অটোমোবাইল আপসাইকেলিং : উচ্ছিষ্ট থেকে গাড়ির পার্টস

কফির খোলস থেকে গাড়ির হেডলাইট কিংবা প্লাস্টিকের বোতল থেকে গাড়ির সিট!  অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো এভাবেই জঞ্জাল থেকে তৈরি করছে ব্যবহারযোগ্য গাড়ির নানা অংশ।

কিন্তু এত কিছু থাকতে উচ্ছিষ্ট কেন? উত্তরটা সহজ- কারন আমরা বর্জ‍্য উৎপাদনে বেশি দক্ষ।

গড়ে আমরা প্রতি বছর ১.৩ বিলিয়ন টন আবর্জনা উৎপাদন করি, যার বেশিরভাগই স্রেফ এক জায়গায় স্তূপ করে ফেলে রাখা বা পুড়িয়ে ফেলা হয়। তবে এখন কিছু গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থকে অভিনব উপায়ে  নতুন ও ঝকঝকে যন্ত্রাংশে রূপান্তর করছে। 

প্রাকৃতিক আঁশের কম্পোজিট প্যানেল

সুপারকার এর জগতে Carbon fibre বেশ জনপ্রিয় কেননা তা হালকা, মজবুত এবং শক্ত। কিন্তু এটি রিসাইকেল করা অত্যন্ত কঠিন, আর শুধু ফেলে দেওয়াটাও প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর। এক্ষেত্রে BMW-এর সমাধানটি যথেষ্ট  চমৎকার ও সহজ: কার্বনের জায়গায় প্রাকৃতিক আঁশ বা ফাইবার ব্যবহার করা।

সুইস ক্লিন-টেক প্রতিষ্ঠান Bcomp-এর সাথে যৌথভাবে এই নতুন উপাদানটি তৈরির   উপযুক্ততা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই প্রাকৃতিক আঁশটি মূলত ফ্ল্যাক্স বা তিসি গাছের কান্ড থেকে আহরিত একটি শক্তিশালী ও প্রাকৃতিক উপাদান।

শিগগিরই এটি ভবিষ্যৎ BMW M কারগুলোর ভেতরে ও বাইরে জায়গা করে নেবে। BMW ইতিমধ্যেই এই নতুন কম্পোজিট তাদের আসন্ন M3 প্রোটোটাইপে প্রদর্শন করেছে। এটি সত্যি সত্যিই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে কি না, তা জানা যাবে আগামী বছর।

কফির খোসার হেডলাইট কভার

বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ফাস্ট-ফুড চেইন McDonald's প্রচুর পরিমাণে খাবারের  উচ্ছিষ্ট তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার টন Coffee chaff বা কফি বিন রোস্ট করার সময় আলাদা হয়ে যাওয়া খোসা বর্জ্য হিসেবে পাওয়া  যায়। একসময় এই সমস্ত খোসা ল্যান্ডফিলে জমিয়ে রেখে পরে তা পুড়িয়ে ফেলা হতো, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু ২০১৯ সালে এই খোলোসের একটি অসাধারণ ব্যবহার খুঁজে পায় Ford Motor Company। তারা এই খোসাকে ব্যবহার করে তৈরি করে উচ্চ-তাপমাত্রা সহনশীল এক প্লাস্টিক যা দিয়ে হেডলাইট কভার সহ বিভিন্ন  প্লাস্টিক যন্ত্রাংশ তৈরি করা যায়। সাধারণ প্লাস্টিকের তুলনায় এই পণ্যগুলোর ওজন হয় ২০% কম এবং তৈরিতে খরচ হয় ২৫% কম শক্তি। 

বলাবাহুল্য, খোসাগুলি প্লাস্টিকে রূপান্তরিত করার পর প্লাস্টিকের মতই আচরণ করে। অর্থাৎ কেউ একটি Ford গাড়ির হেডলাইট গুঁড়ো করে কিন্তু আবার কফি বানাতে পারবে না!

প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে সিট কভার 

আমরা প্রতি বছর প্রায় ৩০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি করি, যার প্রায় অর্ধেকই PET bottle-এর মতো সীমিত ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক। একক ব্যবহারের জন্যই তৈরি এ প্লাস্টিকগুলি এবং বেশিরভাগই সময়ই তা পুনর্ব্যবহার না করে ফেলে দেওয়া হয়। এখানেই গাড়ি নির্মাতারা এসব প্লাস্টিকের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান খুঁজে পেয়েছে। 

Audi এই বোতলগুলোকে সংগ্রহ করে  গাড়ির সিটের উপাদানে রূপান্তর করা শুরু করেছে। তারা এই বোতলগুলো ছোট ছোট ফালিতে কেটে নেয় এবং তা গলিয়ে একটি তরল পেস্টে রূপান্তর করে। এরপর সেই পেস্ট থেকে সুতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে সেই সুতা দিয়েই কাপড় বুনে ব্র্যান্ড-নিউ Audi গাড়ির ভেতরের অংশ সাজানো হয়। 

বলা বাহুল্য, কারও প্লাস্টিকের সিটে বসা নিয়ে প্রেস্টিজে লাগলে Audi খুব খুশির সাথেই তা চামড়া দিয়ে বদলে দেবে, তবে তার জন্য ক্রেতাকে একটু বেশি টাকা গুনতে হবে।

রদ্দি কাপড়ের সাউন্ড-ডেডনিং প্যানেল

আমরা প্রায় সবাই কিছুদিন পরপরই পোশাকের আলমারি নতুন করে সাজাই। আর তা করতে গিয়ে অনেক পুরোনো কাপড়ের জায়গা হয় সরাসরি আবর্জনার স্তুপে। Nissan এগুলোর জন্য আরেকটি ভিন্ন ব্যবহার খুঁজে পেয়েছে। তাদের সাশ্রয়ী EV মডেল Leaf-এ ব্যবহৃত হচ্ছে বাতিল কাপড় দিয়ে তৈরি সাউন্ড-ডেডনিং বা শব্দরোধী প্যানেল। তারা এই কাপড়গুলোকে ছিঁড়ে কাঁচা ফাইবারে রূপান্তর করে এবং পরে সেগুলোকে চাপ দিয়ে শিট তৈরি করে। Nissan প্রতি মাসে প্রায় ৩০০ টন কাপড় রিসাইকেল করে, যা নতুন কাঁচামাল দিয়ে গাড়ির নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রাংশ তৈরির নির্ভরতা কমিয়ে দিচ্ছে।

Previous
Previous

বডি’স ইন হোয়াইট: গাড়ির চ্যাসিসের রকমারি

Next
Next

Curated Cars 2026: ঢাকার বুকে গাড়ির স্বর্গোদ্যান