চীনা গাড়ির অপেক্ষায় কানাডা
ছবিঃ BYD
যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনা গাড়ি বাজারে ঢোকা নিয়ে আতঙ্ক আছে, তখন প্রতিবেশী কানাডার প্রায় অর্ধেক মানুষ চিনের গাড়ির পথ চেয়ে আছে।
Automotive News-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, Abacus Data এবং থিংক ট্যাংক Clean Energy Canada প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ উত্তরদাতা চান তাঁদের পরবর্তী গাড়িটি বিদ্যুৎ চলিত (ইভি) হবে। আরও মজার বিষয় হলো, সেই সম্ভাব্য ক্রেতাদের ৪২ শতাংশ কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর বাজারে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি।
উল্লেখ্য, কানাডা এর আগে চীন থেকে আমদানি করা ইভীর ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। তবে জানুয়ারিতে অবস্থান বদলে দেশটি নির্দিষ্ট কোটা অনুযায়ী ৬.১ শতাংশ শুল্কে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির অনুমতি দেয়।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কানাডায় নতুন গাড়ি কেনা ক্রেতাদের মাত্র ১০.৮ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি বেছে নিয়েছেন। অর্থাৎ, এই বাজার বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে, আর সুলভ চীনা মডেলগুলো সেই চাহিদা পূরণে গুরত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
স্বাভাবিকভাবেই, সবাই এই সিদ্ধান্তে খুশি নয়। অনেক মার্কিন গাড়ি নির্মাতা এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের ব্যবসার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে The Wall Street Journal-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে General Motors-এর CEO Mary Barra নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন।
ছবিঃ Geely
“কানাডায় কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা আমি ব্যাখ্যা করতে পারছি না। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এক পিচ্ছিল পথ,” বলেন Barra।
তাঁর যুক্তি, এই পদক্ষেপ উত্তর আমেরিকার উৎপাদনশিল্প, কর্মসংস্থান ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তিনি আরও সতর্ক করেন, চীনা নির্মাতাদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিলে উত্তর আমেরিকায় একটি শক্তিশালী ও সংকট মোকাবিলায় সক্ষম শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কারণ, নিজ দেশে চীনা গাড়ি নির্মাতারা কর সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা ভোগ করে। তাঁর দৃষ্টিতে, কানাডায় সহজলভ্য চীনা গাড়ি প্রবেশের অনুমতি দেওয়া মুক্তবাণিজ্যের চর্চা নয়, বরং নিজেদের শিল্পের ক্ষতি করারই নামান্তর।
বার্তাটি স্পষ্ট: চীনা গাড়ি ঢুকতে দিলে স্থানীয় কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অন্যদিকে BYD এবং আরও কয়েকটি চীনা নির্মাতা কানাডায় কারখানা স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ চীনা বিনিয়োগ ও স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনায় কানাডাতে কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, যেসব কর্মী এখন কানাডার General Motors-এর কারখানায় কাজ করছে তা বন্ধ হয়ে গেলে BYD বা অন্য কোনও চিনা কারখানায় তাদের নতুন কর্মস্থল হতে পারে।
ইতিমধ্যেই চীনা নির্মাতারা কানাডাজুড়ে ডিলার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতেও শুরু করেছে। Chery, Geely, BYD এবং Dongfeng-সহ বেশ কয়েকটি নির্মাতা কানাডার বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো দাম। চীনা ইভীগুলো তুলনামূলক কম দামে উন্নত প্রযুক্তি ও প্রচুর ফিচার দেওয়ার জন্য পরিচিতি। চীনে কিছু মডেলের দাম মাত্র ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ২৫ লাখ টাকা। যদিও কানাডার বাজারে কোনো গাড়ির দাম এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। তবে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে আসার পরও এই দাম অপরিবর্তিত থাকবে, এমনটা আশা করাটা অবাস্তব।
ছবিঃ BYD
তা সত্ত্বেও, প্রতিযোগিতামূলক দাম চীনা নির্মাতাদের বড় সুবিধা দিতে পারে। প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোর পেছনে কয়েক দশকের ইতিহাস থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো ব্র্যান্ড যখন স্বল্প দামে বেশি ফিচার দেয়, তখন প্রবীণ ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্যেরও ঘাটতি পড়াটাই স্বাভাবিক।
এদিকে, চীনা গাড়ির সম্ভাব্য প্রবেশকে যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশাল হিসেবে সংকট দেখছে। Republican Senator Bernie Moreno চীনা গাড়িকে “ক্যানসার” বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, Washington এমন আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার লক্ষ্য মার্কিন বাজার থেকে চীনা গাড়ি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে চীনা নির্মাতাদের বাইরে রাখার কৌশল দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু গাড়ি নির্মাতার বিশ্বাস, এই সুরক্ষাবাদী পদক্ষেপ কেবল অনিবার্য পরিণতিকে খানিকটা পিছিয়ে দেবে। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-ও সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীনা গাড়িগুলো যদি মার্কিন মাটিতে সংযোজন করা হয়, সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ব্যাপারে তিনি রাজি হতে পারেন।
Ford-এর CEO Jim Farley এর আগে সতর্ক করেছিলেন, চীনা গাড়ি মার্কিন বাজারে প্রবেশ করলে সেগুলো “অস্তিত্বের জন্য হুমকি” হয়ে উঠতে পারে। চীনা নির্মাতাদের প্রযুক্তি, উৎপাদনের ব্যাপক সক্ষমতা এবং আগ্রাসী মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে তাঁর উদ্বেগ অমূলক নয়।
ছবিঃ BYD
তবে প্রতিযোগীদের বাইরে রাখাকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই কৌশল হিসেবে ব্যবহারও করা যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। চীনা নির্মাতারা যদি উত্তর আমেরিকায় গাড়ি তৈরি করতে পারে, স্থানীয় কর্মীদের নিয়োগ দেয় এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে গাড়ি বিক্রি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তি দাঁড় করানো অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
মার্কিন ক্রেতাদের জন্য হিসাবটি বেশ সরল: গাড়িবাজারে আরও বেশি বিকল্প এবং সম্ভাব্য কম দাম। অন্যদিকে, চীনা প্রতিযোগিতাহীন বাজারে অভ্যস্ত গাড়ি নির্মাতাদের জন্য বিষয়টি মোটেও সুখকর নাও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িশিল্প নিজেদের বাজারের চারপাশে দেয়াল তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে কানাডা একটি দরজা খুলে দিচ্ছে। সীমান্তের উত্তরে চীনের তৈরি গাড়ি জনপ্রিয় হয়ে উঠলে Detroit হয়তো বুঝতে পারবে, তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা চীনের উৎপাদনশিল্প কিংবা সরকারি নীতি নয়। আসল সমস্যা হলো, ক্রেতারা হয়তো সত্যিই প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিক্রি করা গাড়িগুলো বেশি পছন্দ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনা গাড়ি বাজারে ঢোকা নিয়ে আতঙ্ক আছে, তখন প্রতিবেশী কানাডার প্রায় অর্ধেক মানুষ চিনের গাড়ির পথ চেয়ে আছে।