বৃষ্টির মৌসুমে মোটরসাইকেলের যত্ন

ছবিঃ Unsplash

বর্ষায় রাস্তায় মোটরসাইকেল চালানো যেন একটি পরীক্ষা। তাই এই সময়ে নিরাপদ রাইডিংয়ের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের যত্ন নেওয়াটাও জরুরি।

রাস্তা পিচ্ছিল, কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও আবার পানির নিচে লুকিয়ে থাকে গর্ত। তার ওপর বৃষ্টির পানিতে কমে যায় দৃষ্টিগোচরতা এবং টায়ারের গ্রিপ। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পথ পাড়ি দিতে প্রয়োজন হয় বাড়তি সতর্কতা।

তবে ঝুঁকিটা শুধু দুর্ঘটনার নয়। ক্রমাগত কাদাপানির সংস্পর্শে মোটরসাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশেও তৈরি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা।

ছবিঃ Pexels

আসল বিপদ জলাবদ্ধতায়

ঝরে যাওয়া বৃষ্টির পানি সাধারণত মোটরসাইকেলের জন্য বড় সমস্যা নয়। কিন্তু জমে থাকা পানিতে ইঞ্জিনের এয়ার ইনটেক বা এয়ার ফিল্টারের মুখ ডুবে গেলে গেলে ‘হাইড্রোলক’ তৈরি হতে পারে। বাতাসের মতো পানি সংকুচিত হতে পারে না, ফলে ইঞ্জিন চালু করার চেষ্টা করলে পিস্টন ও কানেক্টিং রডের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই পানির গভীরতা যদি ইঞ্জিনের কেসিং বা এক্সস্টের কাছাকাছি চলে যায়, সেখানে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর পানির মধ্যে চলতে গিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আবার স্টার্ট দেওয়ার মত বোকামি করা যাবেনা।

বরং হুইল বেয়ারিং, সাসপেনশন লিংকেজ এবং ব্রেক কম্পোনেন্টে ক্ষতি এড়াতে মোটরসাইকেলটি শুকনো জায়গায় নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করানোই নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

ছবিঃ Pexels

চেইন, ব্রেক ও টায়ারে বাড়তি নজর

বর্ষাকালে মোটরসাইকেলের সবচেয়ে বেশি যত্ন প্রয়োজন এমন যন্ত্রাংশগুলোর একটি হলো ড্রাইভ চেইন। বৃষ্টির পানি চেইনের লুব্রিক্যান্ট ধুয়ে ফেলে, আর কাদা ও রাস্তার ধুলোবালি চেইনের ক্ষয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

ভেজা রাইডের পর চেইন পরিষ্কার করে শুকিয়ে প্রয়োজনমতো লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করা উচিত। অবহেলিত চেইন শুধু দ্রুত ক্ষয় হয় না, মোটরসাইকেলের পারফরম্যান্স, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পুরো ড্রাইভট্রেনের আয়ুতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বৃষ্টিতে ব্রেকের আচরণও বদলে যায়। ভেজা ও কাদামাখা ব্রেক প্যাডে ঘর্ষণ কমে যেতে পারে। তাই অল্প পানির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর নিরাপদ গতিতে ধীরে ধীরে কয়েকবার ব্রেক করে নেওয়া ভালো, যাতে ব্রেকিং সারফেস স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

আর টায়ারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ট্রেড। ভালো ট্রেড পানি সরিয়ে টায়ারকে রাস্তার সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে সাহায্য করে। অন‍্যদিকে ক্ষয়ে যাওয়া টায়ারে পিছলে যাবার ঝুঁকিতে থাকে। এছাড়া টায়ার প্রেশার পরীক্ষা করানো ও বেশ জরুরি।

ছবিঃ Pexels

যে ক্ষতি সহজে চোখে দেখা যায় না

আধুনিক মোটরসাইকেল এখন অনেকটাই ইলেকট্রনিকস-নির্ভর। ফুয়েল ইনজেকশন, ইগনিশন মডিউল, বিভিন্ন সেন্সর কিংবা ডিজিটাল ডিসপ্লে—সবকিছুর সঙ্গেই বৈদ্যুতিক সংযোগ রয়েছে। এসব উপাদান সাধারণত পানির বিরুদ্ধে সুরক্ষিত থাকলেও দীর্ঘক্ষণ আর্দ্র বা পানির সংস্পর্শে থাকলে কানেক্টরে ক্ষয় তৈরি হতে পারে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু না হলেও পরে দেখা দিতে পারে স্টার্টিং সমস্যা বা অনিয়মিত ইলেকট্রিক্যাল ত্রুটি।

