গতিতেই সুপারকার হয় না: Lamborghini
ছবিঃ Lamborghini
আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়িগুলো যখন চোখের পলকে অবিশ্বাস্য গতি তুলছে এবং, তখন ইতালীয় অভিজাত ব্র্যান্ড Lamborghini সাফ জানিয়ে দিল—শুধু সোজা রাস্তায় তীব্র গতি দিয়ে, আসল ‘সুপারকার’ সংজ্ঞায়িত করা যায় না।
যেখানে সাধারণ পারিবারিক সেডান কিংবা Bentley Torcal-এর মতো ভারী বিলাসবহুল এসইউভিগুলোও তিন সেকেন্ডের কম সময়ে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার ছুঁয়ে ফেলছে, সেখানে কাঁচা শক্তির পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে ড্রাইভিংয়ের অনুভূতি, যান্ত্রিক উত্তেজনা এবং সর্বোচ্চ পারফরম্যান্সকে আরও নিয়ন্ত্রণযোগ্য করার দিকেই ঝুঁকছে এই ইতালীয় ব্র্যান্ড।
Italy-র Milan-এ সংবাদমাধ্যম CarExpert-এর সঙ্গে আলাপকালে ব্র্যান্ডটির মডেল লাইন ডিরেক্টর Paolo Racchetti সুপারকারের পারফরম্যান্সের ঐতিহ্যবাহী অহংকার ধূলিসাৎ হওয়ার বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “পারফরম্যান্সের জন্য গতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সুপার-স্পোর্টস কার হওয়ার জন্য শুধু এটিই যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে হয়তো পারফরম্যান্সের এমন সংখ্যার গুরুত্ব আরও কমে যাবে। একটি সুপার-স্পোর্টস কারকে গতির পাশাপাশি আবেগও যোগাতে হবে। এই কারণেই আমরা হাইব্রিড আর্কিটেকচার বেছে নিয়েছি; দিনশেষে টার্বোচার্জড ইঞ্জিনের ১০,০০০ আরপিএম-এর যে উন্মাদনা, সেই আবেগ কেবল খাঁটি মেকানিক্সই দিতে পারে।”
এই দর্শনটির পেছনে রয়েছে এক বাস্তববাদী অতীত। কয়েক দশক আগে, জার্মানদের কড়া নজরদারিতে নির্ভরযোগ্য হওয়ার আগে পর্যন্ত সুপারকারগুলোর খ্যাতি আসত তাদের বিদঘুটে নকশা, জঘন্য বিল্ড কোয়ালিটি এবং চালককে প্রায় মেরে ফেলার মতো বুনো স্বভাবের মধ্য দিয়ে। যখন Lamborghini বাজারে Audi-র প্রযুক্তিতে তৈরি Murciélago নিয়ে আসে, তখন কট্টরপন্থীরা রীতিমতো সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন—প্রতিদিন সকালে কোনো ঝামেলা ছাড়া স্টার্ট নেওয়া গাড়ি আদৌ সুপারকারের মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য কি না! কারণ সুপারকারের আসল আকর্ষণ শুধু এক্সিলারেশনের সংখ্যায় ছিল না, ছিল এর বুনো, অসভ্য ও রোমাঞ্চকর যান্ত্রিক আচরণে।
কঠোর নির্গমন বিধিমালার যুগে সেই বুনো অনুভূতি ধরে রাখতেই কম্বাশন ইঞ্জিন পুরোপুরি বাদ না দিয়ে হাইব্রিডের সাহায্য নিচ্ছে ব্র্যান্ডটি। এই ভাবনার আধুনিক রূপ হলো Huracán-এর উত্তরসূরি নতুন Temerario। এতে থাকা একটি 4.0-liter টুইন-টার্বোচার্জড V8 ইঞ্জিন এবং তিনটি বৈদ্যুতিক মোটর মিলে দানবীয় ৬৭৭ কিলোওয়াটর শক্তি তৈরি করে, যা মাত্র ২.৭ সেকেন্ডে গাড়িটিকে ১০০ কিমি গতিতে পৌঁছে দেয়। গণউৎপাদিত সুপারকারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এর V8 ইঞ্জিনটি ১০,০০০ আরপিএম ছাড়িয়ে হুঙ্কার তোলে। আর পুরো ব্যবস্থাটিকে নিখুঁতভাবে চালকের নিয়ন্ত্রণে রাখে এর 'LDVI 2.0' ইলেকট্রনিক মস্তিষ্ক।
গাড়ির যান্ত্রিক আত্মা ধরে রাখার এই জেদ থেকেই পুরোপুরি ব্যাটারিচালিত প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে থাকছে Sant'Agata Bolognese। Lamborghini-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা Stephan Winkelmann জানান, তাদের প্রথম অল-ইলেকট্রিক মডেলের পরিকল্পনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এমনকি Lanzador কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতে যাওয়া তাদের আসন্ন 2+2 গ্র্যান্ড ট্যুরারটিও এখন প্লাগ-ইন হাইব্রিড হিসেবে আসবে। আত্মাহীন ব্যাটারি প্ল্যাটফর্মকে নাকচ করে Winkelmann স্পষ্ট ভাষায় মনে করিয়ে দেন, “আমরা স্রেফ যাতায়াতের বাহন বিক্রি করি না—এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য কেউ Lamborghini কেনে না।”
কৌশলগত এই পিছুটান পুরো বিলাসবহুল গাড়ি শিল্পের বাস্তব চিত্রকেই তুলে ধরে। Porsche ও Bentley-র মতো ব্র্যান্ডগুলোও নিঃশব্দে তাদের আগ্রাসী বৈদ্যুতিক পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে। কারণ তারা বুঝে গেছে, ব্যাটারি জুড়ে দিয়ে যে কোনো ভারী ফ্রিজকেও হয়তো মুহূর্তে তীব্র গতিতে ছুটিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু কোটিপতি ক্রেতারা যে স্নায়বিক হিংস্রতা ও যান্ত্রিক গর্জন কিনতে কোটি কোটি টাকা ঢালেন, তা কেবল খাঁটি কম্বাশন ইঞ্জিনই দিতে পারে।
হাইব্রিড প্রযুক্তির আড়ালে কম্বাশন ইঞ্জিনকে বাঁচিয়ে রাখার এই কৌশল ব্যবসায়িকভাবেও তাদের বিপুল সাফল্য এনে দিয়েছে—টানা পাঁচ বছর রেকর্ড বিক্রির ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে রেকর্ড ১০,৭৪৭টি গাড়ি ক্রেতাদের হাতে তুলে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আইকনিক V10 ইঞ্জিন বাদ দেওয়ায় গাড়িপ্রেমীরা যে হাহাকার করবেন, তা আগে থেকেই জানত ইতালীয় সুপারকার নির্মাতা Lamborghini। তবে এসব অভিযোগকে স্রেফ নস্টালজিয়া হিসেবে উড়িয়ে দিচ্ছে তারা।