চীনা গাড়ির বিরুদ্ধে ক্রমেই ব্যয়বহুল সব বাধা তৈরি করছে ইউরোপ। তবে Zeekr-এর মতে, এসব পদক্ষেপ ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের আত্মবিশ্বাসের চেয়ে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা নিয়ে তাদের ভয়েরই প্রকাশ ভীতিরই বহিঃপ্রকাশ।
আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি এবং চীনা গাড়ির ওপর নতুন বিধিনিষেধ সত্ত্বেও ইউরোপের বাজার থেকে সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই এই চীনা গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটির। এমনটাই জানিয়েছেন Zeekr Europe-এর CEO Lothar Schupet।
সম্প্রতি ইউরোপীয় ও চীনা কর্মকর্তারা একটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন। এর আওতায় চীন থেকে বছরে আমদানি করা যাবে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি। Paris Auto Show-তে InsideEVs-কে Schupet সাক্ষাৎকার দেওয়ার কিছুক্ষণ আগেই এই ঘোষণা আসে।
ইতিমধ্যে Zeekr-এর 7X-এর মতো বৈদ্যুতিক গাড়ি ইউরোপে আমদানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুল্ক দিতে হচ্ছে। সামনে আসতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির 9X মডেলটিও পড়বে নতুন আমদানি বিধিনিষেধের আওতায়। প্রায় ৯০০ হর্সপাওয়ারের এই আলট্রা-লাক্সারি প্লাগ-ইন হাইব্রিড SUV-টি Zeekr-এর অন্যতম উচ্চাভিলাষী মডেল।
Schupet মনে করেন, চীনা গাড়ি নির্মাতাদের ক্রমবর্ধমান সাফল্যের প্রতিক্রিয়াতেই মূলত এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। InsideEVs-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, চীনা ব্র্যান্ডগুলো ব্যর্থ হচ্ছে বলেই কি এসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে, নাকি তারা অতিরিক্ত সফল হয়ে উঠছে বলেই ইউরোপ এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে?
তিনি বলেন, “বাণিজ্যিক পরিবেশের পুরো বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখছেন, তার ওপর নির্ভর করে এটি বেশ মজার। এই যে এত আলোচনা আর বিধিনিষেধ, এগুলো কি আমরা অনেক বেশি সফল হয়ে গেছি বলে আসছে, নাকি সফল হতে গেলে আমাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই হতো? আমার মনে হয় প্রথম কারণটাই ঠিক। আসলে কী ঘটছে, তা নিয়ে সবাই কিছুটা আতঙ্কে আছে এবং নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে।”
তাঁর বক্তব্যের পেছনে কিছু যুক্তিও রয়েছে। আমদানি শুল্ক থাকা সত্ত্বেও ইউরোপীয় নির্মাতারা দাম ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। একই সময়ে ইউরোপের অর্থনীতিগুলো দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে গাড়িশিল্পের নিয়ন্ত্রণ হারানো ইউরোপের জন্য হতে পারে ভয়াবহ ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপীয় সরকারগুলোও এখন স্থানীয় নির্মাতাদের প্রতিযোগিতায় পাল্লা দেবার সময় দিতে শুল্ক ও বিধিনিষেধ ব্যবহারে আরও আগ্রহী হয়ে উঠছে।
তবে Zeekr বসে থাকার পাত্র নয়। Tesla Model Y-এর প্রতিদ্বন্দ্বী 7X সম্প্রতি তার মিড-সাইকেল আপডেট পেয়েছে। এতে যুক্ত হয়েছে ১১ মিনিটেরও কম সময়ে চার্জ করার সুবিধা এবং Bosch-এর অ্যাডভান্সড ড্রাইভার অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেম (ADAS)।
স্থানীয় বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে ইউরোপে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টাও করছে প্রতিষ্ঠানটি। ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে ডিজাইন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং করপোরেট কার্যক্রমে কর্মী নিয়োগ দিয়েছে Zeekr। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির মূল কোম্পানি Geely Group ইউরোপে বিনিয়োগ করছে কয়েক বিলিয়ন ডলার।
