ইভি বিতর্ক: প্রচার আর বাস্তবতা

ছবিঃ Unsplash

ইলেকট্রিক ভেহিকেল বা ইভি নিয়ে বিতর্কগুলো সাধারণত অতি-সরলীকরণ করা দুটি ধারায় আটকে যায়: পরিবেশবান্ধব বনাম ক্ষতিকর, কিংবা ভবিষ্যৎ বনাম অতীত। তবে ভেতরের সংখ্যা ও পরিসংখ্যান আরও জটিল এক বাস্তবতার কথা বলে।

ছবিঃ Unsplash

শুরুটা খনিজ নিষ্কাশন দিয়ে

আধুনিক ইভি ব্যাটারির মূল ভিত্তি হলো লিথিয়াম খনন, যা ব‍্যাপকভাবে  সম্পদ-নির্ভর এবং এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে পানির তীব্র সংকট ও ভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংসের মতো সমস্যা। International Energy Agency-র তথ্য অনুযায়ী, লিথিয়াম উত্তোলনের পরিবেশগত প্রভাব পরিমাপযোগ্য, বিশেষ করে শুষ্ক অঞ্চলগুলোতে যেখানে পানির অতিরিক্ত ব্যবহার মারাত্মক সংকট তৈরি করে। অন্যদিকে, তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রেও বহু পরিচিত সমস্যা রয়েছে—যেমন তেল নিঃসরণ, মিথেন গ্যাস লিক এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি, যা United Nations Environment Programme-এর তথ্যে বিস্তারিত উঠে এসেছে। তবে বড় পার্থক্যটি কাঠামোগত। তেল প্রতিনিয়ত উত্তোলন করতে হয় এবং তা পুড়িয়ে ফেলতে হয়। বিপরীতে, ব্যাটারির উপাদানগুলো একবারই উত্তোলন করা হয় এবং তাত্ত্বিকভাবে তা পুনরুদ্ধার ও পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব।

ছবিঃ CATL

ব্যাটারির জীবনকাল ও রিসাইক্লিং

অধিকাংশ আধুনিক ইভি ব্যাটারি প্রকারভেদে ৮ থেকে ১৫ বছর স্থায়ী হওয়ার উপযোগী করে তৈরি করা হয়, যেখানে হুট করে ব্যাটারি নষ্ট না হয়ে সময়ের সাথে  ধীরে ধীরে সক্ষমতা কমে। রিসাইক্লিং ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠার পর্যায়ে রয়েছে, তবে তা ক্রমশ এগিয়ে চলেছে। লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং নিকেল পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, যা পুরো ব্যবস্থাপনাকে একটি চক্রাকার বা সার্কুলার মডেলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

কিছু দেশ এই উদ্যোগকে দ্রুত বড় পরিসরে রূপ দিচ্ছে। চীনে ইভি ব্যাটারি রিসাইক্লিং খাতের বর্তমান মূল্য প্রায় ৭৮ বিলিয়ন ডলার এবং রিসাইকেল করা উপাদানের বিক্রি প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের মধ্যে ১৫৬টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত লিথিয়াম-আয়ন রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বার্ষিক সক্ষমতা দাঁড়িয়েছিল ৪২৩.৩ মিলিয়ন টন, যার পাশাপাশি ৭১টি লেড-অ্যাসিড রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান বছরে ১.৪৭ বিলিয়ন টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করেছিল। লিথিয়াম ব্যাটারি রিসাইক্লিং থেকে এসেছে প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার এবং রিসাইকেল করা লেড থেকে যুক্ত হয়েছে আরও ৫৯ বিলিয়ন ডলার। সরকারি নীতির সমর্থনে ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার ১৩৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ছবিঃ Unsplash

কার্বন নিঃসরণ হিসাব

এখানে ব্যবধানটি অনেক বেশি স্পষ্ট, যদিও তা চূড়ান্ত  নয়। International Council on Clean Transportation (ICCT)-এর তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের পেট্রোল গাড়ি ১,৫০,০০০ কিলোমিটার চলার পথে প্রায় ৩৫.৫ মেট্রিক টন CO₂ নির্গমন করে; যেখানে ডিজেলে এই পরিমাণ প্রায় ৩৩ টন এবং হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে ২৬.৭ টন। সাধারণ জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতে চলা একটি স্ট্যান্ডার্ড ইভি থেকে নির্গত হয় প্রায় ১৭.৫ টন কার্বন, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করলে নেমে আসে ১১.৫ টনে। তবে গাড়ি তৈরির সময়ে হিসাবটা উল্টো থাকে: একটি ইভি তৈরিতে প্রায় ৮.০ টন CO₂ উৎপন্ন হয়, যেখানে সাধারণ কম্বাশন গাড়িতে লাগে ৫.৫ টন।

