বডি’স ইন হোয়াইট: গাড়ির চ্যাসিসের রকমারি
গাড়ি আমরা অনেকেই পছন্দ করি কিন্তু আমাদের হয়তো জানা নেই খোলসের নিচে গাড়িটা কিভাবে তৈরি করা হয়।
সব গাড়ি তৈরি করা হয় একটি চ্যাসিসের উপর। তাই প্রথমে জেনে নেওয়া যাক চ্যাসিস জিনিসটা কি: সংক্ষেপে বললে—যে কাঠামোর সাথে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নাট-বোল্ট দিয়ে যুক্ত করে গাড়িটি তৈরি করা হয়, তাকেই চ্যাসিস বলা বলে। আধুনিক অটোমোবাইলে বিভিন্ন ধরনের চ্যাসিস ব্যবহৃত হয়, যার প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু সুবিধা এবং সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত গাড়ির চ্যাসিসগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
বডি-অন-ফ্রেম (Body-on-frame)
ব্যবহার: Trucks, SUVs
গাড়িতে সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত চ্যাসিস এটি। মজার ব্যাপার হলো এই চ্যাসিস নকশা অটোমোবাইল যুগের থেকেও পুরনো, মূলত ঘোড়ার গাড়ির আমল থেকেই এই ফ্রেম বা কাঠামোর প্রচলন রয়েছে।
নাম থেকেই বোঝা যায়, , বডি-অন-ফ্রেম নকশায় মূল অংশ থাকে দুটি: যাত্রী বহনের বডি এবং ওজন বহনের ফ্রেম। ড্রাইভট্রেন, সাসপেনশন এবং অন্যান্য ভারী মেকানিক্যাল পার্টস একটি ধাতব ফ্রেমের ওপর বসানো হয়। তারপর এই ফ্রেমের উপরেই যাত্রীদের কেবিন ও লাগেজ স্পেস সংবলিত বডিটি স্থাপন করা হয়।
চমৎকার ভার বহনের ক্ষমতাসম্পন্ন বডি-অন-ফ্রেম ডিজাইনটি ভাঙাচোরা ও দুর্গম রাস্তায় চলার জন্য চমৎকার। এর ব্যবহারিক উপযোগিতাও অনেক যেমন যাত্রী পরিবহন বা বাণিজ্যিক - যে কোন কাজের উপযোগী বডি এই ফ্রেমের ওপর মোটামুটি সহজেই জুড়ে দেওয়া যায়। অন্যদিকে এই চ্যাসিসটি তৈরি করা বেশ ব্যয়বহুল, ওজনে অনেক ভারি এবং বডি ও ফ্রেম আলাদা হওয়ায় দুর্ঘটনায় ক্র্যাশ সেফটি হয় তুলনামূলক দুর্বল।
এসব সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ সাধারণ গাড়ি নির্মাতারা এই চ্যাসিস আর ব্যবহার করেন না। বর্তমানে মূলত ট্রাক এবং অফ-রোড SUV-তে বডি-অন-ফ্রেম ব্যবহৃত হয়, কারণ এসব গাড়িতে ভারী বোঝা বহন এবং রুক্ষ পথ পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
ইউনিবডি (Unibody)
ব্যবহার: Sedan, hatchbacks ইত্যাদি
ইউনিবডি বা "ইউনিটাইজড বডি" বর্তমানে গাড়ী তৈরির সবচেয়ে জনপ্রিয় কৌশল। এই নকশাটি বডি-অন-ফ্রেমের সম্পূর্ণ বিপরীত। এই পদ্ধতিতে গাড়ির বডি এবং ফ্রেম আলাদা না রেখে দুটোকে একসাথে জুড়ে দিয়ে একটি শক্তিশালী একক কাঠামো তৈরি করা হয়।
এই ডিজাইনে আলাদা কোন ফ্রেম থাকেনা; ওজন নেওয়ার মূল কাঠামোটি বডির ভেতরেই একবারে তৈরি করা হয় যা বডি-অন-ফ্রেমের তুলনায় হালকা ও মজবুত হয় এবং অনেকাংশেই তা বেশি নিরাপদ।
ফ্রেম চ্যাসিসের তুলনায় ইউনিবডি তৈরি করা ব্যয়সাশ্রয়ী, সুলভ এবং জ্বালানিবান্ধব। এছাড়া ফ্রেমটি গাড়ির সাথে একিভূত থাকায় এটি অনেক বেশি ক্র্যাশ প্রোটেকশন বা যাত্রী নিরাপত্তা দেয়। ইউনিবডি এমনভাবেই নকশা করা হয় যাতে দুর্ঘটনার সময় গাড়ির কাঠামোটি ধাক্কার সমস্ত শক্তি নিজে শুষে নেয় এবং ভেতরে যাত্রীদের অক্ষত রাখে।
