ছবিঃ Kia
আধুনিক গাড়িতে স্ক্রিন, সেন্সর আর নানা রকম ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির অভাব নেই। কিন্তু সত্যিকার অর্থে চালিয়ে আনন্দ পাওয়া যায়, এমন গাড়ি খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। Kia-র প্রকৌশলীদেরও মনে হচ্ছে, গাড়ি নির্মাতারা তাদের কথা ভুলে যাচ্ছে, যারা আসলে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসে চালানোর আনন্দ পেতে চান।
Kia Australia-র প্রধান রাইড ও হ্যান্ডলিং প্রকৌশলী Graeme Gambold মনে করেন, নির্মাতারা প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ায় পিছিয়ে পড়ছেন ড্রাইভিংপ্রেমীরা। carsales ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে Gambold বলেন:
“আমি এটিকে ঠিক হারিয়ে যেতে বসা কোনো শিল্প (dying art form) বলব না। তবে আমি যখন নিজেকে বা আমার প্রজন্মের মানুষের দেখি কিংবা যারা মোটরস্পোর্টস ভালোবাসেন তাদের দিকে তাকাই—তখন মনে হয় এই মুহূর্তে আমরা ভীষণ হতাশ। কারণ গাড়ি নির্মাতারা তাদের মনোযোগ পুরোপুরি অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে আমাদের কথা একদমই ভুলে যাচ্ছে।”
আধুনিক গাড়িতে ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রনিক নিরাপত্তাব্যবস্থারও সমালোচনা করেছেন Gambold। তাঁর মতে, এসব ব্যবস্থা অনেক সময় গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতায় বাধা সৃষ্টি করে। ভালো হ্যান্ডলিং, প্রয়োজনীয় ফিচার এবং চালকের কাজে অহেতুক হস্তক্ষেপ না করার সমন্বয় রয়েছে, এমন গাড়ি খুঁজে পাওয়া এখন বেশ কঠিন।
তিনি বলেন: “আজকাল চমৎকারভাবে চালানো যায় এমন গাড়ি খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। আধুনিক সব ফিচার থাকবে কিন্তু চালকের কাজে বারবার হস্তক্ষেপমূলক নিরাপত্তা প্রযুক্তি (safety intervention) নেই এমন গাড়ি পাওয়া সত্যি দুষ্কর, কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমার এসবের কোনো প্রয়োজন নেই।”
Kia অবশ্য ড্রাইভিংপ্রেমীদের পুরোপুরি ভুলে যায়নি। EV6 GT প্রমাণ করে, প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতগতির পারফরম্যান্স গাড়ি তৈরি করতে পারে। আর এখন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া Stinger ছিল একটি যথার্থ স্পোর্টস সেডান। তবে গাড়ি শিল্পের আরও বেশি সাশ্রয়ী ও চালাতে আনন্দদায়ক গাড়ি তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে বড় স্ক্রিন, ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা নিরাপত্তাপ্রযুক্তি কিংবা আরও বেশি হর্সপাওয়ারের চেয়ে প্রাধান্য দেওয়া হবে গাড়ি চালানোর আনন্দকে।
আকর্ষণীয় কিছু তৈরি করার মতো প্রকৌশলগত অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্সের যোগ্যতা Kia-র আগে থেকেই রয়েছে। একটি যথার্থ রিয়ার-হুইল-ড্রাইভ স্পোর্টস সেডান কিংবা সাশ্রয়ী, হালকা ওজনের হট হ্যাচ তাদের মডেল লাইনআপে দারুণ সংযোজন হতে পারে। অবশ্য এসব গাড়ি হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করার চেয়ে সেগুলো তৈরি করাই বেশি কার্যকর হতো। তবে শেষ সিদ্ধান্ত প্রকৌশলীদের হাতে নয়, কোম্পানির ব্যবস্থাপনার হাতে। আর গাড়িগুলো তৈরি করতে চান প্রকৌশলীরাই।
এখানে নির্গমনবিধির সমস্যাও রয়েছে। কেবল পেট্রল ইঞ্জিননির্ভর প্রচলিত পারফরম্যান্স গাড়ি তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে ও প্রযুক্তিগত, দুই দিক থেকেই ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতের কোনো Kia driver's car-এর জন্য হাইব্রিড কিংবা পুরোপুরি বৈদ্যুতিক পাওয়ারট্রেন হয়তো বেশি বাস্তবসম্মত বিকল্প। এতে অবশ্য নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়: একটি বৈদ্যুতিক driver's car-এ সত্যিকার অর্থে কতটা নিজস্ব চরিত্র থাকতে পারে? ফলে ড্রাইভিংপ্রেমীদের হয়তো আপাতত যা পাওয়া যায়, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