Schupet-এর মতে, ইউরোপীয় সরবরাহকারী এবং স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে Zeekr-এর কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, “আমাদের গাড়ির জন্য ইউরোপের বিশাল সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক ইতিমধ্যেই রয়েছে। আমরা বিভিন্ন জায়গায় সহযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এখানে আমাদের বিনিয়োগ ও উপস্থিতি রয়েছে। বর্তমানে আমাদের ২০০টি ডিলার রয়েছে, যার সংখ্যা আরও বাড়ছে। তাই ব্র্যান্ড হিসেবে আমরা যে বড় অর্থনৈতিক অবদান রাখছি, সেটিকে কারও অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।”
এই বিনিয়োগের সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ইউরোপে Zeekr-এর ব্যবসা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ২০০ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি ডিলার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং নতুন মডেল বাজারে আনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে 7X তাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি মডেল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
আসন্ন 9X আরও বড় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার অংশ। প্রায় ৯০০ হর্সপাওয়ারের বিলাসবহুল প্লাগ-ইন হাইব্রিড SUV-টিতে এমন প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম থাকছে, যা প্রচলিত জার্মান গাড়ি নির্মাতাদের পক্ষে পাল্লা দেওয়া কঠিন করে তুলবে। তবে নতুন হাইব্রিড আমদানি বিধিনিষেধের কারণে জটিল হয়ে উঠতে পারে ইউরোপে 9X-এর বাজারজাতকরণ।
Schupet স্বীকার করেছেন, এসব বিধিনিষেধের জবাবে প্রতিষ্ঠানটি কী পদক্ষেপ নেবে, তা আপাতত ঠিক করেনি। এর একটি কারণ হলো, চূড়ান্ত নিয়মকানুন এখনও পরিষ্কার নয়।
তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, বর্তমান হাইব্রিড বিতর্কের বিষয়ে বলতে গেলে, বিষয়টি এখনও বেশ অস্পষ্ট। আজ পর্যন্ত বিধিনিষেধগুলো পরিষ্কার নয়। কীভাবে আমরা এর মোকাবিলা করব, সে বিষয়ে এই মুহূর্তে কোনো অবস্থান বা বক্তব্য আমি দিতে পারছি না। তবে EV-এর ওপর আরোপিত শুল্ক আমাদের দেখিয়েছে যে, আমরা এই ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারি।”
অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন Schupet। সেখানে ব্যবসা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
তিনি বলেন, “আমরা ইউরোপের প্রতি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই এখানে আমাদের ব্যবসা আরও প্রসারের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা এখানে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছি এবং ভবিষ্যতেও বিনিয়োগ করব। ইউরোপে আমরা সফল হব। তাই একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করার চেয়ে সহযোগিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, গাড়িশিল্পে আমরা সবাই একই নৌকায় বসে আছি।”
ইউরোপীয় নির্মাতাদের শেষ কথাটি মনে রাখা উচিত। শুল্ক আরোপ করে চীনা গাড়ির দাম বাড়ানো যায়, আমদানি সীমিত করে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং বিধিনিষেধের মাধ্যমে স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে কিছুটা বাড়তি সময় দেওয়া যায়। কিন্তু এসবের কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের নিজেদের গাড়িকে আরও ভালো কিংবা প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে না।
Zeekr আপাতত দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। অন্যদিকে, সেই লড়াইয়ে কীভাবে জিততে হবে, বা নিদেনপক্ষে টিকে থাকার পথটি ইউরোপকেই এখনও খুঁজে বের করতে হবে।
চীনা গাড়ির বিরুদ্ধে ক্রমেই ব্যয়বহুল সব বাধা তৈরি করছে ইউরোপ। তবে Zeekr-এর মতে, এসব পদক্ষেপ ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের আত্মবিশ্বাসের চেয়ে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা নিয়ে তাদের ভয়েরই প্রকাশ ভীতিরই বহিঃপ্রকাশ।