BMW-র নিজস্ব iX3 এবং সাধারণ পেট্রোলচালিত X3-এর মধ্যকার তুলনাতেও এটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ব্যাটারি উৎপাদনের কারণে ইভি শুরুতে বেশি কার্বন ফুটপ্রিন্ট নিয়ে পথচলা শুরু করে, তবে প্রায় ২০,০০০ কিলোমিটার চলার পরই সেই ব্যবধান ঘুচে যায়। এরপর যত পথ অতিক্রম করে, ততই ইলেকট্রিক গাড়িটি এগিয়ে যেতে থাকে—বিশেষ করে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসগুলো আরও পরিবেশবান্ধব হয়।

ছবিঃ ইমরান আবিদ

জ্বালানির সদ্ব্যবহার

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ গ্রিড এখনও মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যা ইভির পরিবেশগত সুবিধাকে কিছুটা সংকুচিত করে তোলে। তবুও, মার্কিন Environmental Protection Agency এবং Argonne National Laboratory-র গবেষণায় দেখা গেছে, পুরো জীবনকালের সার্বিক দক্ষতায় ইভি এগিয়ে থাকে। ইলেকট্রিক মোটর প্রায় ৮৭–৯১% জ্বালানি শক্তিকে গতিতে রূপান্তর করতে পারে, যেখানে গ্যাসোলিন ইঞ্জিন মাত্র ১৬–২৫% শক্তি কাজে লাগাতে পারে।

এখানকার স্থানীয় পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাতীয় CO₂ নির্গমনের প্রায় ১৫% আসে পরিবহন খাত থেকে, আর ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে রয়ে গেছে। ঢাকার যানজটে গাড়ির জ্বালানি খরচ প্রায় ৪০% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে—এমন পরিস্থিতিতে ইলেকট্রিক ড্রাইভট্রেন অনেক বেশি কার্যকরভাবে শক্তি ব্যবহার করে। আরেকটি বড় বিষয় হলো শব্দদূষণ; শহরের কিছু এলাকায় শব্দের মাত্রা ১১৯ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছায়, যা ইলেকট্রিক গাড়ি স্বাভাবিকভাবেই কমিয়ে আনতে পারে।

তা সত্ত্বেও, ইভি পুরোপুরি শতভাগ দূষণমুক্ত নয়। টায়ার এবং ব্রেকের ক্ষয়ের কারণে এখনও বাতাসে অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা ছড়ায়, যার মধ্যে PM10 এবং PM2.5 অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত ইভি বেশি ভারী হওয়ায় এগুলো বেশি পরিমাণে টায়ারের গুঁড়ো সৃষ্টি করে—যুক্তরাজ্য সরকারের হিসাব অনুযায়ী একটি সাধারণ গ্যাসোলিন সিডান যেখানে বছরে প্রায় ৮০০ গ্রাম টায়ারের ধুলো তৈরি করে, সেখানে একটি ইভি সেডান তৈরি করে প্রায় ৯৫০ গ্রাম। রিজেনারেটিভ ব্রেকিং এর ফলে ব্রেক ডাস্টের মত ক্ষুদ্র কণা কম ছড়ালেও, চাকা ও রাস্তার ঘর্ষণজনিত অন্যান্য দূষণ  (নন-এক্সজস্ট নির্গমনের)  ঠিকই রয়ে যায়।

ছবিঃ Unsplash

আর্থিক লাভ-ক্ষতি

বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে প্রায় ১৬০ টাকার বেশি , অন্যদিকে CrackPlatoon-এর মতো চার্জিং নেটওয়ার্কে চার্জ করতে খরচ হয় ইউনিট প্রতি প্রায় ১৮.৯৭ টাকা। ঢাকার ট্রাফিকে একটি সাধারণ পেট্রোল গাড়ি গড়ে প্রতি লিটারে প্রায় ১০–১২ কিলোমিটার মাইলেজ দেয়, অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে শুধু জ্বালানি খরচই দাঁড়ায় প্রায় ১৩ থেকে ১৬ টাকা।

