি।
তিনি বলেন, "এস৯ পিএইচইভি সেভেন-সিট এসইউভি সেগমেন্টে সত্যিকার অর্থে দরকারী কিছু নিয়ে এসেছে। গ্রাহকরা একটি বড় ফ্যামিলি এসইউভি থেকে যে জায়গা আশা করেন, তার পাশাপাশি স্মার্ট প্রযুক্তি, উন্নত জ্বালানি দক্ষতা এবং দৈনন্দিন ড্রাইভিংয়ের জন্য আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স উপভোগ করতে পারবেন। আমরা গ্রাহকদের গাড়িটি নিজে এসে অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য স্বাগত জানাতে উন্মুখ হয়ে আছি।"
এরপর মাইক তুলে দেওয়া হয় আয়রনম্যান বিজয়ী আর মার্সিডিজ-বেঞ্জ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরমান রাশিদ এবং MG বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হোসেন মাশনুর চৌধুরী-এর হাতে। তারা উভয়েই MGS9 এবং স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। মাশনুর চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশি পরিবারগুলো প্রায়শই দৈনন্দিন যাতায়াত এবং দীর্ঘ সফর উভয়ের জন্যই একটি একক এসইউভির ওপর ভরসা করে। এমজি এস৯ পিএইচইভি একটি প্রশস্ত কেবিন, দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী বড় ইলেকট্রিক রেঞ্জ এবং দীর্ঘ যাত্রায় পেট্রল ইঞ্জিনের নমনীয়তা দিয়ে সেই প্রয়োজনের জবাব দেয়। আমরা বাজারে এই নতুন বিকল্পটি নিয়ে আসতে পেরে আনন্দিত।’
#WhatCarAwards-এ "Best Plug-in Hybrid 7-Seat SUV" খেতাব জয়ী MG S9 PHEV মূলত যেসব পরিবার দৈনন্দিন যাতায়াত এবং দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রা—উভয় ক্ষেত্রেই একটিমাত্র গাড়ির ওপর নির্ভর করতে চান, তাদের কথা মাথায় রেখেই নকশা করা হয়েছে।
এর শক্তি আসে একটি ১.৫-লিটার টার্বোচার্জড পেট্রোল ইঞ্জিন ও একটি ইলেকট্রিক মোটরের সমন্বয়ে, যার সাথে রয়েছে ২৪.৭ kWh ব্যাটারি প্যাক—যা কেবল ব্যাটারি শক্তিতেই ১০০ কিলোমিটারের বেশি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ড্রাইভিং এর সুবিধা দেয়। MG-র দাবি, ব্যাটারি ফুল চার্জ এবং জ্বালানি ট্যাংক পূর্ণ করলে এটি মোট ১,০০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিতে পারবে।
৪,৯৮৩ মিমি দৈর্ঘ্য এবং ২,৯১৫ মিমি হুইলবেসের এই গাড়িটি তিনটি সারিতেই প্রাপ্তবয়স্ক যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সহ বসার ব্যবস্থা প্রদান করে, আর এর ১৯০ মিমি গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স দেশের রাস্তার জন্য বেশ উপযোগী। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির সিটগুলো ভাঁজ করলে এর লাগেজ ধারণক্ষমতা ২,০৯৩ লিটার পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
ভেতরের ফিচারের তালিকা দীর্ঘ। এতে রয়েছে প্যানোরামিক সানরুফ, মাসাজিং ফ্রন্ট সিট, ট্রাই-জোন ক্লাইমেট কন্ট্রোল, অ্যাম্বিয়েন্ট লাইটিং, পাওয়ারড টেলগেট, ওয়্যারলেস Apple CarPlay ও Android Auto সহ দুটি ১২.৩ ইঞ্চি ডিজিটাল ডিসপ্লে, ওয়্যারলেস স্মার্টফোন চার্জিং এবং ১২-স্পিকারের Bose অডিও সিস্টেম।
সুরক্ষার জন্য এতে রয়েছে MG-র Auto Pilot সুয়েট, যা অ্যাডাপ্টিভ ক্রুজ কন্ট্রোল, অটোনোমাস ইমার্জেন্সি ব্রেকিং, লেন-কিপিং অ্যাসিস্ট্যান্স, ব্লাইন্ড-স্পট ডিটেকশন এবং রিয়ার ক্রস-ট্রাফিক অ্যালার্ট সহ লেভেল ২ ড্রাইভার-অ্যাসিস্ট্যান্স ফিচার। সেই সাথে রয়েছে একটি ৩৬০-ডিগ্রি হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা সিস্টেম, যা জনাকীর্ণ শহরের রাস্তা এবং সংকীর্ণ পার্কিং স্পেসে গাড়ি চালানো সহজ করে তোলে।
MG Bangladesh প্রথম বিক্রি হওয়া ১০০টি ইউনিটের জন্য ৬৩.৯ লাখ টাকা প্রারম্ভিক মূল্য ঘোষণা করেছে, যার পর নিয়মিত খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হবে ৬৪.৯ লাখ টাকা। এই প্যাকেজের সাথে দুটি ফ্রি ১১ kW হোম চার্জিং স্টেশন দেওয়া হবে এবং এতে রয়েছে আট বছরের ম্যানুফ্যাকচারার ওয়ারেন্টি।
তবে এই সন্ধ্যার বিস্ময় সেখানেই শেষ হয়নি। MG মঞ্চের পেছনে আরেকটি গাড়ি প্রস্তুত রেখেছিল, যা ইভেন্টটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ডাবল-ফিচারে পরিণত করে।
এই বর্ণাঢ্ উন্মোচনের পর মঞ্চে নিয়ে আসা হয় MGS6 সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ক্রসওভারটি। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এই মডেলটির মাধ্যমে MG স্থানীয় লাইনআপে প্রায় তিন বছর পর পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে। অথচ মজার বিষয় হল, বাংলাদেশে আইনিভাবে রেজিস্ট্রেশনযোগ্য প্রথম সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে আসার কৃতিত্ব ছিল এই MG-র তাদের প্রথম প্রজন্মের ZS EV দিয়ে।
সুতরাং, ZS EV দিয়ে শুরু করে, প্লাগ-ইন হাইব্রিডে পা রেখে এবং ইলেকট্রিক রেঞ্জ আরও বিস্তৃত করার পর, MG এখন আবার বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ইলেকট্রিক গাড়ি বিক্রির ধারায় ফিরে এসেছে। আর এবার তারা একা আসেনি, সাথে দলবল নিয়েই এসেছে।
অটোমোটিভ জগতে অত্যন্ত সাধারণ ও বাস্তবসম্মত কোনো গাড়ির ভেতর শক্তিশালী ইঞ্জিন বসিয়ে দেওয়ার কৌশলটি নতুন কিছু নয়। প্রত্যেক গাড়ি প্রতিষ্ঠানেই তাদের জনপ্রিয় গাড়িগুলোর একটি “স্লিপার” রূপ তৈরি করে।
তবে Toyota এই ব্যাপারে এক কাঠি সরেস।