৫০৩ কিলোমিটার গতি তুলল BYD!

ছবিঃ Yangwang

নিজেদের বৈদ্যুতিক সুপারকারের ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরপরই আবারও খবরের শিরোনামে BYD। তবে এবার কারণটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের ৩,০০০ হর্সপাওয়ারের Yangwang U9 Xtreme ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটারের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছেছে ৫০৩.১৭ কিমি/ঘণ্টা (৩১২.৬৫ mph) গতিতে। এটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত গাড়ির সর্বোচ্চ গতির নতুন রেকর্ড।

রেকর্ডটি তৈরি হয় ১ নভেম্বর, আবু ধাবির Al Dhafra অঞ্চলে Sheikh Khalifa Bin Zayed International Road (E11)-এ। গাড়িটির স্টিয়ারিংয়ে ছিলেন জার্মান রেসিং ড্রাইভার Marc Basseng। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানির ATP Papenburg পরীক্ষাকেন্দ্রে একই গাড়ি চালিয়ে তিনি ৪৯৬.২২ কিমি/ঘণ্টা (৩০৮.৩৪ mph) গতি তুলেছিলেন। এবারের অর্জনটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে Fédération Internationale de l'Automobile (FIA)।

একই সঙ্গে দুটি Guinness World Records-ও অর্জন করেছে U9 Xtreme: একমুখী দৌড়ে উৎপাদনাধীন গাড়ির সর্বোচ্চ গতি এবং একমুখী দৌড়ে উৎপাদনাধীন বৈদ্যুতিক গাড়ির সর্বোচ্চ গতি। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ৫০৩.১৭ কিমি/ঘণ্টার গতিটি এসেছে একমুখী দৌড় থেকে, বাতাস ও রাস্তার অবস্থার পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে দুই দিকের গতির গড় থেকে নয়।

এই গতিতে পৌঁছাতে শুধু লম্বা একটি রাস্তা খুঁজে নিয়ে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিলেই চলত না। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ E11-এর ১০ কিলোমিটার অংশ বন্ধ করে দেয়, যার মধ্যে রেকর্ড প্রচেষ্টার জন্য ছিল সাত কিলোমিটারের একটি সোজা রাস্তা। রেকর্ড করার প্রচেষ্টার আগে রাস্তাটি ভালোভাবে পরিষ্কার ও পরীক্ষা করা হয়। রাস্তায় পড়ে থাকা সামান্য তারের টুকরোও টায়ারের ক্ষতি করতে কিংবা অত্যন্ত বেশি গতিতে গাড়ির স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারত।

পুরো প্রচেষ্টাটি চলে দুই দিন ধরে। ৩১ অক্টোবরের দুটি দৌড়ে সর্বোচ্চ গতি উঠেছিল ৪৯০ কিমি/ঘণ্টা (৩০৪.৫ mph)। অর্থাৎ, তখনও দলের সামনে কিছু কাজ বাকি ছিল। প্রকৌশলীরা রাতভর গাড়ির প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্স আরও উন্নত করার কাজ করেন। প্রতিটি দৌড়ের আগে ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক মোটরকে আদর্শ কার্যকর তাপমাত্রায় আনতে প্রস্তুতির পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। পেছনের অ্যাক্সেলে আরও বেশি ডাউনফোর্স তৈরির জন্য বদলানো হয় পেছনের উইং। রাস্তার ছোটখাটো অসমান অংশে সাসপেনশনের রিবাউন্ড ড্যাম্পিং বাড়াতে করা হয় সফটওয়্যার সংশোধন। পাশাপাশি টায়ারের বাতাসের চাপও সূক্ষ্মভাবে সমন্বয় করা হয়।

এরপর ১ নভেম্বর আরও দুটি দৌড় দেওয়া হয়। দ্বিতীয় দৌড়েই আসে রেকর্ড গড়া ৫০৩.১৭ কিমি/ঘণ্টা গতি।

