Toyota GR Yaris: ঢাকার বুকে এক র্যালি রিফিউজি
ছবি: নাফিরুল হক
সিটবেল্টটা একটু শক্ত করে বেঁধে নিন, কারণ এটা কোনো সাধারণ হ্যাচব্যাকের গল্প নয়।
আমি এমন একটি গাড়ির গল্প করছি, যার জন্ম হয়েছিল Toyota-র World Rally Championship-এর ট্রফি ছিনিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা থেকে। এরপর, কোনো এক অলৌকিক খেয়ালে তারা এই দানবটি বিক্রি করতে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছে।
সেই উন্মাদনার ফলাফল Toyota GR Yaris। এক খাঁটি হোমোলোগেশন স্পেশাল, যার পাশে অন্য কোনো হট হ্যাচকে নিতান্তই খেলনা বলে মনে হয়।
এটা কোনো সাধারণ স্পয়লার আর বাহারি ব্যাজ ঝুলিয়ে দেওয়া Yaris নয়। এতে ব্যবহার করা রয়েছে পুরোদস্তুর আলাদা তিন দরজার চ্যাসিস, কার্বন ফাইবার ছাদ, হালকা অ্যালুমিনিয়াম বডি প্যানেল এবং ১.৬ লিটারের টার্বোচার্জড তিন সিলিন্ডারের এক দৈত্য, যার আকার তার ক্ষমতার সাথে একবারেই বেমানান।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি একটি খাঁটি কাঁচা রাস্তা ধ্বংসকারী র্যালি কার, যা কোনোভাবে সাধারণ রাস্তায় চলার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। আর এদেশের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিনের অপ্রতিদ্বন্দ্বী Toyota Starlet-কে সিংহাসনচ্যুত করে এটিই এখন Toyota -র নতুন 'পকেট রকেট'।
২৫ জুলাই, ভোরবেলা। ঢাকার আকাশে মেঘের চমৎকার আনাগোনা।
জমায়েতের ঠিকানা ছিলো মানিক মিয়া এভিনিউ—জাতীয় সংসদ ভবনের ঠিক সামনে।
শহরের একেবারে হৃদপিণ্ডে দাঁড়িয়ে ছিল এই সাদা রঙের GR Yaris-টি।
কিছু চমৎকার স্টিল ফ্রেম ক্যামেরাবন্দি করে আমরা দ্রুত ছুটলাম মূল গন্তব্য, ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ের দিকে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে ৩০০ ফিটের চওড়া রাস্তায় গাড়িটা যেভাবে র্যালির মেজাজে ছুটছিলো, তা ছিলো চোখে লেগে থাকার মতো।
অবশেষে আমরা আমাদের নির্ধারিত স্পটে পৌছাই, ছোট একটা পাহাড়ের পটভূমিতে পুরো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই GR Yaris। আরেকটি গাড়ি পাশে থাকলেও, পুরো লাইমলাইটটাই নিজের দখলে রেখেছিল এই খুদে দৈত্যটি।
Toyota GR Yaris-এর পেছনের প্রেক্ষাপটটা বেশ চমকপ্রদ। ২০১৭ সালে Tommi Mäkinen-এর হাত ধরে WRC-তে ফিরে এসে Toyota বুঝেছিল, জিততে হলে স্রেফ র্যালির পোশাক পরা কোন গাড়ি হলেই চলবেনা, বরং এমন একটা গাড়ি লাগবে যার জন্মই হয়েছে র্যালির ট্র্যাকে ঝড় তোলার জন্য।
