Toyota Axio GT: সাধারণ চেহারায় এক গতির দানব

ছবিঃ ইমরান আবিদ

অটোমোটিভ জগতে অত্যন্ত সাধারণ ও বাস্তবসম্মত কোনো গাড়ির ভেতর শক্তিশালী ইঞ্জিন বসিয়ে দেওয়ার কৌশলটি নতুন কিছু নয়। প্রত্যেক গাড়ি প্রতিষ্ঠানেই তাদের জনপ্রিয় গাড়িগুলোর একটি “স্লিপার” রূপ তৈরি করে।

তবে Toyota এই ব্যাপারে এক কাঠি সরেস।

আগেই বলে রাখা যাক স্লিপার শব্দটার অর্থ কি। স্লিপার হলো এমন ধরনের গাড়ি যা বাইরে থেকে দেখতে একদম সাধারণ মনে হলেও ভেতরে আসলে এক গতির দানব লুকিয়ে থাকে।

সাধারণ গাড়ি বানানোর রাজা এই জাপানি প্রতিষ্ঠানটি মাঝে মাঝেই তাদের দৈনন্দিন যাতায়াতের গাড়ির মধ্যে একটি দানবীয় ইঞ্জিন গুঁজে দেয়। ১৯৭০ সালের মূল Corolla Levin-এর কথাই ধরা যাক; তারা Celica-র স্পোর্টস গাড়িটির টুইন-ক্যাম ১.৬-লিটার 2T-G ইঞ্জিনটি নিয়ে একটি সাধারণ দুই দরজার Corolla-র ভেতরে বসিয়ে তৈরি করেছিল জনসাধারণের জন্য চমৎকার একটি সহজলভ্য দ্রুতগতির যান। অবশ্য বাহিরে থেকে সেটি বোঝার উপায় ছিল না।

এই লুকোনো গতির ধারা Toyota আজও ধরে রেখেছে। এখনো মাঝে মাঝেই তারা তাদের সবচেয়ে সাধারণ একটি গাড়িকে কারখানার উৎপাদন সারি থেকে উঠিয়ে তাতে জুড়ে দেয় দারুন সব পারফরম্যান্স পার্টস আর তৈরি করে সাধাসিধে চেহারার এক হিংস্র দানব।

আর এটি আমাদের নিয়ে আসে সেই Levin Corolla-র সরাসরি উত্তরসূরি Axio-র কাছে। আপনি যদি ঢাকায় থাকেন, তবে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় আপনি এই গাড়িটি কমপক্ষে বিশ বার রাস্তায় দেখতে পাবেন। এককালে সাশ্রয়ী মূল্যের এই বাহনটি সাধারণ মানুষের কাছে দৈনন্দিন বাজারসদাই বা সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার বহুল পরিচিত ও ব্যবহৃত একটি বাহন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, মোটরপত্রের ক্যামেরা গাড়িও একটি Axio। তবে আজকে আমরা যে Axio-টি কথা বলছি তার সাথে আমাদের Axio-র বডি প্যানেল ছাড়া আর কোন মিল নেই।

এই নির্দিষ্ট গাড়িটি কোনো সাধারণ Axio নয়; এটি ২০০৯ সালের Toyota Axio GT, খোদ জাপানে কারখানায় তৈরি একটি দ্রুতগতির সংস্করণ। প্রথমেই যে বিষয়টি নজর কাড়ে তা হলো গাড়িটি আর দশটা Axio-র তুলনায় বেশ নিচু। লিপ স্পয়লার, সাইডস্কার্ট আর TRD Sportivo সাসপেনশনের কারণে গাড়িটিকে দেখে মনে হয় এটি প্রায় মাটি আকড়ে আছে।

তবে আসল চমকটা আছে সামনের হুডের নিচে।

মানুষ যখন এই গাড়িগুলোকে রাস্তার ধীরগতির লেন মেনে চলতে দেখে অভ্যস্ত, তখন এই বিশেষ মডেলটির বনেটের নিচে রয়েছে ফ্যাক্টরির ১.৫-লিটার 1NZ-FTE টার্বোচার্জড ইঞ্জিন, যার সাথে যুক্ত পাঁচ-স্পিড ম্যানুয়াল গিয়ারবক্স। যেখানে একটি সাধারন Axio বাংলাদেশের তেলে টেনেটুনে ১০০ হর্সপাওয়ার উৎপন্ন করতে পারে সেখানে এই গাড়িটি ফ্যাক্টরি থেকে উৎপন্ন করে ১৪৮ ব্রেক হর্স পাওয়ার আর প্রায় ১৪৫ পাউন্ড-ফুট টর্ক। যা সাধারণ Axio-র তুলনায় কাগজে-কলমে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি পাওয়ারফুল।

এই গাড়িটির মালিক Mr. Silvee কোভিড পরবর্তী সময়ে তার Starlet GT বিক্রি করে এই Axio-টি সংগ্রহ করেন।

ফ্যাক্টরি GT পাওয়া এমনিতেই খুব কঠিন, আর সেটিকে সূক্ষ্মভাবে নিখুঁত রূপ দেওয়া গাড়ি খুঁজে পাওয়া আরও বিরল। তাই কেনার সময় গাড়িটির লুকানো কোনো ত্রুটি বা সমস্যা আছে কিনা তা না জেনেই তিনি চট করে কিনে ফেলেছিলেন। তবে তা নিয়ে তার কোনো আফসোস নেই।

