গাড়ির ইঞ্জিনের রকমারি

গাড়ি আমাদের অনেকেরই খুব পছন্দের কিন্তু আমরা কি জানি এই গাড়ির ইঞ্জিন হরেক রকমের হরেক আকারের হতে পারে?

ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিন বিভিন্ন আকার ও আকৃতির হয়ে থাকে, যার প্রতিটিরই নিজস্ব কিছু সুবিধা এবং সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আজকে এই লেখায় আমরা কয়েকটি জনপ্রিয় ইঞ্জিনের ধরন নিয়ে কিছু জানবো।

আশা করা যায় পরবর্তীতে কেউ যখন  বলবে তার গাড়িতে "V6" কিংবা "boxer" ইঞ্জিন আছে, তখন  আপনার কাছে বিষয়টি অদ্ভুত কিছু শুনাবেনা।

ইনলাইন ইঞ্জিন

ইনলাইন ইঞ্জিন (Inline engines)

আধুনিক গাড়িগুলোতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় Inline বা "স্ট্রেইট" ইঞ্জিন। এই ধরনের ইঞ্জিনে সব সিলিন্ডার লম্বালম্বিভাবে এক লাইনে বা একটির পেছনে আরেকটি সাজানো থাকে।

সাধারণত ইনলাইন ইঞ্জিনে ৩, ৪ বা ৬ সিলিন্ডারের লেআউট বেশি দেখা যায়। তবে এর বাহিরে কিছু দুর্লভ ৫ বা ৮ সিলিন্ডারের সেটআপও রয়েছে। ছোট ৩ বা ৪ সিলিন্ডারের ইনলাইন ইঞ্জিনগুলো বেশ সাশ্রয়ী, গঠনে তুলনামূলক সহজ এবং তৈরিতে কাঁচামাল লাগে কম; যে কারণে কমপ্যাক্ট এবং জ্বালানিবান্ধব গাড়ির ক্ষেত্রে নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ এটি।

তবে সাধারণত এই ডিজাইনগুলোতে বিশাল শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা থাকে না। অবশ্য গত ১০ বছরে অনেকগুলি ৩ আর ৪ সিলিন্ডারের প্রচন্ড শক্তিশালী ইঞ্জিন বাজারে এসেছে। কিন্তু  এই ধরনের ইঞ্জিনের একটি বড় সমস্যা হল, লম্বাটে নকশার হওয়ায় সিলিন্ডারের সংখ্যা পাঁচ পার হলেই এগুলো গাড়ির ভেতর নিরাপদে বসাতে বেশ ঝামেলা সৃষ্টি হয়। 

ভি ইঞ্জিন

ভি ইঞ্জিন (V engines)

ইনলাইন ইঞ্জিনের এই দৈর্ঘ্যজনিত সমস্যা দূর করতেই ইঞ্জিনিয়াররা "V" লেআউট নিয়ে আসেন। এই বিন্যাসে সমান সংখ্যক সিলিন্ডার নির্দিষ্ট কোণে পরস্পরের মুখোমুখি বসানো থাকে এবং সেগুলো একটিমাত্র ক্র্যাঙ্কশ্যাফটের সাথে যুক্ত থাকে। ফলে এর সার্বিক গঠন ইংরেজি "V" অক্ষরের মতো দেখায় এবং সে কারণেই এই নাম দেওয়া।

V6, 8, 10 এবং 12 সিলিন্ডারের সবগুলো ইঞ্জিনই গাড়িপাগলদের মাঝে পরিচিত। সচরাচর  এই নকশায় কমপক্ষে ৬ সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয় তবে Lancia-র V4-এর মতো কিছু ব্যতিক্রমী ইঞ্জিনও এই নকশা ব্যাবহার করেছে। ইনলাইন ইঞ্জিনের তুলনায় V ডিজাইন অনেক বেশি জটিল হলেও এটি অর্ধেক জায়গার ভেতরে দ্বিগুণ সিলিন্ডার বহন করতে পারে। এই অতিরিক্ত সিলিন্ডারগুলো বেশি শক্তি উৎপাদন করতে কিংবা ইঞ্জিনকে আরও মসৃণভাবে চালাতে সাহায্য করে, যা পারফরম্যান্স এবং বিলাসবহুল গাড়ির জন্য আদর্শ।

অতিরিক্ত সিলিন্ডারের কারণে এসব ইঞ্জিনের ডিসপ্লেসমেন্ট বা সিসি অনেক বেশি হয়ে থাকে—প্রায়  ২,০০০ সিসি থেকে শুরু করে তারও বেশি। ফলে বাংলাদেশের রাস্তায় V ইঞ্জিনের গাড়ি বেশ দুর্লভ।

ফ্ল্যাট ইঞ্জিন

ফ্ল্যাট ইঞ্জিন (Flat engines)

ফ্ল্যাট ইঞ্জিন—যা আড়াআড়িভাবে বিপরীতমুখী (horizontally opposed) ইঞ্জিন নামেও পরিচিত এবং কখনো কখনো ভুলবশত "boxer" ইঞ্জিনও বলা হয় (যা মূলত এর একটি উপধরন)—এমন একটি ইঞ্জিন যেখানে সিলিন্ডারগুলো মাটির সমান্তরালে বা ফ্ল্যাট অবস্থায় পরস্পরের বিপরীতে অবস্থান করে। একটি ফ্ল্যাট ইঞ্জিন "V" ইঞ্জিনের মতোই আঁটসাঁট  আকার হয়, তবে উচ্চতায় অনেক খাটো হওয়ায় গাড়ির সেন্টার অব গ্র্যাভিটি বা ভরকেন্দ্র অনেক নিচে থাকে। যেহেতু পিস্টনগুলো মুখোমুখি আড়াআড়িভাবে যাতায়াত করে, তাই নিজেদের কাঁপুনি নিজেরাই কমিয়ে দেয়। এর ফলে ইঞ্জিন অনেক বেশি মসৃণভাবে চলে।

