ছবিঃ Volkswagen
Volkswagen-এর বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানায় এক নতুন কাজ শুরু হয়েছে: গাড়ি ভেঙে যন্ত্রাংশ আলাদা করা।
জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি তাদের Zwickau কারখানার একটি অংশকে শিল্পভিত্তিক গাড়ি ভাঙার (স্ক্র্যাপিং) কেন্দ্রে রূপান্তর করছে। লক্ষ্য, পুরোনো গাড়ি থেকে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ পুনরুদ্ধার করে বিক্রি করা।
২০১৮ সালে কারখানাটিকে নিজেদের অন্যতম প্রধান বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করতে ১২০ কোটি ইউরো বা প্রায় ১,৬৮,০০০ কোটি টাকা খরচ করেছিল Volkswagen। এরপর ২০১৯ সালের নভেম্বরে সেখানে শুরু হয় ID.3 বৈদ্যুতিক হ্যাচব্যাকের উৎপাদন। ২০২০ সালের জুনে সর্বশেষ জ্বালানিচালিত গাড়িটি এই উৎপাদন লাইন ছেড়ে বের হয়। এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ‘ID.5’ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে এই রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হয়।
বর্তমানে Zwickau-তে Volkswagen-এর MEB প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে Volkswagen, Audi এবং Cupra-র ছয়টি বৈদ্যুতিক মডেল তৈরি হয়। পূর্বে এই কারখানাটিকে রূপান্তর করতে উৎপাদন লাইন নতুন করে সাজানো, বাড়তি অটোমেশন এবং কর্মীদের চুলচেরা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়েছিল। এখন সেই যন্ত্রপাতি ও কর্মীদের একাংশ পুরোনো গাড়ি খুলে যন্ত্রাংশ আলাদা করবে।
নতুন এই কার্যক্রমে গাড়ি ভাঙার জন্য একটি আট ধাপের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। শুরুতে ভাঙ্গা হবে উৎপাদনের আগের পরীক্ষামূলক গাড়িগুলো। পরে সাধারণ মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে। Volkswagen-এর আশা, ২০২৭ সাল থেকে কারখানাটিতে বছরে ৪,১০০টি গাড়ি ভাঙা সম্ভব হবে। কাজ চলবে দুই শিফটে। ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ জন কর্মীকে নতুন দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কারখানাটির নির্মাণ ও অনুমোদন পেতে সময় লেগেছে নয় মাস। কাজ শেষ হয়েছে নির্ধারিত সময়ের তিন মাস আগেই। Volkswagen জানিয়েছে, আগের উৎপাদন সরঞ্জামগুলো পুনর্ব্যবহার করায় নতুন কার্যক্রম চালুর খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে।
ভেঙে ফেলা গাড়িগুলো থেকে সংগ্রহ করা পুনর্ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ বিক্রির কার্যক্রমও শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত জুলাই থেকে দরজা, বাম্পার, বৈদ্যুতিক মোটর এবং ট্রান্সমিশনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ Volkswagen-এর ডিলার ও সার্ভিস নেটওয়ার্ক, স্বাধীন ওয়ার্কশপ এবং যন্ত্রাংশ বিক্রেতাদের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। লক্ষ্য হলো গাড়ি মেরামতের খরচ কমানো এবং পুরোনো গাড়িগুলোকে স্ক্র্যাপ হিসেবে বাতিল না করে আরও দীর্ঘদিন রাস্তায় সচল রাখা।
তবে বর্তমানে বিক্রি হওয়া যন্ত্রাংশগুলো কোন কোন গাড়ি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা জানায়নি Volkswagen। এসব যন্ত্রাংশের দাম, বিক্রির পরিসংখ্যান, ওয়ারেন্টির শর্ত কিংবা পুনরায় বিক্রির আগে সেগুলো কীভাবে পরীক্ষা করা হয়, সে সম্পর্কেও কিছু প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। ভাঙা গাড়ি থেকে উদ্ধার করা যন্ত্রাংশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের জন্য এসব তথ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অবশ্য সব যন্ত্রাংশ বিক্রির জন্য আলাদা করা হবে না; Volkswagen মূলত গাড়ি থেকে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করে তা পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। প্রক্রিয়াজাতকরণের আগে প্লাস্টিকের ধরন অনুযায়ী আলাদা করা হলে নতুন যন্ত্রাংশ তৈরিতে সেগুলোর গুণগত মান ধরে রাখা সহজ হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, একটি গাড়ি থেকে পাওয়া প্লাস্টিক দিয়ে পরবর্তী তিনটি নতুন গাড়ির জন্য যথেষ্ট উপাদান তৈরি করা সম্ভব—যদিও তা নতুন গাড়িগুলোর সামগ্রিক প্লাস্টিকের চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারবে না।
এই ব্যবসা সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ ৯ কোটি ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ১২,৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা ভাবছে Volkswagen। এতে সহায়তা হিসেবে Saxony সরকার ১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো বা প্রায় ২,৩৮০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সম্প্রসারিত কার্যক্রমটি ভবিষ্যতে তৈরি করতে পারে প্রায় ১,০০০ কর্মসংস্থানের সুযোগ।
এই বিনিয়োগের পেছনে অন্য একটি কারণও রয়েছে। ২০৩১ সালের পর Zwickau কারখানায় নতুন কোনো গাড়ি উৎপাদনের পরিকল্পনা নেই Volkswagen-এর। গাড়ি ভাঙা ও পুনর্ব্যবহারের কাজ শুরু হলে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পরও কারখানাটিতে নতুন কাজ এবং আয়ের উৎস তৈরি হতে পারে। তবে এত বড় পরিসরে এই ব্যবসা লাভজনকভাবে চালিয়ে যাওয়ার মতো আয় হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
এই উদ্যোগের সময়টাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় EV থেকে Volkswagen-এর মুনাফার হার অনেক কম। বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বাড়লেও তা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক লাভের ওপর উল্টো চাপ তৈরি করছে। এমনকি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাবের কারণে আসন্ন বৈদ্যুতিক Golf মডেলের উন্নয়নকাজও স্থগিত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আর Zwickau-তে এখন শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি হলেও, সেখানে ভাঙার জন্য আনা গাড়িগুলো সব EV হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। Volkswagen নিশ্চিত করেনি যে কারখানাটি শুধু বৈদ্যুতিক গাড়িই ভাঙবে। আর প্রকাশিত ছবিতে অন্তত একটি প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ি দেখা গেছে। তবে Volkswagen সেই গাড়িটির মডেল নিশ্চিত করেনি।
এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। শুধু ইলেকট্রিক গাড়ি ভাঙার মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে উদ্ধার করে বিক্রি করার মতো যন্ত্রাংশের সংখ্যাও কমে যাবে। গাড়ি ভেঙে সবচেয়ে বেশি আয় করতে চাইলে পেট্রল ও ডিজেলচালিত মডেলগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
এটি Volkswagen-এর জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরির বুদ্ধিদীপ্ত উপায়, নাকি বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবসাকে লাভজনক করতে হিমশিম খাওয়া একটি গাড়ি নির্মাতার মরিয়া চেষ্টা, তা সময়ই বলে দেবে।
Volkswagen-এর বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানায় এক নতুন কাজ শুরু হয়েছে: গাড়ি ভেঙে যন্ত্রাংশ আলাদা করা।