Rolls-Royce-এর সাম্রাজ্যে প্রবেশ করলো BYD

ছবিঃ Yangwang

BYD ইতিমধ্যে ইউরোপের সাধারণ গাড়িবাজারের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে। কিন্তু তাদের নতুন সৃষ্টির লক্ষ্য ইউরোপের গাড়ি নির্মাতাদের শেষ দুর্গ: অতি বিলাসবহুল গাড়ি।

পরিচিত হোন Yangwang Altior-এর সঙ্গে। বিশাল এই বৈদ্যুতিক লিমুজিনটি আত্মপ্রকাশ করেছে আবু ধাবিতে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে। এই লিমুজিনটির মাধ্যমে পারফরম্যান্স SUV এবং ইলেকট্রিক সুপারকারের বাইরে এবার বড় আকারের বিলাসবহুল সেডানের বাজারেও পা রাখছে Yangwang। লক্ষ্য , Rolls-Royce Ghost, Mercedes-Maybach S-Class এবং Maextro S800-এর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া।

Altior নামটি এসেছে লাতিন শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘আরও উঁচু’। চীনা বাজারে অবশ্য গাড়িটি একটি ভিন্ন নাম ব্যবহার করবে, Dingyao (鼎曜)। উন্নয়নকালে গাড়িটির কোডনামে ছিল HU।

Yangwang-এর বিক্রয় বিভাগের মহাব্যবস্থাপক Hu Xiaoqing জানিয়েছেন, গাড়িটি তৈরি করতে সময় লেগেছে তিন বছর। শুধু সামনের অংশের নকশা তৈরিতেই বিবেচনা করা হয়েছিল ১০০টির বেশি প্রস্তাব। মজার ব্যাপার হলো, এত বিশ্লেষণের পর যে চূড়ান্ত গ্রিলটি বাছাই করা হয়েছে সেটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ একজন Yangwang U9-এর সামনের অংশ খুলে এনে Altior-এর সামনে জুড়ে দিয়েছে।

বিশাল এই গ্রিলে রয়েছে কাটা রত্নের আদলে তৈরি ১৩৭টি আলোর উপাদান। এর আলোর নকশার অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে প্রাচীন চীনের Ding আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ব্রোঞ্জের পাত্র থেকে। হেডলাইটগুলোর আনুষ্ঠানিক নাম বেশ গালভরা: Ding-shaped diamond-cut crystal lights।

বাইরের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে টু-টোন পেইন্ট, লম্বা C-পিলার এবং পালিশ করা মনোব্লক ডিশ চাকা। গাড়ির পাশ বরাবর রয়েছে হাতে আঁকা ৪.৮ মিটার লম্বা দুটি কোচলাইন। সামনের প্রতীকটি তৈরি করা হয়েছে খাঁটি ২৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে। সামনের দরজাগুলো খোলে ৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত। অন্যদিকে, পেছনের দিকে কবজা লাগানো কোচ ডোর (Suicide door) খুলে যায় ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত। দরজার খুললে পাওয়া যাবে লুকানো ছাতা। বলাবাহুল্য, গাড়িটির ডিজাইনাররা Rolls-Royce-এর নকশার বই থেকে বেশ কিছু পাতা “ধার” নিয়েছে।

২১ ইঞ্চির চাকায় ব্যবহার করা হয়েছে ২৭৫/৪৫ R২১ মাপের Continental PremiumContact C টায়ার। চাকাগুলোর মাঝখানে থাকা বিশেষ ক্যাপগুলো গাড়ি চলার সময়ও Yangwang-এর লোগোকে সোজা রাখে। Altior-এর দৈর্ঘ্য ৫,৬০০ মিমি, প্রস্থ ২,০৩০ মিমি এবং উচ্চতা ১,৫৯০ মিমি। এর হুইলবেস ৩,৫০০ মিমি। অর্থাৎ Rolls-Royce Ghost-এর চেয়ে এটি ২০১ মিমি লম্বা। সরু জায়গায় গাড়ি পার্ক করার জন্য যে এই গাড়ি তৈরি হয়নি, সেটি উল্লেখ করাটা নিষ্প্রয়োজন।

ভেতরেও Rolls-Royce-এর প্রভাব স্পষ্ট। Altior-এ রয়েছে চার আসনের এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জ। সামনের ড্যাশবোর্ডজুড়ে রয়েছে বিস্তৃত প্যানোরমিক ওয়াইডস্ক্রিন। পেছনের যাত্রীদের জন্য ছাদে বসানো হয়েছে ২১.৪ ইঞ্চির ভাঁজ করা স্ক্রিন। কেবিনে রয়েছে দুটি ৫.৫ লিটারের ফ্রিজ, যেগুলোর তাপমাত্রা আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

