সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ৪টি গাড়ি

ছবিঃ সংগৃহীত

মাঝে মাঝে কিছু পুরনো গাড়িতে এমন সব বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যা দেখে মনে হয় গাড়িটি ডিজাইনার ভবিষ্যৎ থেকে নিয়ে থেকে এসেছেন। আর কখনো কখনো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলি এমন ভবিষ্যৎমুখী গাড়ি তৈরি করে যা বাজারের চাহিদা ও সময়ের থেকেও যুগ যুগ এগিয়ে থাকে। এরকম চারটি গাড়ি নিয়ে কিছু কথা বলব আজ।

ছবিঃ Chrysler Airflow

Chrysler Airflow (1934 - 1937)

অটোমোবাইল শিল্পে গ্রাহক চাহিদা তৈরি হওয়ার আগেই নতুন প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তার বড় এক বাস্তব উদাহরণ হলো Chrysler Airflow।

Chrysler-এর প্রকৌশলী Carl Breer-এর ডিজাইন করা Airflow ছিল অ্যারোডাইনামিক এফিসিয়েন্সি বা বাতাসের বাধা কমানোর বিষয়টি মাথায় রেখে তৈরি করা প্রথম গাড়িগুলোর একটি। এতে ছিল ইউনিবডি গঠন এবং ঢালু ফ্রন্ট গ্রিলের সাথে মসৃণ হেডলাইট—যা সেকালের বাক্সসদৃশ বা ঘোড়ার গাড়ির মতো কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও বৈপ্লবিক ছিল।

দুঃখের বিষয় হল, এই নকশাটি এতটাই বৈপ্লবিক ছিল যে সাধারণ মানুষ এই যুগান্তকারী পরিবর্তনটি গ্রহণই করতে পারেননি । আর তৎকালীন সময়ে জ্বালানির দাম ছিলো নিতান্তই কম এবং সড়কের অবস্থাও বেশ খারাপ থাকায় দক্ষতার চেয়ে গাড়ির বাহ্যিক রূপই মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়াও শুরুর দিকের কিছু মান জনিত ত্রুটি বিক্রিতে ধস নামায়। ফলে একসময়ের বৈপ্লবিক এই Airflow-কে আজ অটোমোবাইল ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

ছবিঃ Buick Riviera

Buick Riviera (1986 - 1993)

বাইরে থেকে দেখলে সপ্তম প্রজন্মের Buick Riviera খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। এটি ছিল সাধারণ চেহারার সামনের চাকা চালিত দুই দরজার একটি গাড়ি, মূলত তৈরি করা হয়েছিল গতির জন্য নয় স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য। তবে GM এমন সাদামাটা এই গাড়িতে এমন এক প্রযুক্তি উপস্থাপন করেছিল যা সময়ের থেকে দুই দশক এগিয়ে ছিল।

Riviera ছিল বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক গাড়ি যাতে ব্যবহার করা হয়েছিল একটি ৯ ইঞ্চির টাচস্ক্রিন ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম। কালো ও সবুজ CRT ডিসপ্লেটি বর্তমান স্প্রিংগুলোর তুলনায় একেবারে আদিম প্রযুক্তি কিন্তু তারপরও আঙ্গুল দিয়েই সে স্ক্রিনে সবকিছু ব্যবহার করা যেত।

মজার ব্যাপার হলো হলো, নতুন এই প্রযুক্তিটি সেই যুগের মানুষের জন্য অত্যন্ত নির্ভরযোগ্যতাহীন এবং বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হয়। অনেকেই অভিযোগ করে তারা স্ক্রিনের দিকে তাকাতে গিয়ে রাস্তার দিকে ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারছেন না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ১৯৯০ সালে Buick এই সিস্টেমটি অফার করা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।

ভাগ্যের পরিহাস, বর্তমান গাড়ি নির্মাতারা সেই অভিযোগটির কথা একেবারেই ভুলে গেছেন।

ছবিঃ GM EV1

GM EV1 (1996 - 1999)

