ড্যাশবোর্ড ওয়ার্নিং লাইটের সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা

ছবিঃ Unsplash

গাড়ির ইগনিশন চালু করলেই ইনস্ট্রুমেন্ট ক্লাস্টার যেন রঙিন ক্রিসমাস ট্রির মতো ঝলমল করে ওঠে। হরেক রকম  আইকনযুক্ত এই লাইটগুলো মূলত গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের একটি দ্রুত স্ট্যাটাস চেক সম্পন্ন  করে। তবে ইঞ্জিন চালু করার ১০-২০ সেকেন্ড পরও যদি কোনো ওয়ার্নিং লাইট জ্বলতে থাকে, তাহলে  বুঝে নিতে  হবে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশে কোনো ত্রুটি  রয়েছে এবং তা জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের প্রয়োজন।

কিন্তু এই আইকনগুলোর অর্থ আসলে কি? চলুন জেনে নেওয়া যাক সচরাচর দৃশ্যমান ওয়ার্নিং লাইটগুলোর অর্থ এবং তার প্রেক্ষিতে আপনার করনীয়।

চেক ইঞ্জিন লাইট (Check engine light)

নাম থেকেই স্পষ্ট, এই লাইটটি জ্বলার অর্থ হলো ইঞ্জিনে কোনো ধরনের গোলযোগ দেখা দিয়েছে। আধুনিক গাড়িগুলোতে প্রচুর সেন্সর থাকে যাদের কাজই হচ্ছে অনবরত ইন্জিনের সার্বিক পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করা। তাই এর যেকোনো একটিতে কোন অসঙ্গতি ধরা পড়লেই ব্যবহারকারীকে সতর্ক করতে ড‍্যাশবোর্ডে এই লাইটটি জ্বলে ওঠে।

তবে লাইটটি কোন সাধারণ সমস্যা যেমন তারের ঢিলেঢালা সংযোগ ও হতে পারে আবার ইনটেক ম্যানিফোল্ড লিক কিংবা কম্প্রেশন লসের মতো গুরুতর সমস্যার সংকেতও হতে পারে। অনেক সময় গাড়ি CNG জ্বালানিতে তে রূপান্তর করলেও এই লাইট জ্বলে উঠতে পারে, কারণ বেশিরভাগ গাড়ি এ ধরনের জ্বালানির উপযোগী করে তৈরি নয়। তাই এমন পরিস্থিতিতে পড়লে গাড়িটি অভিজ্ঞ মেকানিক দ্বারা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াই শ্রেয়। 

ABS ওয়ার্নিং লাইট

Anti-lock braking systems সংক্ষেপে ABS নামে পরিচিত, যা ব্রেকিং সিস্টেমের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি উচ্চ গতিতে ব্রেক করার সময় চাকা লক হয়ে যাওয়া রোধ করে, ফলে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে এবং রাস্তা থেকে ছিটকে পড়েনা। গাড়ি চালানোর সময় এই লাইট জ্বলে উঠলে বুঝতে হবে সিস্টেমে কোনো ত্রুটি দেখা দিয়েছে। মনে রাখতে হবে এটি একটি অত্যন্ত জরুরি নিরাপত্তা ফিচার, তাই এই সংকেত দেখলেই যত দ্রুত সম্ভব গাড়িটি গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া উচিত।

এয়ারব্যাগ ওয়ার্নিং লাইট

এয়ারব্যাগ হলো গাড়ির ভেতরের বিভিন্ন অংশে লুকিয়ে থাকা বিশেষ এক ধরনের বালিশ। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রীদের আঘাতের তীব্রতা থেকে রক্ষা করতে এটি নিমিষেই বাতাসে ফুলে ওঠে। পুরো প্রক্রিয়াটি বিভিন্ন সেন্সর ও জটিল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে কাজ করে। এই সুরক্ষা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের ত্রুটি দেখা দিলেই এই ওয়ার্নিং লাইট জ্বলে ওঠে। এয়ারব্যাগ বহু প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে রক্ষা করেছে, তাই জীবন রক্ষাকারী এই লাইট জ্বলে উঠলে কালবিলম্ব না করে সার্ভিস সেন্টারে যাওয়া জরুরি।

ইঞ্জিন টেম্পারেচার ওয়ার্নিং লাইট

অধিকাংশ আধুনিক ইঞ্জিন লিকুইড-কুলড প্রযুক্তি ব্যবহার করে। অর্থাৎ, ইঞ্জিনের চারপাশ দিয়ে তরল কুল্যান্ট প্রবাহিত হয়ে অতিরিক্ত তাপ সরিয়ে নিয়ে যায়। ইঞ্জিন অয়েলের মতোই এই কুল্যান্টও মাঝে মাঝে পরিবর্তন করতে হয়, নয়তো মোটর অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এই পরিস্থিতি তৈরি হলে ইঞ্জিন থার্মোস্ট্যাট ওয়ার্নিং লাইটটি জ্বালিয়ে দেয়। 

লাইটটি জ্বলে উঠলে গাড়ি বন্ধ করে অন্তত আধা থেকে এক ঘণ্টা ইঞ্জিন ঠান্ডা হতে দিন। তারপর ওনার্স ম্যানুয়াল দেখে সঠিক কুল্যান্ট দিয়ে রেডিয়েটর আবার ভর্তি করুন। তবুও সমস্যা সমাধান না হলে অভিজ্ঞ মেকানিকের সহায়তা নিন।