হাইব্রিড গাড়িতে বিদ্যুতায়িতকরণের সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত কিছু বৈশিষ্ট্যও ধরে রাখা সম্ভব। অন্যদিকে, পুরোপুরি বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা দিতে পারে তাৎক্ষণিক টর্ক ও শক্তিশালী পারফরম্যান্স। যেভাবেই হোক, কেবল পেট্রল ইঞ্জিনে চলা তুলনামূলক সাশ্রয়ী পারফরম্যান্স গাড়ির উৎপাদন টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
কঠোর নিরাপত্তাবিধির কারণেও আরও জটিল হয়ে উঠছে আধুনিক গাড়ি। গাড়ি নির্মাতারা চাইলেই সব ড্রাইভার-অ্যাসিস্ট্যান্স ব্যবস্থা বাদ দিতে পারে না। কারণ, এসবের বেশ কয়েকটি এখন নতুন গাড়িতে বাধ্যতামূলক। Intelligent Speed Assistance, Lane-Keeping System এবং Automatic Emergency Braking এখন নতুন গাড়ির নিয়মিত ফিচার। অথচ এক দশক আগেও অনেক গাড়িতে এসবের অস্তিত্ব ছিল না।
Kia এখনো আকর্ষণীয় কিছু আনতে পারে। Vision Meta Turismo কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে ড্রাইভিংপ্রেমীদের জন্য একটি মডেল তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পুরোপুরি বৈদ্যুতিক এই স্পোর্টস সেডানকে Stinger-এর পরোক্ষ উত্তরসূরি হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে SUV-এর বাইরে গিয়ে আরও আবেগ জাগানো কোনো গাড়ি বাজারে আনার সুযোগ পাবে Kia।
Kia-র ডিজাইন বিভাগের প্রধান Karim Habib কনসেপ্টটিকে “গেমার প্রজন্মের” জন্য তৈরি গাড়ি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মানে অবশ্য কী, তা এখনও অজানা। তবে Habib-এর দাবি, উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে গাড়িটির উন্নয়নকাজ কোম্পানির প্রত্যাশার চেয়ে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। Kia বিশেষ পারফরম্যান্সের এই EV বাজারে আনার ব্যাপারে এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও কবে গাড়িটি উন্মোচন বা বাজারে আনা হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।
জানা গেছে, গাড়িটির একটি ফাস্টব্যাক সংস্করণ উৎপাদনের জন্য প্রায় ৯০% প্রস্তুত। কিন্তু আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কোনো মডেলই বাজারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে না। তাই Kia তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, তা জানতে ড্রাইভিংপ্রেমীদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। Stinger-এর একটি প্রকৃত উত্তরসূরি অন্তত Kia কে দেখানোর সুযোগ দেবে যে, ড্রাইভিংপ্রেমীদের জন্য গাড়ি তৈরির আগ্রহ তাদের এখনো নিঃশেষ হয়নি।
অবশ্য এই দুই গাড়ির বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। Kia Bangladesh আসলে কী করছে, তা নিয়ে কারও খুব একটা ধারণা আছে বলে মনে হয় না। তবে মনে হচ্ছে, কোম্পানিটি ড্রাইভিংপ্রেমীদের জন্য তৈরি গাড়ির চেয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য তৈরি গাড়ি বিক্রি করেই বেশ সন্তুষ্ট।
আধুনিক গাড়িতে স্ক্রিন, সেন্সর আর নানা রকম ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির অভাব নেই। কিন্তু সত্যিকার অর্থে চালিয়ে আনন্দ পাওয়া যায়, এমন গাড়ি খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। Kia-র প্রকৌশলীদেরও মনে হচ্ছে, গাড়ি নির্মাতারা তাদের কথা ভুলে যাচ্ছে, যারা আসলে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসে চালানোর আনন্দ পেতে চান।