ছবিঃ Aston Martin
James Bond-এর ব্যবহৃত গাড়িসহ বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কিছু গাড়ি তৈরি করেছে Aston Martin। কিন্তু মানুষের কাছে আকাঙ্ক্ষিত হওয়া আর ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।
ব্রিটিশ গাড়ি নির্মাতার ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে কর-পূর্ববর্তী লোকসান হয়েছে ৭৭.১ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা)। বছরের প্রথম নয় মাসে সেই লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩১.৩ মিলিয়ন পাউন্ডে (প্রায় ২,৮৯১ কোটি টাকা)। প্রায় ছয় বছর আগে কানাডীয় ধনকুবের Lawrence Stroll-এর নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে Aston Martin-এর কর-পরবর্তী মোট লোকসান প্রায় ২.৩ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ২৮,৭৫০ কোটি টাকা)।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি খারাপ নয়। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৩৮৮.৭ মিলিয়ন পাউন্ডে (প্রায় ৪,৮৫৯ কোটি টাকা) পৌঁছেছে। প্রথম নয় মাসের আয়ও ৩৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১.০১৭ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১২,৭১৩ কোটি টাকা)। একই সময়ে তৃতীয় প্রান্তিকের কর-পূর্ববর্তী লোকসানও ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের কর-পূর্ব লোকসান ১১.৯ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১,৩৯৯ কোটি টাকা) থেকে কমে ২০২৬ সালে হয়েছে ৭৭.১ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা) ।
এই উন্নতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বেশি দামের গাড়ি। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে Aston Martin মোট ৩,৭৬২টি গাড়ি সরবরাহ করেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩৫০টি ছিল প্রতিষ্ঠানটির Specials বিভাগের তৈরি Valhalla Coupe।
ক্রেতারাও এখন গাড়ির পেছনে আগের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করছেন। বছরের প্রথম নয় মাসে গাড়িপ্রতি গড় বিক্রয়মূল্য ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার পাউন্ডে (প্রায় ৩ কোটি ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা)। শুধু তৃতীয় প্রান্তিকেই গড় বিক্রয়মূল্য ৩৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৩ কোটি ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা)। মোট মুনাফা ৭১ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৫ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড (প্রায় ৪,৪৭৫ কোটি টাকা)। একই সময়ে মোট মুনাফার হার ২৮.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫.২ শতাংশে।
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পুনরুদ্ধারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে Valhalla। এই সুপারকারটির উৎপাদন স্লট প্রায় পুরোপুরি বিক্রি হয়ে গেছে। ২০২৭ সালের প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত গাড়িটির ডেলিভারি চলবে। পাশাপাশি Valhalla Spider নামে এর ছাদখোলা সংস্করণও সামনে এনেছে Aston Martin। কোম্পানির CFO Doug Lafferty জানিয়েছেন, Coupe-এর তুলনায় Spider-এর দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেশি হবে।
এত সব ইতিবাচক পরিসংখ্যানের পরও নগদ অর্থের সংকট কাটছে না। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে কোম্পানির নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.৫৭ বিলিয়ন পাউন্ডে (প্রায় ১৯,৬২৫ কোটি টাকা)। ২০২৫ সালের শেষে এই অঙ্ক ছিল ১.৩৮ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১৭,২৫০ কোটি টাকা)। মোট ঋণ প্রায় ১.৯ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ২৩,৭৫০ কোটি টাকা), আর হাতে থাকা ব্যবহারযোগ্য আর্থিক তহবিলের পরিমাণ পরিমাণ ৩২১.৬ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৪,০২০ কোটি টাকা)।
ঋণের পাশাপাশি বাড়ছে অর্থায়নের খরচ। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে সমন্বিত নিট অর্থায়ন ব্যয় হয়েছে ১৪৯ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১,৮৬৩ কোটি টাকা)। গত বছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ৬৫ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৮১৩ কোটি টাকা)। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তা হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি ।
সহজ কথায়, Aston Martin এখন আগের চেয়ে বেশি গাড়ি বিক্রি করছে, বেশি দাম নিচ্ছে এবং প্রতিটি গাড়ি থেকে বেশি মুনাফাও করছে। কিন্তু সেই অর্থ ধরে রাখতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। নতুন গাড়ির লাইনআপ যতই আকর্ষণীয় হোক, দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানোর মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নিয়মিত আয় করার ব্যবসায়িক কাঠামো এখনো গড়ে তুলতে পারেনি তারা।
তবে বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রে ধীরগতিতে এগোনোর সিদ্ধান্তটি Aston Martin-এর জন্য সুখবর হতে পারে। ধনী ক্রেতাদের মধ্যে এখনো বড় ইঞ্জিনের গাড়ির চাহিদা রয়েছে, বিশেষ করে V12 ইঞ্জিন, সীমিত সংখ্যায় তৈরি সুপারকার এবং বিশেষ সংস্করণের গাড়ির। এই বাজারে ইঞ্জিনের শব্দ, নিজস্ব চরিত্র এবং গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা এখনো বড় আকর্ষণ। ফলে Aston Martin-এর মত জ্বালানি ইঞ্জিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে থাকা একটি ব্র্যান্ডের জন্য দ্রুত ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়া একটি ব্যয়বহুল ভুল হত।
এ কারণেই বিদ্যুতায়নের পরিকল্পনা অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। CEO Adrian Hallmark জানিয়েছেন, ২০৩৩ সালের আগে তাদের প্রথম উৎপাদিত বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে আসবে না। এমনকি সেটি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পিছিয়েও যেতে পারে। এর মধ্যে V8 ও V12 ইঞ্জিনের উৎপাদন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্গমনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ মেনে চলতে যেখানে প্রয়োজন হবে, সেখানে নেওয়া হবে হাইব্রিড প্রযুক্তির সহায়তা ।
আপাতত অ্যাস্টন মার্টিনের ভরসা তাদের ধনী ক্রেতাদের ওপর, যারা সীমিত সংস্করণের গাড়ির জন্য বাড়তি দাম দিতে রাজি। কৌশল হিসেবে এটি যুক্তিসংগত মনে হলেও, আর্থিকভাবে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হতে ঋণের এই বিশাল পাহাড় কাটিয়ে ওঠার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এখনো বাকি।
James Bond-এর ব্যবহৃত গাড়িসহ বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কিছু গাড়ি তৈরি করেছে Aston Martin। কিন্তু মানুষের কাছে আকাঙ্ক্ষিত হওয়া আর ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।