ব্যাটারি লাইট

গাড়ির সব ধরনের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ব্যাটারি প্রয়োজন হয়। গাড়ি চলার সময় ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাটারি চার্জ করে, কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে ব্যাটারি খুব বেশি সময় ব‍্যাকআপ দিতে পারে না। ইঞ্জিন বন্ধ রেখে ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম চালু রাখলে এই লাইটটি সতর্কবার্তা হিসেবে জ্বলে ওঠে। ২০ মিনিটের মধ্যেই অধিকাংশ গাড়ির ব‍্যাটারির পুরো চার্জ শেষ হয়ে যায়।ফলে গাড়ি অচল হয়ে যায় এবং এক্সটার্নাল ব্যাটারি দিয়ে জাম্প-স্টার্ট করতে হয়। আর যদি ইঞ্জিন চালু থাকা অবস্থায়ও লাইটটি জ্বলে থাকে, তবে বুঝতে হবে ইঞ্জিন ব্যাটারি চার্জ করতে পারছে না এবং অবিলম্বে এটি মেকানিক দিয়ে পরীক্ষা করানো উচিত।

ব্রেক সিস্টেম ওয়ার্নিং লাইট

পার্কিং ব্রেক চালু থাকলে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এই লাইটটি জ্বলে থাকে। এতে পার্কিং থেকে গাড়ি বের করার সময় বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানো যায় এবং ভুলবশত ব্রেক টানা অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে  ট্রান্সমিশনের ক্ষতি হওয়া রোধ হয়। তবে পার্কিং ব্রেক নামিয়ে ফেলার পরও যদি লাইটটি জ্বলে থাকে, তবে বুঝতে হবে ব্রেকিং সিস্টেমে গুরুতর কোনো ত্রুটি রয়েছে। এমন অবস্থায় গাড়ি ড্রাইভ করা উচিত নয়, কারণ ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক নিয়ে গাড়ি চালানো আপনার এবং রাস্তায় থাকা অন্য সবার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

টায়ার প্রেশার ওয়ার্নিং লাইট

একসময় বিলাসবহুল গাড়ির ফিচার হলেও এখন অনেক নতুন সাধারণ গাড়িতে টায়ার প্রেশার মনিটরিং সেন্সর দেওয়া থাকে। এই সেন্সরগুলো প্রতিটি টায়ারের অভ্যন্তরীণ বাতাসের চাপ পর্যবেক্ষণ করে। টায়ারের বাতাসের চাপ বিপজ্জনক মাত্রায় কমে গেলে এই লাইটটি জ্বলে ওঠে, যাতে চালক দ্রুত টায়ার পরীক্ষা করে বাতাস দিয়ে নিতে পারেন।

চেক ইঞ্জিন অয়েল লাইট

ইঞ্জিনের স্থায়িত্ব বাড়াতে ইঞ্জিন অয়েল বা লুব্রিকেন্ট অপরিহার্য। এটি ইঞ্জিনের গতিশীল পার্টসগুলোকে ঠান্ডা রাখতে এবং ঘর্ষণজনিত ক্ষয় রোধে সাহায্য করে। সময়ের সাথে সাথে ইঞ্জিন অয়েলের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর তা পরিবর্তন করতে হয়। সাধারণত প্রতি ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ কিলোমিটার পর অথবা প্রতি দুই বছরে ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন করা নিয়ম। অয়েলের কার্যক্ষমতা কমে গেলে (যা অয়েল প্রেসার দিয়ে পরিমাপ করা হয়) এই ওয়ার্নিং লাইট জ্বলে ওঠে। এক্ষেত্রে ইঞ্জিন অয়েল টপ-আপ বা পরিবর্তন করলেই লাইটটি নিভে যায়। তবে বারবার লাইট জ্বলে উঠলে বুঝতে হবে অয়েল অতিরিক্ত পুড়ছে এবং ইঞ্জিনটি চেক করানো প্রয়োজন।

ফগ লাইট

ফগ লাইট অন করা থাকলে এই আইকনটি জ্বলে ওঠে। এটি কোনো সতর্কবার্তা নয়, বরং চালককে লাইট চালু থাকার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার সাধারণ একটি নির্দেশক।

সিটবেল্ট রিমাইন্ডার

সিটবেল্ট বাঁধা না থাকলে এই রিমাইন্ডার লাইটটি জ্বলে ওঠে। গাড়িতে শিশু থাকলে অথবা সাময়িক আরামের চেয়ে নিরাপত্তাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া মানুষদের জন্য এটি খুবই উপযোগী একটি সতর্কবার্তা।

রাহবার আল হক

অটোমোবাইল সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিতে রাহবার আল হকের রয়েছে ১০ বছরেরও বেশি সময়ের পথচলা। দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS), দ্য টারবাইন এবং অটোড্রাইভ বিডি-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মে সম্পাদকীয় পরিচালনা, নতুন কনটেন্ট টিম গড়ে তোলা এবং টেস্ট ড্রাইভের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

Previous
Previous

গাড়ি ধোয়ার টুকিটাকি

Next
Next

বডি’স ইন হোয়াইট: গাড়ির চ্যাসিসের রকমারি