আইয়ুব বাচ্চুর সেই ‘৯৯ Altezza
ছবিঃ আফিক হামিদ
বাংলাদেশে গাড়ির প্রতি গভীর ভালোবাসা রয়েছে, এমন তারকার সংখ্যা খুবই অল্প। সালমান শাহ্ এবং তাঁর ডানাওলা Toyota Sera-র কথা আমরা সবাই জানি। তবে সংগীতজগতে ছিল এমন এক লেজেণ্ড যার গাড়ির প্রতি ভালোবাসা ছিল তাঁর রুপালী গিটারের সমতুল্য।
আইয়ুব বাচ্চু। বাংলাদেশের কিংবদন্তি রকস্টার, গিটার হিরো, LRB-এর লিড গিটারিস্ট, ভোকালিস্ট এবং “সেই তুমি”-র মত কালজয়ী গানের রচয়িতা। গিটারের তারে তিনি কখনো কান্না, কখনো হাহাকার, আবার কখনো নিজেকে বিলিয়ে সুখ দেবার গল্প গেঁথেছেন। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তাঁর অকালপ্রয়াণের পর দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে তৈরি হয়েছে এক আজন্ম শূন্যতা। স্বাভাবিকভাবেই, এই গিটার জাদুকরের সবচেয়ে মূল্যবান স্মারক তাঁর গিটারগুলো। তবে যারা তাঁর ভক্ত, তাঁদের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে এই ১৯৯৯ Toyota Altezza- টি।
Toyota Altezza বা Lexus IS, নামটি টিউনার জগতে বেশ জনপ্রিয়। ইউরোপের BMW 3 Series এবং Mercedes-Benz C-Class-এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তৈরি এই গাড়িতে ছিল জাপানি নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে স্পোর্টি ড্রাইভিংয়ের সমন্বয়।
Altezza এবং এর Lexus সংস্করণগুলোতে বিভিন্ন ইঞ্জিন অপশন পাওয়া যেত। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অপশন ছিল 3S-GE এবং 2JZ ইঞ্জিন। বাচ্চুর Altezza-তে রয়েছে 2.0-লিটারের 1G-FE ইনলাইন-ফোর ইঞ্জিন, যার সঙ্গে যুক্ত একটি চার গতির অটোমেটিক ট্রান্সমিশন। এই সমন্বয় হয়তো গতির রেকর্ড গড়বে না, তবে নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্সের পাশাপাশি চমৎকার ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা দেয়। ইঞ্জিনটি সর্বোচ্চ ৫,৬০০ rpm-এ ১৩৩ hp শক্তি এবং ৪,৪০০ rpm-এ ১৭৬ N⋅m টর্ক উৎপাদন করতে পারে।
সাধারণ মানুষের চোখে এটি আর দশটা পুরোনো জাপানি সেডান মনে হতে পারে। কিন্তু যারা গাড়িটি সম্পর্কে জানেন, তাঁদের কাছে এটি বাংলাদেশের রক সংগীতের ইতিহাসের একটি অংশ। LRB ব্যান্ডের সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়, আইয়ুব বাচ্চু নিজেই গাড়ি চালিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে শো করতে যেতে খুব পছন্দ করতেন। তাঁর এই গাড়িতে যেন ফুটে উঠেছে বাচ্চুর নিজেরই গতিশীলতা, স্টাইল এবং দুর্দান্ত প্রাণশক্তি। তাঁর মৃত্যুর অষ্টম বার্ষিকীতে এই Altezza শুধু একজন মানুষকেই নয়, যেন একটি প্রজন্মকে সংজ্ঞায়িত করে আর তাঁর সংগীতকেও শ্রদ্ধা জানায়।
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক গাড়িটির মালিক ও চালক এস কে আবু আসাদ। তিনি নিজেও একজন গাড়িপ্রেমী। ২০১৫ সালে বাচ্চুর কাছ থেকে গাড়িটি কেনার স্মৃতিচারণ করে আসাদ জানান, গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া বাচ্চুর জন্য কতটা কঠিন ছিল।
“আইয়ুব দাদা দ্বিধায় ছিলেন; গাড়িটির সঙ্গে তাঁর অনেক আবেগ জড়িয়ে ছিল,” বলেন আসাদ। তবে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গাড়িটির যত্ন নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাচ্চুর প্রিয় গাড়িটির দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি।
