ভুলে যাওয়া পাঁচটি অসাধারণ কনসেপ্ট কার
ছবিঃ সংগৃহীত
কনসেপ্ট গাড়িগুলোর কাজই হলো গাড়ি নির্মাতারা ভবিষ্যতে কী পরিকল্পনা করছেন তার একটি ঝলক দেখানো। কিন্তু কখনো কখনো নির্মাতারা এমন কিছু দুর্দান্ত গাড়ি সামনে নিয়ে আসেন, যা উৎপাদনে যাবে না খবরটা মনে পড়লেই দুঃখ লাগে। এমন পাঁচটি অসাধারণ কনসেপ্ট কার নিচে তুলে ধরা হলো।
এই তালিকায় থাকা প্রতিটি মডেলই যুক্তরাষ্ট্রের। অন্য দেশের গাড়িগুলোর কথা না হয় আরেক দিন বলা যাবে।
1965 Bertone Mustang
চমকপ্রদ সব পরীক্ষামূলক Mustang- এর তালিকা যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই দীর্ঘ। তবে ইতালীয় ডিজাইন স্টুডিও Bertone-এর তৈরি এই একক মডেলটি তাদের মধ্যেও অন্যতম। ডিজাইনার Giorgetto Giugiaro-র নকশা করা এই ইতালিয়ান Mustang মডেলটি ১৯৬৫ সালের New York Auto Show-তে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল। গাড়িটিতে ছিল চমৎকার ইতালীয় স্টাইলিং, রিট্র্যাক্টেবল হেডল্যাম্প এবং সাইড ভেন্ট। গাড়িটিতে সম্ভবত একটি Ford Windsor V8 ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছিল, যা ২০০ হর্সপাওয়ার এবং ৩৮২ Nm টর্ক উৎপন্ন করতে পারত।
দুঃখজনকভাবে, এটি কেবল প্রদর্শনীর জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং Ford-এর কখনোই গাড়িটি উৎপাদনে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। তবে এটি এই তালিকার একমাত্র গাড়ি, যার বর্তমান অবস্থান অজ্ঞাত; কারণ অটো শো শেষ হওয়ার পর গাড়িটি কার্যত সাধারণ মানুষের চোখের আড়াল হয়ে যায়।
2004 Chrysler ME Four-Twelve
Daimler-Chrysler যুগে বাতিল হয়ে যাওয়া চমৎকার গাড়িগুলো নিয়ে আলাদা একটি বড় তালিকা তৈরি করা সম্ভব, তবে এখানে আমরা দুটি মডেলে সীমাবদ্ধ থাকব। প্রথমটা Chrysler ME Four-Twelve যার নামের অর্থ মিড-ইঞ্জিন, ফোর-টার্বো, টুয়েলভ-সিলিন্ডার। গাড়িটি ছিল Chrysler ডিজাইন টিমের জন্য এক অবিশ্বাস্য অর্জন। তৎকালীন সময়ের ব্র্যান্ডটির অন্য গাড়িগুলোর তুলনায় ME Four-Twelve সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আধুনিক। চার-টার্বোর AMG V12 ইঞ্জিনচালিত এই ৮৫০ হর্সপাওয়ার এবং ১,১৫০ Nm টর্ক উৎপন্নকারী দানবটির ওজন ছিল মাত্র ১,৩১০ কেজি; যার পাওয়ার-টু-ওয়েট রেশিও দাঁড়ায় ১.৫ কেজি/হর্সপাওয়ার। মাত্র ২.৯ সেকেন্ডে ০–১০০ কিমি/ঘণ্টা গতি তুলতে সক্ষম এই গাড়ির আনুমানিক সর্বোচ্চ গতি ছিল ৪০০ কিমি/ঘণ্টা।
Chrysler এই দুর্দান্ত দানবটিকে উৎপাদনে নেওয়ার ব্যাপারে গভীরভাবে বিবেচনা করছিল, কিন্তু রহস্যময় কোন কারণে শেষ পর্যন্ত পিছু হটে। গুজব হল, Daimler গাড়িটি বাতিল করতে বাধ্য করেছিল, কারণ Mercedes-Benz SLR McLaren-এর ডিজাইনাররা মেনে নিতে পারেননি যে একটি আমেরিকান কোম্পানি একই ইঞ্জিন ব্যবহার করে তাদের চেয়ে চমৎকার এক গাড়ি বানিয়ে ফেলেছে। গাড়িটি এককালে Walter P. Chrysler Museum-এ প্রদর্শিত ছিল, তবে মিউজিয়ামটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এটি Chrysler-এর নিজস্ব সংগ্রহে স্থানান্তর করা হয়।
2002 Lincoln Continental
Continental-এর পুনরুজ্জীবন এবং পরবর্তীতে বিদায়ের আগে, Lincoln ২০০২ সালে একবার এই ঐতিহ্যবাহী নামটি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। ২০০২ সালের Los Angeles Auto Show-তে উন্মোচিত এই রেট্রো-ফিউচারিস্টিক বিলাসবহুল সেডানটিতে ছিল সুইসাইড ডোর এবং তিনটি স্লাইডিং স্টোরেজ ড্রয়ারযুক্ত স্বয়ংক্রিয় ট্রাঙ্ক। লাক্সারি ফিচারের দিক থেকে এই কনসেপ্টটি সময়ের চেয়ে কয়েক দশক এগিয়ে ছিল। গাড়িটিতে উপস্থিত ছিল অ্যাম্বিয়েন্ট লাইটিং, ফুল ডিজিটাল মিটার ক্লাস্টার এবং পেছনের যাত্রীদের জন্য আলাদা ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেমের মতো আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। সামনে বসানো হয়েছিল একটি ৬.০-লিটার 12 সিলিন্ডারের ইঞ্জিন, যা ৪১৪ হর্সপাওয়ার ও ৫৫৮ Nm টর্ক উৎপন্ন করত এবং একটি ছয়-স্পিড অটোমেটিক ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে মসৃণভাবে পেছনের চাকায় শক্তি পাঠাত।
শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খরচ মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় প্রকল্পটি বাতিল করা হয় এবং ২০১০ সালের আগস্টে Lincoln এই একমাত্র প্রোটোটাইপটি নিলামে বিক্রি করে দেয়। এরপর গাড়িটি কয়েকবার হাতবদল হয়ে বর্তমানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সংগ্রহে রয়েছে।
1976 Chevrolet Aerovette
সর্বশেষ প্রজন্মের মডেলে Chevrolet অবশেষে মধ্য-ইঞ্জিন লেআউটে স্থানান্তরিত হলেও, তাদের ডিজাইনাররা দীর্ঘদিন ধরেই এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছিলেন। সত্তরের দশকে Aerovette কনসেপ্টের মাধ্যমে তারা এই স্বপ্নকে প্রায় সত্যি করে ফেলেছিলেন। XP-895 নামের এই মিড-ইঞ্জিন প্রোটোটাইপটি তৈরি করেছিলেন "Father of the Corvette" খ্যাত Zora Arkus-Duntov। মূলত এটি তৈরি হয়েছিল ৪২০ হর্সপাওয়ারের ফোর-রোটর Wankel ইঞ্জিন পরীক্ষা করার জন্য, যা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। Wankel প্রজেক্ট স্থগিত হওয়ার তিন বছর পর GM-এর স্টাইলিং প্রধান Bill Mitchell পরীক্ষামূলক মোটরগুলো বদলে একটি ৬.৬-লিটার Chevy V8 ইঞ্জিন বসান এবং নতুন C4 হিসেবে Aerovette-কে উৎপাদনের জন্য সবুজ সংকেত দেন। তবে Duntov-এর উত্তরসূরী Dave McLellan নানা কারণে ফ্রন্ট-ইঞ্জিন লেআউটেই অটল থাকার সিদ্ধান্ত নেন, যা মিড-ইঞ্জিন 'Vette-এর আগমনকে আরও ৪৪ বছর পিছিয়ে দেয়। কনসেপ্টটি আজও টিকে রয়েছে, এবং বর্তমানে GM Heritage Collection-এর অংশ হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
2005 Chrysler Firepower
২০০৫ সালের North American International Auto Show-তে প্রদর্শিত Firepower ছিল যেন একটি মার্জিত রূপ পাওয়া Dodge Viper। Hydro Silver Pearl রঙে সাজানো Viper-ভিত্তিক এই গ্র্যান্ড ট্যুরারটিতে ছিল মসৃণ ও মার্জিত বাঁক, যার চোখধাঁধানো সৌন্দর্য সচরাচর Aston Martin-এর মতো ব্র্যান্ডগুলোর কাছেই আশা করা যায়। সেই আভিজাত্যের ছোঁয়া ভেতরেও বজায় ছিল; প্লাস্টিকের জায়গা দখল করেছিল টু-টোন Ocean Deep Blue ও Oyster চামড়ার আপহোলস্ট্রি, সাথে ম্যাপেল কাঠের অ্যাকসেন্ট এবং পালিশ করা অ্যালুমিনিয়াম সুইচগিয়ার। এই গাড়ির হৃদপিণ্ড ছিল একটি ৬.১-লিটার V8 ইঞ্জিন, যা ৪২৫ হর্সপাওয়ার এবং ৭২৫ Nm টর্ক উৎপন্ন করত। একটি আদর্শ গ্র্যান্ড ট্যুরার হিসেবে এতে ব্যবহার করা হয়েছিল একটি ফাইভ-স্পিড অটোমেটিক গিয়ারবক্স, যা ০–১০০ কিমি/ঘণ্টা গতি তুলতে সময় নিত মাত্র ৪.৫ সেকেন্ড।
গাড়িটি দেখতে অবিশ্বাস্য রকমের আকর্ষণীয় হলেও এটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়। সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অব ডিজাইন Trevor Creed-এর মতে, Chrysler গাড়িটি লাভজনক উপায়ে উৎপাদনের কোনো কার্যকর পথ খুঁজে পায়নি। এই একমাত্র Firepower মডেলটি বর্তমানে ইন্ডিয়ানার অবার্নে অবস্থিত National Auto and Truck Museum-এ সংরক্ষিত রয়েছে।
মাঝে মাঝে কিছু পুরনো গাড়িতে এমন সব বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যা দেখে মনে হয় গাড়িটি ডিজাইনার ভবিষ্যৎ থেকে নিয়ে থেকে এসেছেন। আর কখনো কখনো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলি এমন ভবিষ্যৎমুখী গাড়ি তৈরি করে যা বাজারের চাহিদা ও সময়ের থেকেও যুগ যুগ এগিয়ে থাকে। এরকম চারটি গাড়ি নিয়ে কিছু কথা বলব আজ।