সফটওয়্যারের সমাধানে চীনের দ্বারস্থ Volkswagen

ছবিঃ Volkswagen

সফটওয়্যার সমস্যা সমাধানে বছরের পর বছর সময় এবং কোটি কোটি ডলার খরচ করার পর Volkswagen এবার এক সাশ্রয়ী সমাধান খুঁজে পেয়েছে: চীনের প্রযুক্তি।

জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতের ইউরোপীয় মডেলগুলোতে চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক আর্কিটেকচারের ব্যবহার বাড়ানোর কথা বিবেচনা করছে। ধারনা করা হছে, এতে কয়েকশ কোটি ইউরো সাশ্রয়ের পাশাপাশি তাদের বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তোলা সম্ভব।

Manager Magazin-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, Volkswagen-এর মূল ব্র্যান্ডের প্রধান Thomas Schäfer ইউরোপের বাজারে Volkswagen, Skoda ও Cupra-র মূলধারার মডেলগুলোতে চীনে তৈরি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা Rivian এবং Volkswagen-এর মধ্যে যে যৌথ প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব রয়েছে, তার গুরুত্ব ও পরিধি অনেকটাই কমে যেতে পারে।

Volkswagen-এর আগের পরিকল্পনা ছিল, বিভিন্ন বাজারের জন্য আলাদা বৈদ্যুতিক ও সফটওয়্যার আর্কিটেকচার ব্যবহার করা। চীনে তৈরি প্রযুক্তি মূলত নির্ধারিত ছিল চীনা বাজারের গাড়িগুলোর জন্য। অন্যদিকে, Volkswagen Group-এর বৈশ্বিক গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা ছিল অন্যান্য বাজারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, Schäfer এই পরিকল্পনা বদলে চীনে তৈরি প্রযুক্তি ইউরোপে নিয়ে যেতে চান।

সম্ভাব্য গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক ID. Golf, ID. Tiguan-এর উত্তরসূরি, Passat-এর সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক বিকল্প এবং এন্ট্রি-লেভেল ID. Polo-র ওপরের অবস্থানে থাকা ভবিষ্যতের অন্যান্য EV। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে Seat-এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে Volkswagen। ফলে স্প্যানিশ ব্র্যান্ডটির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

আর্থিক সুবিধার পরিমাণও কম নয়। Manager Magazin-কে প্রস্তাবটির বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, Volkswagen-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গাড়ি শ্রেণিতে চীনা আর্কিটেকচার ব্যবহার করলে সাশ্রয় হতে পারে ৪০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ইউরো। মার্কিন ডলারে এর পরিমাণ আনুমানিক ৪৫০ কোটি থেকে ৫৫০ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫৬ হাজার ২৫০ কোটি থেকে ৬৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, Palo Alto-তে Rivian ও Volkswagen Group Technologies-এর যৌথ উদ্যোগে প্রতি ঘণ্টার উন্নয়ন ব্যয় Hefei-তে Volkswagen Group China Technology Company (VCTC)-এর তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। পরবর্তী প্রজন্মের বৈদ্যুতিক Tiguan-এর মতো গাড়ি চীনে তৈরি ও উন্নয়ন করলে খরচ প্রায় ৮,০০০ ইউরো বা ৯,০০০ মার্কিন ডলার কমানো সম্ভব। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই সাশ্রয়ের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

এই সাশ্রয় Volkswagen-কে আরও সুলভ দামের বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে আনতে সাহায্য করতে পারে, যা ইতিমধ্যে চাপে থাকা মুনাফার ওপর বাড়তি বোঝা চাপবে না। ইউরোপজুড়ে চীনা নির্মাতারা প্রতিযোগিতামূলক দামে EV বিক্রি করছে এবং ক্রমেই উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে আসছে। এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি Volkswagen-এর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

China Electrical Architecture (CEA) নামের প্রস্তাবিত সিস্টেমটি Volkswagen-এর চীনা বিভাগ তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া Xpeng-এর সঙ্গে সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে এর কাজ শুরু করা হয়। পরে Hefei-তে VCTC, Volkswagen-এর সফটওয়্যার বিভাগ Cariad এবং চীনা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে কাজটি এগিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, CEA-এর মেধাস্বত্ব Volkswagen-এর হাতে রয়েছে। অর্থাৎ, এটি কোনো বাইরের চীনা সরবরাহকারীর কাছ থেকে কিনে নেওয়া সিস্টেম নয়।

