Volkswagen-এর চীনা বাজি ব্যর্থ
ছবিঃ Volkswagen China
চীনের ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনার সর্বশেষ প্রচেষ্টায় শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে Volkswagen। স্থানীয় EV নির্মাতা Xpeng-এর সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি একটি নতুন বৈদ্যুতিক SUV দিয়ে জার্মান প্রতিষ্ঠানটি দেখাতে চেয়েছিল, চীনের গতিতে গাড়ি তৈরি করার ক্ষমতা তাদেরও আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ক্রেতাদের মন জয় করতে পারেনি গাড়িটি।
এপ্রিল মাসে বিক্রি শুরু হয় Volkswagen ID. Unyx 08-এর। তবে Reuters-এর প্রতিবেদনে ThinkerCar-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট পর্যন্ত গাড়িটির মাসিক গড় বিক্রি ছিল মাত্র ২৬৭টি। Reuters-এর দেখা Volkswagen-এর অভ্যন্তরীণ নথিতে মাসে প্রায় ৩,৬২২টি গাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে। বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে Reuters জানতে চাইলে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায় Volkswagen।
হতাশাজনক এই ফলাফল চীনের বাজারে বিদেশি গাড়ি নির্মাতাদের সামনে থাকা বড় একটি সমস্যাকে তুলে ধরেছে। একসময় চীনের বাজারে চরম আধিপত্য ছিল জার্মান ব্রান্ডটির। ২০১৯ সালে বিক্রি করেছিল রেকর্ড ৪২ লাখ গাড়ি। কিন্তু গত বছর সেই সংখ্যা নেমে আসে ২৬ লাখ ৯০ হাজারে।
এর পেছনে বড় কারণ, চীনের ক্রেতারা ক্রমেই নিজ দেশের ব্র্যান্ডগুলোর দিকে ঝুঁকছেন, যারা দিচ্ছে কম দামে বেশি প্রযুক্তি ।
Volkswagen ID. Unyx 08 একটি মাঝারি আকারের বৈদ্যুতিক SUV, যা Volkswagen-এর Anhui কারখানায় তৈরি হয়। এর বেশিরভাগ মূল যন্ত্রাংশ চীনের Xpeng G9 গাড়ী থেকে ধার নেওয়া। শুরুতে গাড়িটির দাম ছিল প্রায় ৩৫,০০০ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। দামটি এর প্রতিদ্বন্দ্বী Xiaomi YU7 ও Zeekr 7X-এর কিছুটা কম।
তবে প্রতিযোগিতাটি শুধু দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। Xiaomi চীনের বাজারে তাদের কনজিউমার ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিশাল ইকোসিস্টেম এবং উন্নত সেন্সর প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারে। অন্যদিকে, Zeekr 7X-এর রয়েছে শক্তিশালী DC ফাস্ট-চার্জিং সক্ষমতা।সেই তুলনায় ID. Unyx 08-এর আরেকটি হাস্যকর অসুবিধা হলো, গাড়িটির কেনার জায়গার অভাব। Volkswagen গাড়িটি বিক্রি করে আলাদা ID. Unyx ডিলারশিপের মাধ্যমে। অথচ তাদের প্রতিদ্বন্দীদের শোরুম নেটওয়ার্ক অনেক বেশি বিস্তৃত ও সহজলভ্য; যার মধ্যে রয়েছে শহরের অভিজাত শপিং মল থেকে শুরু করে ক্রেতাদের সহজে যাতায়াতের উপযোগী সব মূল কেন্দ্রগুলো।
Gartner-এর গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট Pedro Pacheco Reuters-কে বলেন, “চীনা ক্রেতারা প্রশ্ন করেন: একই প্রযুক্তি যদি অনেক কম দামে পাওয়া যায়, তাহলে তাঁরা কেন একটি দামি জার্মান গাড়ি কিনবেন?”