গাড়ির ইঞ্জিনটি নিয়ে কোন কারসাজি করেননি তিনি। এটি একদম স্টক বুস্ট লেভেলে চলে। তবে গাড়িটির পারফরম্যান্সের ভারসাম্য নষ্ট না করে Mr. Silvee সুরক্ষা আর নিরাপদ ড্রাইভিং এর জন্য প্রয়োজনীয় কিছু পরিবর্তন এনেছেন: আরো কার্যকর ব্রেকিংয়ের জন‍্য পেছনের ড্রাম ব্রেক ফেলে সেখানে যুক্ত করা হয়েছে ডিস্ক ব্রেক সেটআপ এবং চ‍্যাসিসের মোচড় কমানোর জন্য সামনে ও পেছনে বসানো হয়েছে Ultra Racing স্ট্রাট বার। এছাড়া এতে ফ্যাক্টরির তৈরি TRD সোয়ে বার, রিয়ার টরশন বিম বার, সাসপেনশন এবং এমনকি অরিজিনাল OEM হুইলও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

ভেতরটা দেখতে অনেকটা গতানুগতিক Axio-র মতোই, তবে পার্থক্য হলো আকর্ষণীয় ট্যাকোমিটার এবং চমৎকার চামড়ায় মোড়ানো গিয়ার নব, যা আপনাকে ম্যানুয়াল ড্রাইভের আমন্ত্রণ জানায়।

একটি প্রচলিত Axio-র তুলনায় গাড়িটি চালানোর অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। এর ১৭ ইঞ্চি চাকা ছোটখাটো গর্ত বা বাম্পে এটি কিছুটা শক্ত অনুভূতি দিলেও রাইড বেশ শান্ত ও শব্দহীন। ম্যানুয়াল গিয়ারবক্সটি চালানোর অভিজ্ঞতা এক অসাধারণ আনন্দের। অতিরিক্ত অত্যাচার সামলানোর জন্য এতে একটি মজবুত ক্লাচ কভার দেওয়া হয়েছে , তবে সেটিকে অস্বস্তিকর রকমের শক্ত করা হয়নি। আপনি সারাদিন যানজটে এই গাড়ি চালিয়েও কোনো ক্লান্তি অনুভব করবেন না।

এর থ্রটল প্রেস করার রোমাঞ্চ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়, তাও আমি চেষ্টা করছি। এক্সিলারেটরে পা রাখামাত্রই টার্বো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং কম আরপিএমেই বুস্ট পাওয়া যায়। প্রতিবার এক্সিলারেটর চাপার সাথে সাথে গাড়িটি তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়, আর প্রতিবারই প্যাডেলটি আরও কিছুটা জোরে চাপতে ইচ্ছে করে। গাড়িটি ওজনে হালকা, আর এর টর্ক নিয়ন্ত্রণে রেখে কাঙ্ক্ষিত অভিমুখে সঠিক ট্র্যাকশন বজায় রাখার জন্য রয়েছে মেকানিক্যাল LSD।

এটি সাধারণ কোনো অতি-উত্তপ্ত রাক্ষুসে গাড়ি নয়, বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক নিখুঁত স্লিপার গাড়ি। নিত‍্য দিনের ব্যবহারের জন্য গাড়িটি চমৎকার পারফর্ম করে। এটি হয়তো Nürburgring-এ কোনো ল্যাপ রেকর্ড ভাঙবে না, তবে ঢাকার বিশৃঙ্খল রাস্তা সামলাতে কিংবা দূরপাল্লার রোড ট্রিপে এটির টার্বোচার্জড গতি চাহিদা মতো সঠিক স্থানে থেমে যায়, যা পুরো স্লিপার ভাবটিকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেয়।

প্রাত‍্যহিক কাজগুলো ঝামেলা ছাড়াই সামলানো থেকে শুরু করে বেশ গতিতে চালানো—সবকিছুতেই গত দেড় দশক ধরে গাড়িটি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য রয়েছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে এটি একটি খাঁটি স্লিপার কার: ওপর থেকে দেখতে কয়েকটি কসমেটিক টাচসহ একেবারে মামুলি একটি প্রতিদিনের সেডান মনে হলেও, একটি ডাউনশিফ্ট করে অ্যাক্সিলারেটর চেপে ধরলেই আশেপাশের মানুষ ভাবতে বাধ্য হবে যে এই ফ্যামিলি কারটি চোখের পলকে কোথায় হারিয়ে গেল!

ইমরান আবিদ

তরুণ এক গাড়িপ্রেমী—যার আছে একটি বাইক, এক সেট ক্যামেরা এবং নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি চরম উদাসীনতা। আরও আছে উচ্চ গতিতে বাইক চালানোর সময় ফোন হারিয়ে ফেলার অভ্যাস।

Previous
Previous

সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ৪টি গাড়ি

Next
Next

ঢাকার রাস্তায় MG-র জোড়া বৈদ্যুতিক ধামাকা