ইঞ্জিন বিক্রি করতে চায় Toyota

ছবিঃ Toyota

যখন গাড়ি শিল্পের বড় অংশ বৈদ্যুতিক গাড়ির পেছনে ছুটছিল, তখন Toyota বলেছিল, গাড়ির দুনিয়ায় জ্বালানি ইঞ্জিনের ভবিষ্যৎ এখনো শেষ হয়নি। এবার সেই বাজিকে আয়ের নতুন উৎসে পরিণত করতে চায় জাপানি জায়ান্টটি।

Automotive News-এর তথ্য অনুযায়ী, অন্য গাড়ি নির্মাতাদের কাছে নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মের ইঞ্জিন ও হাইব্রিড পাওয়ারট্রেন বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে এই জাপানি গাড়ি নির্মাতা। ২০৩২ সালের মধ্যে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওয়ারট্রেন বিক্রি করে বছরে প্রায় ১৫ কোটি ইউরো, অর্থাৎ ১৭০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ২১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা) আয় করতে চায় Toyota। চলতি বছরেই প্রতিষ্ঠানটি ৫০ কোটি ইউরো বা ৫৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের (প্রায় ৭ হাজার ২৫ কোটি টাকা) অর্ডার পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। নতুন ইঞ্জিন ও হাইব্রিড সিস্টেমের সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০২৭ সালেই।

২০২৬ সালে সম্পূর্ণ নতুন একটি জ্বালানি ইঞ্জিন পরিবার তৈরি করা বেশ অস্বাভাবিক ব্যাপার। অধিকাংশ নির্মাতা কঠোর নির্গমন বিধিমালা, বিশেষ করে আসন্ন Euro 7 নিয়ম মেনে চলতে পুরোনো ইঞ্জিনের নকশা হালনাগাদ করছে। কিন্তু Toyota-র বিশ্বাস, আকারে ছোট, বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী এবং বৈদ্যুতিক মোটরের সঙ্গে কাজ করার উপযোগী ইঞ্জিন তৈরি করেও এখনো ভালো ব্যবসা করা সম্ভব।

Toyota সম্ভাব্য ক্রেতাদের নাম প্রকাশ করেনি। তবে জাপানের বেশ কয়েকটি গাড়ি নির্মাতার সঙ্গে তাদের আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। Daihatsu সম্পূর্ণভাবে Toyota-র মালিকানাধীন। অন্যদিকে Subaru-র ২১.৫ শতাংশ ভোটাধিকারযুক্ত শেয়ার এবং Mazda-র ৫.১ শতাংশ শেয়ারের মালিক Toyota। সব মিলিয়ে এই কোম্পানিগুলো বছরে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ গাড়ির উৎপাদন করে। এর অর্ধেকেরও বেশি গাড়িতে থাকে Toyota, Lexus অথবা Daihatsu-র ব্যাজ।

ইতিমধ্যেই অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে Toyota প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। যেমন Mazda CX-50-এ ব্যবহার করা হয় Toyota-র হাইব্রিড প্রযুক্তি। ইউরোপে বিক্রি হওয়া Mazda2-তেও ব্যবহৃত হয়েছে Toyota-র হাইব্রিড সিস্টেম। Subaru তাদের সর্বশেষ হাইব্রিড প্রযুক্তিতে Toyota-র বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে। এমনকি Suzuki-ও ব্যবহার করে Toyota-র বিভিন্ন ইঞ্জিন।

তবে অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই Toyota-র নতুন ইঞ্জিন কিনবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। নতুন করে নকশা করা CX-5-এর জন্য নিজস্ব হাইব্রিড সিস্টেম তৈরি করছে Mazda। এর সঙ্গে থাকবে Skyactiv-Z নামের নতুন চার-সিলিন্ডার ইঞ্জিন, যেটিকে প্রতিষ্ঠানটি “আদর্শ জ্বালানি ইঞ্জিন” বলে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে Subaru নিজেদের স্বাক্ষরধর্মী boxer ইঞ্জিনের উন্নয়ন চালিয়ে যেতে চায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীরা এসব ইঞ্জিনের তাপীয় দক্ষতা (thermal efficiency) ৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।

২০২৪ সালে Toyota, Mazda ও Subaru একসঙ্গে নতুন জ্বালানি ইঞ্জিন তৈরির উদ্যোগ নেয়। অন্য নির্মাতাদের কাছে পাওয়ারট্রেন বিক্রি করতে পারলে এই যৌথ উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য আরও লাভজনক হতে পারে। এতে অন্য গাড়ি নির্মাতারা পাবে সম্পূর্ণ নতুন ইঞ্জিন পরিবার তৈরির বিপুল খরচ এড়ানোর সুযোগ। একই প্রযুক্তি ভাগাভাগি করা এবং বেশি পরিমাণে উৎপাদনের ফলে খরচও কমতে পারে। পাশাপাশি Toyota আরও বেশি ক্রেতার মধ্যে নিজেদের উন্নয়ন ব্যয় ভাগ করে দিতে পারবে।