Rolls-Royce-এর সাথে Altior-এর সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রমটা এখানেই। ব্রিটিশ ব্র্যান্ডটি যেখানে সকল স্ক্রিন এবং কেবিনের অপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তি লুকিয়ে রাখতে চায়, সেখানে Yangwang-এর ধারণা হলো—চোখের সামনে যত বেশি প্রযুক্তি, ততই ভালো। পেছনের যাত্রীদের জন্য আরও রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় এক্সিকিউটিভ আইল্যান্ড। এতে আছে ভাঁজ করা যায় এমন কাজের টেবিল এবং মোটরচালিত শ্যাম্পেনের গ্লাসের খোপ।

পেছনের আসনগুলোকে বলা হচ্ছে জিরো-গ্র্যাভিটি, মেঘের মতো আরামদায়ক হেলান দেওয়া আসন। এতে রয়েছে চারটি হেডসহ যান্ত্রিক ঘূর্ণন ম্যাসাজ ব্যবস্থা, ফুটরেস্ট এবং বৈদ্যুতিক প্রাইভেসি শেড। সামনের যাত্রীর আসনটিও একটি বোতাম চাপলেই সম্পূর্ণ সমতল হয়ে ভাঁজ করা যায়। এতে পেছনের ডান পাশের যাত্রী সামনে বাধাহীনভাবে দেখতে পারবেন এবং চাইলে পা লম্বা করে বিশ্রাম নিতে পারবেন।

কেবিনে ব্যবহার করা হয়েছে সেমি-অ্যানিলিন ফুল-গ্রেইন লেদার, প্রাকৃতিক ভেড়ার লোমের মেঝের ম্যাট এবং ৬০টি ফেসেটযুক্ত ডায়মন্ড-কাট ক্রিস্টালের রোটারি কন্ট্রোল নব। বিনোদনের জন্য রয়েছে Dynaudio-র Platinum Evidence সিরিজের ৩৯টি স্পিকারের সাউন্ড সিস্টেম। মনে হচ্ছে, কেবিন ডিজাইনাররা শুধু একটি জিনিসই নকশা থেকে বাতিল করেছিল, “সংযত” শব্দটি।

তবে গাড়ির নিচের প্রযুক্তি Rolls-Royce-এর থেকে একেবারেই আলাদা। Altior-এ ব্যবহার করা হয়েছে BYD-এর e⁴ প্ল্যাটফর্ম এবং চারটি ইলেকট্রিক মোটর। এই ব্যবস্থা উচ্চগতিতে টায়ার ফেটে গেলেও গাড়ির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে। Yangwang-এর অন্য গাড়ি গুলোর মতোই এটি জরুরি অবস্থায় পানিতে ভাসতে পারে, লাট্টুর মতো এক জায়গায় ঘুরতে পারে, আর কাঁকড়ার মতো আড়াআড়িভাবে চলতে পারে।

DiSus সাসপেনশন ব্যবস্থায় রাস্তার সামনের অংশ পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সামনে থাকা অসমান রাস্তা শনাক্ত করে মিলিসেকেন্ডের মধ্যে সাসপেনশন অ‍্যাডজাস্ট করতে পারবে। এতে ঝাঁকুনি শোষণ করার পাশাপাশি সম্ভব হবে গাড়ির সামনে-পেছনে ও দুই পাশের দুলুনি কমানো। ছাদের ওপর বসানো LiDAR সেন্সর BYD-এর পরবর্তী প্রজন্মের God's Eye চালক-সহায়তা ব্যবস্থাকে সহযোগিতা করে। এতে রয়েছে সব ধরনের পরিস্থিতিতে কাজ করতে সক্ষম পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট Navigation on Autopilot (NOA)। শহরের রাস্তা থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত পার্কিংয়ের একটি জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার পুরো যাত্রা সামলানোর জন্য উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে এই ব্যবস্থা।

সেডানটিতে ব্যবহার করা হয়েছে BYD-এর নিজস্ব ৪ ন্যানোমিটারের Xuanji A3 ড্রাইভিং চিপ। আলাদা তিনটি চিপের সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যবস্থার সক্ষমতা ২,১০০ TOPS-এর বেশি। তবে Altior-এ এই সম্পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

শক্তি সরবরাহ করছে দ্বিতীয় প্রজন্মের Blade Battery। BYD-এর দাবি, CLTC পরীক্ষাপদ্ধতিতে গাড়িটি ১,০০০ কিলোমিটারের বেশি চলতে পারবে। WLTP পরীক্ষাপদ্ধতিতে এই রেঞ্জ আনুমানিক ৮০০ থেকে ৮২০ কিলোমিটার হতে পারে। গাড়িটির ১,০০০ ভোল্টের উচ্চ ভোল্টেজ আর্কিটেকচারের মেগাওয়াট ফ্ল্যাশ চার্জিং সমর্থন করে। BYD-এর দাবি, ব্যাটারির চার্জ ১০ থেকে ৭০ শতাংশে তুলতে সময় লাগবে মাত্র পাঁচ মিনিট।