আসাদ-এর হাতে যখন Altezza আসে তখন গাড়িটি ইতিমধ্যেই সুনিপুণ অবস্থায় ছিল। বাচ্চু আসাদকে বলেছিলেন, “কখনও জোরে চালাবে না।” সেই পরামর্শ মেনেই গাড়িটির ইঞ্জিনটি অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রণ ও বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়াতে যুক্ত করা হয়েছে কিছু রুচিশীল পরিবর্তন।
বডিতে করা হয়েছে নজরকাড়া মিডনাইট পার্পল রঙ। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আফটারমার্কেট ওয়াইড ফেন্ডার, যা গাড়িটিকে দিয়েছে আরও চওড়া ও আক্রমণাত্মক চেহারা। সামনে যোগ হয়েছে Formula 1 গাড়ি থেকে অনুপ্রাণিত গোলাকার DRL-সহ কাস্টম হেডলাইট এবং চারপাশে লাগানো হয়েছে রিকন্ডিশন্ড Toyota Mark II থেকে সংগ্রহ করা ১৭ ইঞ্চির সোনালী অ্যালয় হুইল।
ভেতরেও কিছু সতর্ক পরিবর্তন এনেছেন আসাদ। স্টক আসনগুলো সরিয়ে বসিয়েছেন Civic Type R-এর বাকেট সিট। বদল করা হয়েছে স্টিয়ারিং হুইলওটাও। আর একটি Lexus IS200 কাছ থেকে এসেছে একটি নতুন ইন্সট্রুমেন্ট ক্লাস্টার।
তবে গাড়িটির শুধু চেহারা পরিবর্তন করেননি আসাদ। হ্যান্ডলিং উন্নত করতে লাগিয়েছেন Tein coilover এবং Ultra Racing-এর স্ট্রাট বার ও সয়ে বার। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের রাস্তায় গাড়িটি এখন আরও আত্মবিশ্বাসীভাবে চলতে পারে, যা এর টিউনার পরিচয়ের সঙ্গে বেশ মানানসই।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও বর্তমান মালিক গাড়িটিকে গ্যারেজে সাজিয়ে রাখেননি। বরং তিনি গাড়িটিকে নিয়ে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত থেকে সিলেটের পাহাড়ি এলাকা—সবখানেই বাচ্চুর উত্তরাধিকারকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন তিনি। গাড়িটি নিয়ে সাত ঘণ্টায় ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাত্রা আসাদের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর একটি ।
তবে সব যাত্রাই ঝামেলামুক্ত ছিল না। একবার গভীর রাতে পাবনার কাছে গাড়িটির পেছনের একটি টায়ার বিস্ফোরিত হয়। নতুন টায়ার সংগ্রহের জন্য আসাদকে বাসে করে ফিরতে হয় ঢাকায়। এবং পরদিন আবার নতুন টায়ার নিয়ে ঘটনাস্থলে ফিরে এসে পুনরায় যাত্রা শুরু করেন। তাছাড়া এবড়োখেবড়ো মহাসড়ক এবং ঘন ঘন গর্তও গাড়টির coilover সাসপেনশনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বলা বাহুল্য, রাস্তার সঙ্গে নিচু হয়ে চলার জন্য তৈরি গাড়ির প্রতি বাংলাদেশের সড়কগুলো খুব একটা সদয় নয়।
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর আট বছর পর এই ১৯৯৯ Toyota Altezza নিছক একটি গাড়ি নয়। এটি একজন সংগীতশিল্পীর চলমান স্মারক, যিনি শিল্পে নিজের পুরো আত্মাটাই ঢেলে দিয়েছিলেন। গাড়িটি যত্নে রাখা এবং নিয়মিত চালানোর মাধ্যমে আসাদ বাচ্চুর স্মৃতিকেই যেন বাঁচিয়ে রেখেছেন। বাচ্চুর সংগীত যেমন নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে, তাঁর Altezza-ও তেমনি এগিয়ে চলেছে—শুধু একটি যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং আবেগ, সৃজনশীলতা ও প্রাণশক্তির প্রতীক হয়ে।
বাংলাদেশে গাড়ির প্রতি গভীর ভালোবাসা রয়েছে, এমন তারকার সংখ্যা খুবই অল্প। সালমান শাহ্ এবং তাঁর ডানাওলা Toyota Sera-র কথা আমরা সবাই জানি। তবে সংগীতজগতে ছিল এমন এক লেজেণ্ড যার গাড়ির প্রতি ভালোবাসা ছিল তাঁর রুপালী গিটারের সমতুল্য।