তাইবাড়ি ফিরে মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে ভেজা মোটরসাইকেলটি মুছে নিয়ে ইগনিশন সুইচ, ব্যাটারি টার্মিনাল এবং উন্মুক্ত ওয়্যারিং কানেক্টরসহ বিভিন্ন ইলেকট্রিকাল কানেকশনচেক করে নিতে হবে।

ইন্জিনের অভ্যন্তরীণ ক্ষয় এড়াতে ইন্জিন অয়েলে পানি ঢুকেছে কিনা সেটাও নিশ্চিত হতে হবে।

ছবিঃ Unsplash

কয়েক মিনিটের যত্ন, বড় খরচ থেকে সুরক্ষা

বর্ষায় মোটরসাইকেলের যত্ন নিতে কয়েকটি ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে থাকা রাস্তার ধুলো, কাদা ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য পেইন্টের ক্ষয় রোধ করতে কয়েক সপ্তাহ পরপর মোটরসাইকেলে উপযুক্ত ওয়াক্স ব্যবহার করা প্রয়োজন।

বৃষ্টির প্রভাবে এয়ার ফিল্টারে ময়লা দ্রুত জমতে পারে। এতে ইঞ্জিনে প্রয়োজনীয় বাতাসের প্রবাহ কমে গিয়ে পারফরম্যান্স ও জ্বালানি সাশ্রয়ে প্রভাব পড়তে পারে।

পার্কিংয়ের জায়গাটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বৃষ্টি থেমে গেলেও মোটরসাইকেলকে দীর্ঘ সময় জমে থাকা পানির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা উচিত নয়। এতে হুইল বেয়ারিং, ফাস্টেনার এবং সাসপেনশনের বিভিন্ন ধাতব অংশে মরিচা ধরার ঝুঁকি বাড়ে।

ছবিঃ Unsplash

মোটরসাইকেলের সঙ্গে বদলাতে হবে রাইডিংও

সবশেষে মনে রাখা দরকার, ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা মোটরসাইকেলও খারাপ রাইডিংয়ের ঝুঁকি দূর করতে পারে না।

ভেজা রাস্তায় টায়ারের গ্রিপ কমে যায়। তাই বৃষ্টিতে অ্যাক্সিলারেশন, ব্রেকিং এবং কর্নারিং—তিন ক্ষেত্রেই আগের তুলনায় অতিরিক্ত সতর্ক হতে হবে। সামনে থাকা গাড়ির সঙ্গে বাড়তি দূরত্ব রাখা, হঠাৎ স্টিয়ারিং না ঘোরানো এবং দৃশ্যমানতা কমে গেলে গতি কমিয়ে আনা জরুরি।

বিশেষ করে রাস্তার সাদা বা হলুদ রোড মার্কিং, স্টিলের ব্রিজ জয়েন্ট এবং ম্যানহোলের ঢাকনা বৃষ্টিতে অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে উঠতে পারে। আর পানির নিচে থাকা গর্ত তো আছেই। এক মুহূর্তের অসতর্কতায় যা টায়ার, রিম কিংবা সাসপেনশনের বড় ক্ষতি করতে পারে।

তাই বৃষ্টিতে মোটরসাইকেল চালানোর মূলমন্ত্র খুব জটিল নয়। পানি দেখলে শুধু রাস্তা নয়, মোটরসাইকেলটির সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। কিছুটা ধীর গতি, কিছুটা বাড়তি সতর্কতা আর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণই বৃষ্টির মৌসুমে বাইক ও রাইডার, দুজনকেই অনেকটা নিরাপদ রাখতে পারে।

ফারহান মুশফিক

লেখক, সাংবাদিক। ক্যামেরার সামনে থেকে পিছনে থাকতেই বেশি ভালবাসেন। বই পড়া থেকে শুরু করে দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানো তার পছন্দের কাজ। মাঝেমধ্যে ঢাকার রাস্তায় গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালানোর পাশাপাশি রিভিউ করে থাকেন

Previous
Previous

ভুলে যাওয়া পাঁচটি অসাধারণ কনসেপ্ট কার

Next
Next

গাড়ির ইঞ্জিনের রকমারি