চীনে Altior-এর প্রি-অর্ডার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ লাখ ৮০ হাজার ইউয়ান। এর আনুমানিক মার্কিন মূল্য ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৪০ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা। এই দাম শুধু প্রারম্ভিক Shanhe Dingyun Limited Edition-এর জন্য প্রযোজ্য। বিশেষ সংস্করণটিতে রয়েছে বাদামি ও সোনালি রঙের বিশেষ সংমিশ্রণ এবং বাদামি-সাদা রঙের কেবিন। আগ্রহী ক্রেতাদের ৩ লাখ ইউয়ান জমা দিয়ে বুকিং নিশ্চিত করতে হবে। যা প্রায় ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার বা ৫৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

তুলনার জন্য বলা যায়, BYD-এর সবচেয়ে দামি সাধারণ SUV Da Tang-এর সর্বোচ্চ সংস্করণের দাম ৩ লাখ ৯ হাজার ৯০০ ইউয়ান। এর মার্কিন মূল্য ৪৬ হাজার ৪১৫ ডলার বা ৫৮ লাখ ১ হাজার ৮৭৫ টাকা। অর্থাৎ BYD-এর সবচেয়ে দামি সাধারণ SUV-গুলোর একটির চেয়ে Altior-এর দাম ছয় গুণেরও বেশি। এখানে BYD সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে চাইছে, তা স্পষ্ট।

Yangwang-এর জন্য আবু ধাবি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। স্থানীয় পরিবেশক Al-Futtaim সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্র্যান্ডটির ব্যবসা পরিচালনা করে। সম্প্রতি একই শহরের E11 মহাসড়কের একটি বন্ধ অংশে Yangwang U9 Xtreme ঘণ্টায় ৫০৩.১৭ কিলোমিটার গতি তুলে বিশ্ব রেকর্ড করেছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো গাড়ি ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটারের গতি অতিক্রম করে।

এখানে উল্লেখ্য, এত উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থাকলেও BYD-এর মূলধারার ব্র্যান্ডগুলোর তুলনায় Yangwang এখনও ছোট একটি প্রতিষ্ঠান। China EV DataTracker-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্র্যান্ডটি ৩,২৫১টি গাড়ি বিক্রি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে ৩৮.৯ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বরে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩৭৭টি গাড়ি, যা আগস্টের তুলনায় ১৪.৭ শতাংশ এবং গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৪৬.৯ শতাংশ কম।

বর্তমান Yangwang লাইনআপে U7 ইলেকট্রিক সেডান, U8 ও U8L SUV এবং U9 ইলেকট্রিক সুপারকার রয়েছে। এই তালিকায় নতুন সংযোজন Altior। তবে নতুন লিমুজিনটির গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ কবে শুরু হবে, তা BYD এখনও জানায়নি।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়: এই গাড়িটি আসলে কাদের জন্য? এর দাম Rolls-Royce-এর চেয়ে কম নয়। বিলাসিতায় এটি Rolls-Royce-কে পাল্লা দেয়, আর প্রযুক্তির দিক দিয়ে সম্ভবত এগিয়ে। কিন্তু এই শ্রেণির ক্রেতারা চোখ ধাঁধানো প্রযুক্তি পছন্দ করেন না। অথচ Altior অন্যতম আকর্ষণই হলো এই স্ক্রিনের সমাহার।

Rolls-Royce তাদের বৈদ্যুতিক Spectre-কে কুপে হিসেবে তৈরি করেছিল ড্রাইভিংপ্রেমী তরুণ ক্রেতাদের আকর্ষণের জন্য। বিপরীতে, Altior তৈরি করা হয়েছে চড়ে বেড়ানোর আয়েশি অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে। চীনের যেসব ধনকুবের Rolls-Royce-এর একটি স্থানীয় বিকল্প খুঁজছেন, সেই গণ্ডির বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারে এই গাড়িটি কতটুকু ক্রেতা টানতে পারবে, তা এখনও দেখার বিষয়।

তবে বাংলাদেশের বাজারে Altior এক অনন্য সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশাল V12 ইঞ্জিনের উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে Rolls-Royce-এর সেডানগুলো এ দেশে সাধারণত আসে না। কিন্তু গত কয়েক বছরে সনাতন ইঞ্জিন না থাকার কর-সুবিধা নিয়ে দেশে বেশ কিছু বৈদ্যুতিক Spectre আমদানি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইঞ্জিনবিহীন Altior অনায়াসেই হয়ে উঠতে পারে Rolls-Royce Ghost-এর একটি আদর্শ শুল্ক-বান্ধব বিকল্প।

অবশ্য ব্র্যান্ড পরিচিতি ও আভিজাত্যে Altior এখনো Rolls-Royce-এর সমকক্ষ নয়। Rolls-Royce ব্যাজের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের রাজকীয় ইতিহাস, যা সোনা, চামড়া কিংবা প্রযুক্তির সমাহার দিয়ে রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। তারপরও, প্রচলিত Rolls-Royce আমদানির চেয়ে অনেক কম খরচে এই চীনা বৈদ্যুতিক লিমুজিনের মালিক হওয়ার ধারণাটি বাংলাদেশের ক্রেতাদের কতটুকু আকৃষ্ট করতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে।

Next
Next

Kia: হারিয়ে যাচ্ছে ড্রাইভিংয়ের আনন্দ