গাড়িটিতে শক্তি জোগায় স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রিত চারটি ইলেকট্রিক মোটর, যার প্রতিটি ৭৪৫ hp শক্তি উৎপাদন করে। সব মিলিয়ে মোট শক্তি ২,৯৭৭ hp, যা সাধারণ Yangwang U9-এর ১,২৮৭ hp শক্তির দ্বিগুণেরও বেশি। এত বেশি গতিতে তৈরি হওয়া চাপ সামলাতে বিশেষ সেমি-স্লিক টায়ার তৈরির জন্য Yangwang, Giti Tire-এর সঙ্গে কাজ করেছে। তীব্র গতিতে ত্বরণ ও ব্রেক করার সময় টায়ার যাতে রিমের ওপর পিছলে না যায়, সে জন্য চাকা ও রিমের সংযোগস্থলেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

U9 Xtreme কেবল সরল পথে ছুটে চলার জন্য তৈরি হয়নি। Nürburgring Nordschleife-এ উৎপাদনাধীন বৈদ্যুতিক গাড়ির ল্যাপ রেকর্ডও গড়েছে এটি। জার্মানির এই সার্কিটটি চক্কর দিতে গাড়িটির সময় লেগেছে ৬ মিনিট ৫৯.১৫৭ সেকেন্ড। ফলে সার্কিটটিতে এটিই এখন দ্রুততম উৎপাদনাধীন EV। ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটারের বেশি গতি তোলার পাশাপাশি মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে ল্যাপ শেষ করার এই দ্বিমুখী কৃতিত্ব রয়েছে এই গাড়ির।

বিশ্বজুড়ে গাড়িটির উৎপাদন সীমাবদ্ধ থাকবে মাত্র ৩০টি ইউনিটে। এরই মধ্যে কয়েকজন ক্রেতা অর্ডারও দিয়েছেন।

U9-এর গতির রেকর্ডের অগ্রগতি হয়েছে বেশ দ্রুত। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সাধারণ U9 ঘণ্টায় ৩০৯ কিমি (১৯২ mph) গতিতে পৌঁছায়। একই বছরের পরবর্তী সময়ে সেটি বাড়িয়ে ৩৯১.৯৪ কিমি/ঘণ্টা (২৪৩.৫ mph) করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে U9 Xtreme পৌঁছায় ৪৭২.৪১ কিমি/ঘণ্টা (২৯৩.৫৪ mph) গতিতে। সেপ্টেম্বরে সেই গতি বেড়ে হয় ৪৯৬.২২ কিমি/ঘণ্টা (৩০৮.৩৪ mph)। এবার সেটি ৫০০ কিমি/ঘণ্টার সীমাও পেরিয়ে গেল।

ফলাফলটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ, তবে সর্বশেষ প্রচেষ্টাটি একমুখী হওয়ায় দুই দিকের গতির গড় দিয়ে তৈরি রেকর্ডের সঙ্গে তুলনা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে FIA-র স্বীকৃতি এই অর্জনকে সহজে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখে না। উৎপাদনাধীন একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি এখন এমন গতিতে পৌঁছেছে, যা একসময় কেবল দখলে ছিল সবচেয়ে চরম পর্যায়ের পেট্রলচালিত হাইপারকারগুলোর।

এটি আরও একটি প্রশ্ন সামনে আনে: নির্গমনবিষয়ক বিধিনিষেধ না থাকলে একটি জ্বালানি ইঞ্জিনচালিত হাইপারকার কত দ্রুত যেতে পারত? ক্রমেই কঠোর হতে থাকা নির্গমনবিধি মেনে চলতে গাড়ি নির্মাতাদের ইঞ্জিনের শক্তি সীমিত এবং উচ্চক্ষমতার পাওয়ারট্রেন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়েছে। কখনো কখনো এর মূল্য দিতে হয়েছে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্সের বিনিময়ে। নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা, শব্দের সীমা কিংবা সড়কে চলাচলের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা না থাকলে একটি পেট্রলচালিত হাইপারকার কতটা গতি তুলতে পারত? হয়তো সেই উত্তর কখনোই জানা হবে না। আপাতত BYD দেখিয়ে দিয়েছে, বৈদ্যুতিক শক্তি কত দূর যেতে পারে।

Previous
Previous

৮৯,১২৫ কোটি টাকা মুনাফা করল Toyota

Next
Next

Gallardo-তে ফিরল V10 ও ম্যানুয়াল