Volkswagen-এর এই বৃহত্তর কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো চীনা নির্মাতাদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে দ্রুত ও কম খরচে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করা। Xpeng-এর সঙ্গে তাদের এই অংশীদারত্ব অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের Rivian-এর বিনিয়োগের মতো। সেখানে Volkswagen মার্কিন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে গাড়ির প্ল্যাটফর্ম ও সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করছে।
অবশ্য দ্রুত গাড়ি তৈরি করতে পারলেই যে ক্রেতারা সেটি কিনতে চাইবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। ID. Unyx 08, Xpeng-এর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও গাড়িটিকে এমন সব প্রতিষ্ঠানের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, যারা স্থানীয় ক্রেতাদের পছন্দ, দামের প্রত্যাশা এবং কেনাকাটার অভ্যাস ভালোভাবে বোঝে।
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও Volkswagen তাদের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। Xpeng-এর সঙ্গে অংশীদারত্বে তৈরি পরবর্তী মডেলটি হতে পারে ID. Unyx 09 সেডান। Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গাড়ির মাসিক বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী—প্রায় ৪,৯০০টি। প্রথম গাড়িটিই যেখানে প্রত্যাশা থেকে এতটা পিছিয়ে পড়েছে, সেখানে এমন লক্ষ্যমাত্রা বেশ সাহসী।
এক্ষেত্রে Toyota-র সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। চীনের GAC-এর হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ব্যবহার করা Toyota চীনের বাজারের জন্য বেশ কয়েকটি bZ ইলেকট্রিক মডেলে তৈরি করেছে। Toyota bZ3X-এর নিচের যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ GAC Aion V-এর থেকে ধার নেওয়া। চলতি বছরের এপ্রিলে bZ3X রেকর্ড ১০,০০০টি বিক্রি হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি বর্তমানে চীনের বাজারে কোনো বিদেশি ও স্থানীয় ব্র্যান্ডের যৌথ উদ্যোগে তৈরি সবচেয়ে সফল ও বেশি বিক্রি হওয়া বৈদ্যুতিক গাড়ি।
এই পার্থক্য দেখিয়ে দেয়, চীনা নির্মাতার সঙ্গে কাজ করাটাই সম্পূর্ণ সমাধান নয়। তৈরি গাড়িটির সঠিক দাম, প্রতিযোগিতামূলক প্রযুক্তি, সহজলভ্য বিক্রয়কেন্দ্র এবং স্থানীয় বিকল্পগুলোর বদলে সেটি কেনার মতো স্পষ্ট কারণও থাকতে হবে।
Volkswagen ইতোমধ্যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে। Reuters জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিশেষায়িত ID. Unyx ডিলারশিপের নেটওয়ার্ক বাড়ানোর কাজ করছে। পাশাপাশি SUV-টির দাম প্রায় ৩৫,০০০ মার্কিন ডলার থেকে কমিয়ে প্রায় ২৮,৫০০ ডলারে নামানো হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় নতুন দাম প্রায় ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। এই পরিবর্তনগুলো গাড়িটির ভাগ্য ঘুরিয়ে দিতে পারবে কি না, তা এখনো দেখার বিষয়।
অন্যদিকে, বিক্রি দুর্বল থাকলে Volkswagen-এর Anhui কারখানায় অবিক্রীত গাড়ির মজুতও বেড়ে যেতে পারে। এমন জল্পনা রয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত কিছু গাড়ি চীনের বাইরের বাজারে রপ্তানি করা হতে পারে। তবে এমন কোনো পরিকল্পনা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা চীনে বহু বছর ধরে নিজেদের ব্র্যান্ডের সুনাম কাজে লাগিয়ে বিপুল বিক্রয় করেছে। সেখানে জার্মান ব্র্যান্ডের গাড়ির জন্য ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু স্থানীয় নির্মাতারা প্রতিযোগিতামূলক প্রযুক্তি, আকর্ষণীয় নকশা ও কম দাম দেওয়ায় সেই সুবিধা ক্রমেই কমছে। চীনা ব্র্যান্ডগুলো এখন শুধু ইউরোপীয়দের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করছে না; বরং ইউরোপের কোম্পানিগুলোকে তাদের নিজস্ব বাজারেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
Volkswagen এই ঝড় সামলে উঠতে পারবে, নাকি প্রাসঙ্গিক থাকতে শেষ পর্যন্ত চীনা অংশীদারদের ওপরই নির্ভর করতে হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। নামের পাশে বিদেশি ব্র্যান্ডের মর্যাদাপূর্ণ ব্যাজ লাগানো থাকলেই চীনের ক্রেতারা যেকোনো গাড়ি কিনে নেবেন—সেই দিন শেষ।
চীনের ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনার সর্বশেষ প্রচেষ্টায় শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে Volkswagen।