তাই সাধারণ Yaris-এ সামান্য অদলবদল করার বদলে নির্মাতারা তাদের সবচেয়ে পাগলাটে ইঞ্জিনিয়াদের হাতে প্রকল্পটি তুলে দেয়। এবং চূড়ান্ত রূপ হিসেবে ২০২০ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে GR Yaris-এর, যা Evo আর WRX STI-এর স্বর্ণযুগের পর জাপানের সবচেয়ে খাঁটি রেসিং মেশিন।
প্রতিদিনের বাজার-সদাই করার গাড়ি এটি নয়; এর নকশা সাজানোই হয়েছে র্যালি ট্র্যাক জয় করার জন্য, সাধারণ রাস্তায় চলাচলের উপযোগী করার চিন্তাটা এসেছে পরে। গাড়িটি আঁটসাঁট, ভয়ংকর তেজস্বী এবং অবিশ্বাস্য রকমের শক্তিশালী। আর সেই দানবটাই এখন ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে।
এদেশে থাকা অন্য যেকোনো GR Yaris-এর চেয়ে এই গাড়িটি একেবারেই আলাদা। এটি দেশের অন্যতম RZ High Performance First Edition, যাতে বসানো হয়েছে TOM’S kit— যা দূর থেকেই এর আগ্রাসী ভঙ্গি ও সামগ্রিক মেজাজকে এক নজরেই আপনাকে আলাদা করে চিনিয়ে দিবে।
গাড়িটির মালিকের চালানোর অভিজ্ঞতা শুনলেই বোঝা যায় এই উন্মাদ গাড়িটিকে তাঁর ভালো লাগার কারণ। স্টিয়ারিংয়ের সামান্য মোচড় বা এক্সিলারেটরে মৃদু চাপেই এর নিখুঁত ভারসাম্য টের পাওয়া যায়। টার্বোর শিষ দিয়ে ওঠা ইঞ্জিনের গর্জন আর চার চাকার গ্রিপ যেভাবে মাটিকে আঁকড়ে ধরে, তা মুখে অনাবিল হাসি ফোটাতে বাধ্য। রাস্তায় এটি একাধারে ভীষণ চঞ্চল কিন্তু অসম্ভব দৃঢ়; বুনো অথচ নিখুঁত।
কোন ভোগান্তিও যে নেই, তা নয়। দেশে পার্টস আর টিউনিং সাপোর্ট একপ্রকার নেই বললেই চলে, অকটেনের সামান্য হেরফেরও ইঞ্জিন সহ্য করতে পারে না, আর সাধারণ মডেলের চেয়ে এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ আকাশছোঁয়া।
তবে যারা এই যন্ত্রের গভীরতা বোঝেন, তাদের কাছে অবশ্য এসব ঝামেলা একদম তুচ্ছ। শহরের রাস্তায় আসল অটোমোবাইলপ্রেমীদের সম্মানজনক চাহনি আর আর নীরব প্রশংসাই সব দুর্ভোগ দূর করে দেয়।
আসল স্পোর্টস কারের খরায় ভোগা এই শহরে GR Yaris চাকার ওপর চলমান এক রূপকথার ঘোড়া। প্রতিটি টার্বো হুইসেল, তীক্ষ্ণ বাঁক আর গাড়ি অনুরাগীদের মুগ্ধ দৃষ্টিই জানান দেয় এটি কতটা দুর্লভ। একজন অটোমোবাইল আলোকচিত্রী হিসেবে এর ছবি তোলা কেবল কাজের অংশ ছিল না, এ এক আজীবন মনে রাখার মতো ব্যক্তিগত রোমাঞ্চ — ছোট হ্যাচব্যাকের খোলসে বন্দি এমন জীবন্ত কিংবদন্তি রোজ রোজ তো আর দেখা যায় না।
মাঝে মাঝে কিছু পুরনো গাড়িতে এমন সব বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যা দেখে মনে হয় গাড়িটি ডিজাইনার ভবিষ্যৎ থেকে নিয়ে থেকে এসেছেন। আর কখনো কখনো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলি এমন ভবিষ্যৎমুখী গাড়ি তৈরি করে যা বাজারের চাহিদা ও সময়ের থেকেও যুগ যুগ এগিয়ে থাকে। এরকম চারটি গাড়ি নিয়ে কিছু কথা বলব আজ।