CEA-তে জোনভিত্তিক বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক আর্কিটেকচার ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য গাড়ির ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাকে সহজ করা । পাশাপাশি এটি সমর্থন করে ওভার-দ্য-এয়ার সফটওয়্যার আপডেট। ফলে প্রতিটি আপডেটের জন্য মালিককে ডিলারশিপে যেতে হয় না; দূর থেকেই গাড়ির সফটওয়্যার আপডেট করা সম্ভব।

আধুনিক গাড়িতে এসব প্রযুক্তি খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু সফটওয়্যার ঠিকঠাক করতে Volkswagen-কে বছরের পর বছর সংগ্রাম করতে হয়েছে। ID সিরিজের প্রথম দিকের বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোতে সফটওয়্যারের নানা সমস্যা ছিল, যা মালিকদের গাড়ি ব্যবহারে বিরূপ অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করেছিল এবং সফটওয়্যার কৌশল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল । ক্রমেই ডিজিটাল হয়ে ওঠা গাড়িগুলোর জন্য একটি অভিন্ন সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে Volkswagen-এর ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল Cariad।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানী ইঞ্জিনচালিত গাড়ির জন্য সম্পূর্ণ নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজও বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে Volkswagen। বর্তমান মডেলগুলোর বিদ্যমান প্ল্যাটফর্ম অপরিবর্তিত রেখে সেগুলো হালনাগাদ করা হবে, নতুন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হবে না।

কেন এত তাড়াহুড়ো, তা বোঝা কঠিন নয়। European Automobile Manufacturers’ Association-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ইউরোপের বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশ ছিল ৩০.৫ শতাংশ। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্মাতাদের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ধরে রাখার পাশাপাশি উন্নয়ন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

তবে CEA ব্যবহার করলে Rivian-এর সঙ্গে Volkswagen-এর অংশীদারত্ব জটিল হয়ে উঠতে পারে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি ঘোষিত এই যৌথ উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল Volkswagen-এর দীর্ঘদিনের সফটওয়্যার সমস্যা সমাধান এবং পরবর্তী প্রজন্মের বৈদ্যুতিক আর্কিটেকচারের উন্নয়ন দ্রুততর করা। এখনো এই উদ্যোগের আওতায় কোনো উৎপাদনযোগ্য গাড়ি বাজারে আসেনি।

২০২৭ সালে বাজারে আসার কথা Volkswagen-এর ID. Every1 কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এন্ট্রি-লেভেল বৈদ্যুতিক গাড়ি। আশা করা হচ্ছে, এটিই হবে Rivian-এর তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রথম উৎপাদন মডেল । তবে এর বিপরীতে, ভক্সওয়াগনের চিনা প্রযুক্তি বা CEA ইতিমধ্যেই চীনের স্থানীয় গাড়িগুলোতে ব্যবহার করা শুরু হয়ে গেছে।

এই নতুন প্রস্তাবের মানে কিন্তু এই নয় যে Volkswagen পার্টনারশিপ থেকে Rivian-কে পুরোপুরি বাদ দিতে চায়। বরং বেশি সংখ্যায় বিক্রি হয় এমন মূলধারার গাড়িগুলোতে চীনা আর্কিটেকচার ব্যবহার করা হতে পারে, আর অন্যান্য মডেল ও বাজারের জন্য Rivian-এর প্রযুক্তি প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, Audi ও Porsche-রও মার্কিন অংশীদারত্বের ওপর নির্ভরতা বজায় রাখার নিজস্ব কারণ রয়েছে।

প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। Schäfer এটি Volkswagen-এর পরিচালনা পর্ষদের সামনে উপস্থাপন করেছেন বলে জানা গেছে। সেখানে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মিললেও খরচ, উন্নয়নের সময়সূচি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে Volkswagen-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানান।

Previous
Previous

Chery-প্রধানের প্রশ্ন, গাড়ি কিনবে কে?

Next
Next

Aston Martin-এর ছাদহীন ১,০৬৪ bhp রকেট