বাংলাদেশে গাড়ি বানাতে চায় জাপান

ছবিঃ Toyota

বাংলাদেশে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কথা ভাবছে জাপান। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে চড়া আমদানি খরচ ছাড়াই নতুন জাপানি গাড়ি কেনার সুযোগ পেতে পারেন দেশের ক্রেতারা।

The Daily Star-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে সামনে রেখে Japan External Trade Organization (JETRO) Bangladesh-এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ Kazuiki Kataoka জানিয়েছেন, গাড়ি উৎপাদন জাপানি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হয়ে উঠতে পারে।

উল্লেখ্য, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭৯,৩৭৫ কোটি টাকা) বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপান।

বর্তমানে জাপানের Toyota, Honda ও Nissan-এর মতো ব্র্যান্ডের গাড়ির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। স্থানীয় উৎপাদন শুরু হলে প্রথমে আমদানি করা যন্ত্রাংশ দিয়ে গাড়ি সংযোজন করা হবে। এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনের দিকে।

Kataoka বলেন, “প্রতিযোগিতামূলক একটি শিল্প গড়ে তুলতে আরও শক্তিশালী স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা এবং উন্নত মানের স্টিলের সহজলভ্যতা প্রয়োজন হবে।”

স্টিলের মান অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিযোগিতামূলক গাড়িশিল্প গড়ে তুলতে বাংলাদেশকে রাসায়নিক শিল্প ও নির্ভুল যন্ত্রপ্রকৌশলেও আরও দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

Kataoka আরও বলেন, “এসব সক্ষমতা ছাড়া স্থানীয় সংযোজন কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু উৎপাদন থেকে সৃষ্ট মূল্যের বড় অংশের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে।”

জাপানের ‘China Plus One’ নীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে শিল্প খাতে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে দেশটি। এই নীতির লক্ষ্য হলো, কোম্পানিগুলোকে চীনের বাইরে অন্য দেশেও উৎপাদন কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে উৎসাহিত করা। গত এক দশকে দুই দেশের বাণিজ্য ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এর বড় একটি কারণ, প্রতিযোগিতামূলক দামে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের প্রতি জাপানের চাহিদা। এই সময়ে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

সম্প্রতি Toyota, Mitsui ও Marubeni-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সফর করে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। Toyota ও Marubeni-এর প্রতিনিধিরাও বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে।

বাংলাদেশে তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়, প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যা এবং বিপুলসংখ্যক তরুণ ক্রেতাসহ বড় ভোক্তাবাজার রয়েছে। Mitsubishi ইতিমধ্যে দেশে তাদের Xpander গাড়িটি সংযোজন করছে। অন্যদিকে Changan ও Wuling-এর মতো চীনা ব্র্যান্ডগুলোও স্থানীয়ভাবে গাড়ি সংযোজন শুরু করেছে।

অন্যদিকে, Toyota Tsusho Corporation (Toyota Bangladesh) ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিক্রয়, সার্ভিসিং ও খুচরা যন্ত্রাংশের দুটি কেন্দ্র নির্মাণে ৪০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫০০ কোটি টাকা) বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের নভেম্বরে থেকে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা। পাশাপাশি National Special Economic Zone-এ হাইব্রিড ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ২০২৭ সালে উন্নয়নকাজ শুরু করে ২০২৯ সালে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন কেন্দ্রগুলো Toyota-এর বিক্রয় ও বিক্রয়োত্তর সেবার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করবে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত কারখানাটি দেশে গাড়ি উৎপাদনের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। তবে বিনিয়োগের পরিমাণ, উৎপাদন সক্ষমতা, সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং কোন কোন মডেল তৈরি হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

৪ দিনের এই সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী Takaichi Sanae-এর বৈঠক এবং ‍মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া এবং কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করাই এই সফরের লক্ষ্য।

Kataoka জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে সম্ভাব্য ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ মূলত বাংলাদেশে চলমান জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক আগ্রহ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই বহিঃপ্রকাশ। তবে জাপানি বিনিয়োগের এই বিশাল পরিধি কেবল অটোমোবাইল বা গাড়ি শিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

জ্বালানি অবকাঠামোতে আরও বড় অঙ্কের জাপানি বিনিয়োগ আসতে পারে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহসহ বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। জাপানের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান JERA ইতিমধ্যে মেঘনাঘাটে LNG-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসা সম্প্রসারণেও আগ্রহী প্রতিষ্ঠানটি।

কক্সবাজারে প্রস্তাবিত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। Japan International Cooperation Agency (JICA)-এর সহায়তায় নির্মিতব্য বন্দরটি ২০৩০ সালের দিকে সম্পন্ন হওয়ার কথা। সেখানে LNG টার্মিনাল ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।

Kataoka সতর্ক করে বলেছেন, শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ধরে রাখা যাবে না। বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নিয়মকানুন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দ্রুত শুল্ক ছাড়করণ, বৈদেশিক মুদ্রার সহজলভ্যতা এবং বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ।

Japan-Bangladesh Chamber of Commerce and Industry (JBCCI)-এর সাবেক সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়ান (জুন) জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, জ্বালানি ও লজিস্টিকস, উচ্চমূল্যের বস্ত্র, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্বাস্থ্যসেবার কথা উল্লেখ করেছেন।

তারেক রাফি বলেন, “বাংলাদেশ নীতিগত স্থিতিশীলতা, নির্ভরযোগ্য পরিষেবা এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রকল্প নিশ্চিত করতে পারলে পাঁচ বছরে প্রস্তাবিত ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ অর্জন করা সম্ভব।”

তিনি সতর্ক করেছেন, কর ও শুল্কের নিয়ম নিয়ে অনিশ্চয়তা, অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা, অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া ও মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার জটিলতা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল করছে।

তিনি আরও বলেন, “জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ প্রয়োজন।”

ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক খরচের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তারেক রাফি বাংলাদেশ-জাপানের মধ্যে একটি যৌথ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে নির্দিষ্ট বিনিয়োগকারী, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রকল্প চিহ্নিত এবং অনুমোদন, জমি বরাদ্দ, পরিষেবা ও অর্থায়নের জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমা থাকবে।

বাংলাদেশের গাড়ির ক্রেতাদের কাছে জাপানি নির্মাতাদের দেশে কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে। উচ্চ আমদানি করের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতারা জাপান থেকে আমদানি করা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ওপর নির্ভর করে আসছে। দেশে উৎপাদন শুরু হলে অবশেষে রিকন্ডিশন গাড়ির দামে নতুন জাপানি গাড়ি কেনা সম্ভব হতে পারে।

তবে এই বাড়তি গাড়ির চাপ বাংলাদেশের রাস্তা সামলাতে পারবে কি না, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন।

Previous
Previous

Tesla Roadster-কে ১০/ ১০ দিল Ferrari

Next
Next

১০৩ কোটি টাকায় বিক্রি হতে পারে Ferrari-র রেস কার