ইউনিবডি ডিজাইনের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এর বহুমুখী ব্যবহারের অনুপযোগিতা; সমন্বিত গঠনের কারণে একই কাঠামোর ওপর ভিন্ন ধরনের বডি বসিয়ে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। তা সত্ত্বেও উন্নত যাত্রী নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সুবিধার কারণে ইউনিবডি এখন অটোমোবাইল শিল্পের মূল মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।
প্ল্যাটফর্ম ফ্রেম (Platform frame)
ব্যবহার: Microcars, electric vehicles
বডি-অন-ফ্রেম ও ইউনিবডির ঠিক মাঝামাঝি একটি নকশা হলো প্ল্যাটফর্ম ফ্রেম।
এক্ষেত্রে প্রথাগত ফ্রেমের পরিবর্তে একটি চারকোনা বাক্স বা প্লাটফর্ম ব্যবহার করা হয়, যার সাথে যাত্রীদের কেবিনের মেঝে সরাসরি যুক্ত থাকে।
ঐতিহাসিকভাবে প্ল্যাটফর্ম ফ্রেম ছোট সাশ্রয়ী গাড়িতে ব্যবহৃত হতো, কারণ ভারী ফুল-সাইজ ফ্রেমের তুলনায় এগুলো ছিল হালকা ও সাশ্রয়ী। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো Volkswagen Beetle, যার বিশেষ "বডি-অন-প্যান" কাঠামো অটোমোবাইল ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক গাড়ির ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
১৯৬০-এর দশকের দিকে প্ল্যাটফর্ম ফ্রেমের ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে ইলেকট্রিক গাড়ির জনপ্রিয়তার সাথে সাথে এটি আবারও ফিরে এসেছে। Tesla-র Model S-এর মতো EV-তে প্ল্যাটফর্ম চ্যাসিস ব্যবহৃত হচ্ছে , যেখানে যাত্রী কেবিনের নিচে থাকা "প্ল্যাটফর্ম" টি ব্যাটারি সেলগুলো রাখার মূল বাক্স বা নিরাপদ আধার হিসেবে কাজ করে।
স্পেস ফ্রেম (Space frame)
ব্যবহার: রেস গাড়ি ও অন্যান্য বিশেষায়িত বাহন
স্পেস ফ্রেম চ্যাসিস তৈরি করা হয় খুব নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য। মূলত শক্ত ধাতব টিউব দিয়ে ত্রিভুজাকৃতির বিন্যাসে জোড়া দিয়ে এই ফ্রেমগুলো তৈরি করা হয়, যা কাঠামোকে সর্বোচ্চ দৃঢ়তা দেয়।
সাধারণত প্রতিটি গাড়ির জন্য চ্যাসিসগুলি হাতে বানানো হয় এবং সেই কাঠামোতে গাড়ির সাসপেনশন, ইঞ্জিন এবং বডি প্যানেলগুলো একটি ত্রি-মাত্রিক কাঠামোর সাথে যুক্ত থাকে।
স্পেস ফ্রেম ডিজাইন সর্বনিম্ন ওজনী গাড়িকে সর্বোচ্চ শক্ত কাঠামো প্রদান করে। অন্যদিকে এ ধরনের কাঠামোর ভিতর ব্যবহারযোগ্য জায়গা থাকে না বললেই চলে। এবং প্রত্যেকটি হাতে বানাতে হয় বলে এগুলো তৈরিতে প্রচুর কায়িক শ্রমের প্রয়োজন পড়ে। তাই এ ধরনের চ্যাসিস মূলত খুব বিশেষায়িত গাড়িতে ব্যবহার করা হয়, যেমন—রেস কার এবং অল-টেরেন ভেহিকেল।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ কাস্টমাইজড প্রকৃতির হওয়ার কারণে সীমিত পরিসরে গাড়ি তৈরি করা বুটিক কারমেকারদের কাছে এই ডিজাইন অত্যন্ত পছন্দের ; কারণ অল্পসংখ্যক গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে এই প্ল্যাটফর্মে প্রয়োজনীয় সময় ও পরিশ্রম দেওয়া সার্থক হয়।
মাঝে মাঝে কিছু পুরনো গাড়িতে এমন সব বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যা দেখে মনে হয় গাড়িটি ডিজাইনার ভবিষ্যৎ থেকে নিয়ে থেকে এসেছেন। আর কখনো কখনো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলি এমন ভবিষ্যৎমুখী গাড়ি তৈরি করে যা বাজারের চাহিদা ও সময়ের থেকেও যুগ যুগ এগিয়ে থাকে। এরকম চারটি গাড়ি নিয়ে কিছু কথা বলব আজ।