সম্ভবত অটোমোবাইল ইতিহাসের একটি অন্যতম ভুল পদক্ষেপ ছিল GM-এর EV1—যা আজও কোম্পানিটিকে তাড়া করে বেড়ায়। California Air Resources Board-এর একটি বিধিবদ্ধ শর্ত পূরণের জন্য গাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে আমেরিকার প্রধান গাড়ি নির্মাতাদের অন্তত একটি জিরো-ইমিশন বা নির্গমনহীন গাড়ি বাজারজাতকরণ বাধ্যতামূলক ছিল।

GM হিসাব করে দেখেছিল যে তারা EV1 দিয়ে কোনো মুনাফা করতে পারবে না। তাই কোম্পানিটি ১,১০০টি ইউনিট তৈরি করে এবং মাসে ২০৫ থেকে ৫০০ ডলারের মতো চড়া ভাড়ায় লিজ দেয়। বাধ্যবাধকতা শেষ হওয়ার পর গাড়িগুলো ধ্বংস করে ফেলার পরিকল্পনা ছিল GM-এর, কারণ তারা আশা করেনি গাড়িটি ব্যবহারকারীদের মধ্যে এত সাড়া ফেলবে।

কিন্তু তাদের সেই ধারণা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়; লিজ নেওয়া গ্রাহকদের অনেকেই গাড়িটি এতটাই ভালোবেসে ফেলেন যে তারা এটি সরাসরি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে সেই প্রস্তাবগুলোতে কান না দিয়ে GM সব গাড়ি ফেরত নিয়ে স্ক্র্যাপ করে নষ্ট করে ফেলে, আর মাত্র ৪০টি অকেজো ইউনিট বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জাদুঘরে হস্তান্তর করা হয়।

এই সিদ্ধান্তটি GM-এর ইতিহাসে একটি বড় দাগ হয়ে রয়েছে, কারণ ড্রাইভট্রেনের যে প্রযুক্তিতে তারা একসময় শীর্ষে ছিল, আজ সেই প্রযুক্তিতেই অন্যদের সাথে টেক্কা দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছে।

ছবিঃ NSU Ro80

NSU Ro80 (1967 - 1977)

যদিও Mazda নামটি রোটারি ইঞ্জিনের সমার্থক হয়ে উঠেছে, তবে এই অদ্ভুত ইঞ্জিনটি প্রথম বাজারে আনার চেষ্টা তারা করেনি। বরং এই ইঞ্জিন গাড়িতে ব্যবহারের প্রথম প্রচেষ্টা করেছিল বিলুপ্ত জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান NSU। Ro80 নামের একটি অত্যন্ত আধুনিক এবং যুগোপযোগী পারিবারিক সেডানে বসানো হয়েছিল তৎকালীন সময়ের বিচারে বৈপ্লবিক এই মোটর।

দুঃখজনকভাবে, রোটারি ইঞ্জিনটি রক্ষণাবেক্ষণের দিক থেকে এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়; কারণ এই ইঞ্জিনের সমস্যাযুক্ত অ্যাপেক্স সিল (apex seal)—যে সমস্যার সাথে এমনকি আধুনিক রোটারি ইঞ্জিনের মালিকরাও খুব ভালোভাবে পরিচিত—কোম্পানির প্রচুর অর্থ এবং সুনাম নষ্ট করে। ফলস্বরূপ কোম্পানিটি শেষ পর্যন্ত দেউলিয়া হয়ে যায় এবং Volkswagen Group-এর সাথে একীভূত হয়।

রাহবার আল হক

অটোমোবাইল সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিতে রাহবার আল হকের রয়েছে ১০ বছরেরও বেশি সময়ের পথচলা। দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS), দ্য টারবাইন এবং অটোড্রাইভ বিডি-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মে সম্পাদকীয় পরিচালনা, নতুন কনটেন্ট টিম গড়ে তোলা এবং টেস্ট ড্রাইভের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

Next
Next

Toyota Axio GT: সাধারণ চেহারায় এক গতির দানব