তবে Toyota-র জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে অন্য নির্মাতাদের বোঝানো যে তাদের নিজস্ব ইঞ্জিনের তুলনায় Toyota-র ইঞ্জিন কেন বেশি লাভজনক। পরিচিত অংশীদারত্ব নতুন ব্যবসার দরজা খুলতে পারে, কিন্তু বিক্রি নিশ্চিত করতে পারে না।

২০২৪ সালে Toyota তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ইঞ্জিন পরিবারের প্রোটোটাইপগুলি প্রকাশ করেছিল। এতে রয়েছে স্বাভাবিকভাবে বাতাস গ্রহণকারী (Naturally aspirated) ১.৫ লিটারের চার-সিলিন্ডার ইঞ্জিন, টার্বোচার্জড ১.৫ লিটারের চার-সিলিন্ডার ইঞ্জিন এবং টার্বোচার্জড ২.০ লিটারের চার-সিলিন্ডার ইঞ্জিন। তিনটি ইঞ্জিনই আগের প্রজন্মের তুলনায় আরও ছোট ও বেশি কার্যকর করে তৈরি করা হচ্ছে।

টার্বোচার্জড ১.৫ লিটারের ইঞ্জিনটি প্রচলিত স্বাভাবিকভাবে বাতাস গ্রহণকারী ২.৫ লিটারের ইঞ্জিনের সমান শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হচ্ছে। বড় ২.০ লিটারের টার্বো ইঞ্জিনটি বর্তমান ২.৪ লিটারের টার্বো ইঞ্জিনের চেয়ে বেশি শক্তি উৎপাদন করবে, অথচ জ্বালানি খরচ হবে কম।

ইঞ্জিনগুলো বিদ্যুতায়নের বিষয়টি মাথায় রেখেও তৈরি করা হচ্ছে। ছোট ইঞ্জিনগুলো হাইব্রিড সিস্টেমের সঙ্গে কাজ করবে। অন্যদিকে ২.০ লিটারের টার্বো ইঞ্জিনটি এককভাবেও চলতে পারবে, আবার বিদ্যুতায়িত পাওয়ারট্রেনের অংশ হিসেবেও কাজ করতে পারবে। আকারে ছোট হওয়ায় বিভিন্ন গাড়ির প্ল্যাটফর্মে এগুলো বসানো সহজ হবে। এমনকি যেসব প্ল্যাটফর্মে একাধিক ধরনের পাওয়ারট্রেন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে, সেগুলোতেও ইঞ্জিনগুলো সহজে মানিয়ে নেওয়ার কথা।

Toyota বাজি ধরছে, জ্বালানি ইঞ্জিন ও বৈদ্যুতিক মোটর আরও বহু বছর পাশাপাশি টিকে থাকবে। বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরকে এমন কোনো দৌড় হিসেবে দেখছে না প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে শেষ পর্যন্ত একটি প্রযুক্তিই বেঁচে থাকবে। অন্য নির্মাতারা যখন ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়িতে বড় বিনিয়োগ করেছে, Toyota তখন বছরের পর বছর হাইব্রিড প্রযুক্তি উন্নত এবং আরও দক্ষ ইঞ্জিন তৈরির কাজ করেছে।

অবশ্য Toyota GR GT-এর জন্য তৈরি টুইন-টার্বোচার্জড ৪.০ লিটারের V8 ইঞ্জিনটি আপাতত অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির কোনো পরিকল্পনা নেই। ভবিষ্যতে এটি অন্য গাড়িতেও ব্যবহার করা হতে পারে। সম্ভাব্য বিকল্পের মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যতের কোনো Lexus অথবা Century মডেল। Toyota-র ব্র্যান্ড কাঠামোর একেবারে শীর্ষে এখন স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে অবস্থান করছে Century। তবে এই ইঞ্জিন অন্য কোনো মডেলে ব্যবহারের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু জানানো হয়নি।

মূলত, গাড়ি শিল্পের বড় একটি অংশ যখন তাড়াহুড়ো করে জ্বালানি ইঞ্জিনের ভবিষ্যৎ শেষ বলে ঘোষণা দিচ্ছিল, Toyota তখন ধীরস্থির পথে এগিয়েছে। এখন প্রতিষ্ঠানটি সেই ধৈর্যই অন্য কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে চায়—যেসব নির্মাতার দক্ষ ইঞ্জিন প্রয়োজন, কিন্তু নিজেদের ইঞ্জিন তৈরি করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে আগ্রহী নয়।

তবে ব্যাটারির প্রযুক্তি উন্নত হওয়া এবং চার্জ দেওয়ার সময় কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবসা কত দিন লাভজনক থাকবে, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন।

Previous
Previous

Aston Martin-এর ছাদহীন ১,০৬৪ bhp রকেট

Next
Next

Rolls-Royce-এর সাথে টক্কর দিতে চায় BYD