ইলেকট্রিক গাড়ির খরচের হিসাবটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। CrackPlatoon-এর তথ্যানুযায়ী, তাদের মাধ্যমে চার্জে খরচ প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় (kWh) প্রায় ১৮.৯৭ টাকা। গাড়ির আকার ও ড্রাইভিংয়ের ওপর ভিত্তি করে বেশিরভাগ ইভিতে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ০.১৫ থেকে ০.২০ kWh বিদ্যুৎ খরচ হয়। ফলে প্রতি কিলোমিটারে শক্তি বাবদ খরচ দাঁড়ায় মাত্র ২.৮ থেকে ৩.৮ টাকার মতো।

এই ব্যবধানটি বিশাল। চরম প্রতিকূল বা অদক্ষ পরিস্থিতিতেও একটি পেট্রোল গাড়ির তুলনায় ইভি চালাতে প্রতি কিলোমিটারে এক-তৃতীয়াংশেরও কম খরচ হয়। ঢাকার মতো জ্যামবহুল রাস্তায় এই পার্থক্যটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে, যেখানে ইঞ্জিন চালু রেখে স্থির দাঁড়িয়ে থাকলে পেট্রোল গাড়ি প্রচুর জ্বালানি নষ্ট করে, অথচ ইভি স্থির থাকা অবস্থায় প্রায় কোনো শক্তিই খরচ করে না।

ছবিঃ Unsplash

মুল সমস্যা

চার্জিং অবকাঠামো এখনও বেশ সীমিত, যদিও তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। CrackPlatoon বর্তমানে সারাদেশে ২৪টি স্টেশন পরিচালনা করছে এবং তাদের লক্ষ্য এটি ১০০-তে নিয়ে যাওয়া। তবে সর্বশেষ বাজেটে ইভি চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে আমদানি করা ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর থাকা ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইভি ও ব্যাটারি উৎপাদন এবং বাণিজ্যিক বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাকের জন্যও কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

তবে এখনও রেঞ্জ এনজাইটি বা চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় একটি বাস্তব সমস্যা, যদিও বৈশ্বিক পরিসরে ইভির রেঞ্জ এখন প্রতি চার্জে ৪০০–৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

এর ওপর বাংলাদেশে ইভির ওপর আমদানি শুল্ক অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ৮৯.৩২%, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। রেজিস্ট্রেশন ফি-ও তুলনামূলক  বেশি: একটি সাধারণ ছোট পেট্রোল গাড়ির ক্ষেত্রে যেখানে রেজিস্ট্রেশন ফি মাত্র ২৫,০০০ টাকা, সেখানে একটি ইভির জন্য তা প্রায় ১,৭১,০০০ টাকা।

ছবিঃ Unsplash

পরিশেষে

ইভির বাস্তবতা পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব কিংবা শতভাগ ক্ষতিকর—এমন একপেশে মন্তব্য করা সম্ভব  নয়। ইভি দীর্ঘমেয়াদে কম কার্বন নিঃসরণ এবং উল্লেখযোগ্যভাবে স্বল্প পরিচালনা খরচের সুবিধা দেয়, কিন্তু এটি কোনো জাদুকরী একক সমাধান নয়। এর সার্বিক সুফল কেবল গাড়ির ওপর নির্ভর করে না; বরং দেশের বিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, চার্জিং অবকাঠামো কতটা গড়ে উঠছে এবং সরকারি নীতিমালা কোন দিকে মোড় নিচ্ছে—এসব ঘিরে আবর্তিত হবে।

রাহবার আল হক

অটোমোবাইল সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিতে রাহবার আল হকের রয়েছে ১০ বছরেরও বেশি সময়ের পথচলা। দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS), দ্য টারবাইন এবং অটোড্রাইভ বিডি-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মে সম্পাদকীয় পরিচালনা, নতুন কনটেন্ট টিম গড়ে তোলা এবং টেস্ট ড্রাইভের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

Next
Next

হর্সপাওয়ার থেকে আত্মিক সম্পর্ক: অটোমোবাইল মার্কেটিংয়ের বিবর্তন