নেতিবাচক দিক হিসেবে, এই ইঞ্জিনগুলো দৈর্ঘ্যে খাটো হলেও প্রস্থে বেশ চওড়া হয়। এই চওড়া গঠন ইঞ্জিন ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে (বেশি মেটাল সারফেস পাওয়ায়), তবে বেশিরভাগ গাড়িতে এটিকে বসানো বেশ কঠিন। তাছাড়া  এ ধরনের ইঞ্জিন তৈরি করা তুলনামূলক ব্যয়বহুল এবং জটিল, যার কারণে এটি খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।

এর মাঝেও Subaru ব্র্যান্ডটি এ ধারণার একেবারে ব্যতিক্রম। তাদের সম্পূর্ণ গাড়ির লাইনআপেই কেবল boxer ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয় এবং সবগুলোই ব্যবহার করে অল-হুইল-ড্রাইভ; যার মধ্যে একমাত্র ভিন্ন হলো Toyota-র সাথে যৌথভাবে তৈরি করা একটি টু-ডোর RWD স্পোর্টস সেডান। ফ্ল্যাট ইঞ্জিন ব্যবহারকারী আরেক বিখ্যাত নির্মাতা হলো Porsche, যাদের Boxster মডেলটি সর্বকালের অন্যতম সেরা স্পোর্টস কার হিসেবে সমাদৃত।

রোটারি ইঞ্জিন

রোটারি ইঞ্জিন (Rotary engine)

এতোক্ষন আলোচনা করা সব ইঞ্জিন একটি সিঙ্গেল ক্র্যাঙ্কশ্যাফট ঘোরানোর জন্য একাধিক সিলিন্ডার ব্যবহার করলেও, রোটারি ইঞ্জিনে কোনো সিলিন্ডারই থাকে না।

মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনো প্রথাগত ডিগ্রি না থাকা জার্মান ফেলিক্স ওয়াঙ্কেল (Felix Wankel) রোটারি ইঞ্জিনের নকশা করেন। এটি প্রেশারকে ঘূর্ণন গতিতে রূপান্তর করার জন্য একটি ত্রিভুজাকার রোটর (যা দেখতে অনেকটা চিপসের মতো হওয়ায় অনেকে একে "dorito" বলে ডাকেন) ব্যবহার করে। সহজ কথায়, রোটরের দেয়ালগুলো ইঞ্জিন ব্লকের দেয়ালের বিপরীতে বাতাসকে সংকুচিত করে, যা অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের মধ্যে সাধারণ সিলিন্ডারের সমপরিমাণ চাপ সৃষ্টি করে।

রোটারি ইঞ্জিন ওজনে হালকা, চালানোয় মসৃণ এবং এর আকারের তুলনায় অভাবনীয় শক্তি দিতে সক্ষম। তবে এগুলো প্রচণ্ড জ্বালানি খরচ করে এবং অন্যান্য ইঞ্জিনের তুলনায় পরিবেশে অনেক বেশি দূষণ ছড়ায়।

অনেক গাড়ি নির্মাতা রোটারি ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করলেও নানা কারণে প্রায় সবাই তাদের পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। সব প্রচেষ্টার মধ্যে সবচেয়ে সফল হয়েছিল Mazda, যারা একটা সময় পর্যন্ত Subaru-র মতোই রোটারি ইঞ্জিনকে আকড়ে ধরে রেখেছিল। তাদের বিখ্যাত রোটারি স্পোর্টস কার হলো RX-8, যার বেশ কয়েকটি বাংলাদেশেও দেখতে পাওয়া যায়।

Mazda গত ১০ বছর ধরে RX-8-এর নতুন একটি রোটারি উত্তরসূরি তৈরির কাজ করছে। কিন্তু এ ইঞ্জিনের পিছনে ব্যবসায়িক কোন যুক্তি না থাকার কারণে তারা একটি বাজারে আনতে সফল হচ্ছে না।

VR ইঞ্জিন

অন্যান্য ইঞ্জিন

এই পরিচিত লেআউটগুলোর বাইরেও আরও কিছু চমকপ্রদ ইঞ্জিন ডিজাইন রয়েছে। যেমন "VR" লেআউট, যা মূলত একটি ইনলাইন ইঞ্জিন ব্লকের ভেতরে বসানো V ইঞ্জিন। এই ধরনের দুটি ইঞ্জিন পাশাপাশি জোড়া লাগিয়ে তৈরি হয় "W" ইঞ্জিন; যার সবচেয়ে সেরা নিদর্শন হলো কোটি কোটি ডলার দামের Bugatti হাইপারকারগুলোতে ব্যবহৃত W16 ইঞ্জিন। এছাড়া সামরিক ও নৌযানে ব্যবহার করা হয় "X", "H" এবং "U" টাইপের ইঞ্জিনও।

রাহবার আল হক

অটোমোবাইল সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিতে রাহবার আল হকের রয়েছে ১০ বছরেরও বেশি সময়ের পথচলা। দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS), দ্য টারবাইন এবং অটোড্রাইভ বিডি-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মে সম্পাদকীয় পরিচালনা, নতুন কনটেন্ট টিম গড়ে তোলা এবং টেস্ট ড্রাইভের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

Previous
Previous

বৃষ্টির মৌসুমে মোটরসাইকেলের যত্ন

Next
Next

Toyota GR Yaris: ঢাকার বুকে এক র‍্যালি রিফিউজি