৩৫% সাশ্রয়ে গাড়ি তৈরি করছে চীন
ছবিঃ BYD
চীনা গাড়ি নির্মাতারা ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক কম খরচে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করছে। কিন্তু এই ব্যবধানের কারণ শুধু সরকারি ভর্তুকি নয়।
বিশ্বের বাজারে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে চীনা গাড়ি। কেন, তা বুঝতে খুব বেশি কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তুলনামূলক কম দামে প্রচুর ফিচার, আধুনিক প্রযুক্তি এবং ভালো পারফরম্যান্স দিচ্ছে এসব গাড়ি। ফলে এই গাড়িগুলোর সঙ্গে তাল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা। আঙ্গুল তুলছে চীনের কম মজুরি এবং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির দিকে। কিন্তু নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চীনের এই দাপটের পেছনে শুধু সস্তা শ্রম কিংবা সরকারি ভর্তুকি নয়, আরও বড় কিছু কারণ রয়েছে।
আর্থিক পরামর্শ ও বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান AlixPartners-এর তথ্য অনুযায়ী, সমমানের ইউরোপীয় মডেলের তুলনায় চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করতে প্রায় ৩৫ শতাংশ কম খরচ হয়। বিষয়টি নিয়ে ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, “চীনে তৈরি একটি চীনা ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার মার্কিন ডলার (২৫ লাখ টাকা), যেখানে সমমানের একটি ইউরোপীয় গাড়ি তৈরি করতে খরচ হয় ৩১ হাজার মার্কিন ডলার (৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা)।” অর্থাৎ শোরুমে পৌঁছানোর আগেই দুই গাড়ির উৎপাদন খরচের পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ১১ হাজার মার্কিন ডলার বা ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
ছবিঃ BYD
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় নির্মাতারা অভিযোগ করে আসছে, রাষ্ট্রীয় সহায়তা, ভর্তুকি এবং সরকারি নীতির কারণে চীনা ব্র্যান্ডগুলো বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কম দামে গাড়ি বিক্রি করতে পারে। এসব দাবিতে কিছুটা সত্যতা আছে। কিন্তু AlixPartners-এর মতে, উৎপাদন খরচের ব্যবধানের পুরোটা শুধু এসব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। চীন এমন একটি উৎপাদনব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে কম খরচে বৈদ্যুতিক গাড়ির নকশা ও উৎপাদন করা সম্ভব।
ব্যাটারি উৎপাদন একটি বড় ক্ষেত্র, যেখানে ইউরোপ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। ইউরোপীয় নির্মাতারা কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণের জন্য বহুলাংশে বাইরের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। এই পদ্ধতিতে অতিরিক্ত খরচ এবং সংকটের মুখে সরবরাহ ব্যাহত হবার অধিক ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে ইউরোপে ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য নিজস্ব কাঁচামালের সবচেয়ে বড় উৎস হলো ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং। কিন্তু প্রয়োজনীয় মাত্রায় উৎপাদন চালানোর জন্য এই খাতের সক্ষমতা এখনও যথেষ্ট নয়।
জ্বালানির দামও আরেকটি বড় সমস্যা। ইউরোপে বিদ্যুতের দাম যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে বেশি বিদ্যুৎনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা পরিচালনা করাও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
AlixPartners-এর পরামর্শ হলো, ব্যাটারি উৎপাদন কারখানা স্থাপন ও পরিচালনায় নির্মাতাদের উৎসাহিত করতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া উচিত। পাশাপাশি কারখানাগুলো চালু থাকা অবস্থায় বিদ্যুতের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
এতে উৎপাদন খরচের ব্যবধান কিছুটা কমতে পারে। তবে শুধু টাকা ঢাললেই ইউরোপের সমস্যার সমাধান হবে না। চীনের আরও একটি সুবিধা রয়েছে, যা টাকা খরচ করে কেনা যায় না। সেটি হলো গতি।
ছবিঃ Geely
‘China Speed’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, কম সময়ে গাড়ি তৈরি করা এবং প্রচলিত গাড়ি নির্মাতাদের তুলনায় ব্যবস্থাপনার স্তর কম রাখা। প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের জন্য নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন বিভাগ ও সভার দীর্ঘ প্রক্রিয়া পেরোতে হয় না। ফলে কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান খুব দ্রুত একটি ধারণা থেকে উৎপাদনের উপযোগী গাড়ি তৈরি করে ফেলতে পারে।
ডিজিটাল পরীক্ষাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নির্মাতারা ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে গাড়ির নকশা ও বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা করেন। সকল ডিজাইনের বাস্তব গাড়ি দিয়ে পরীক্ষা হয় একেবারে শেষে। এই পদ্ধতি চীনা নির্মাতাদের সফটওয়্যারনির্ভর গাড়ি, নতুন প্ল্যাটফর্ম ও কেবিনের ফিচার দ্রুত তৈরি করতে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে তারা দ্রুত যোগ করতে পারছে নতুন প্রযুক্তি।
ফলে পুরোনো নির্মাতাদের জন্য তাল মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রচলিত নির্মাতাদের একটি নতুন মডেল তৈরি করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। অথচ চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাদের গাড়ি বাজারে নিয়ে আসে তার অর্ধেক সময়ে। ব্যাটারি প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও ক্রেতাদের প্রত্যাশা যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন দেরিতে বাজারে আসা বিষয়টি ভুল পণ্য নিয়ে আসার মতোই ক্ষতিকর হতে পারে।
তবে দ্রুত কাজ করার ঝুঁকিও আছে। কম্পিউটার সিমুলেশনে ঠিকঠাক কাজ করা সফটওয়্যার বাস্তব রাস্তায় ভিন্ন আচরণ করতে পারে।
এর একটি উদাহরণ Lynk & Co-এর একটি গাড়ির সফটওয়্যার ত্রুটি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়ি চলার সময় ভয়েস কমান্ড ব্যবহার করে এর লাইট বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব। Lynk & Co Z20-কে ঘিরে একটি দুর্ঘটনার ভিডিও চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর অন্য বৈদ্যুতিক গাড়ি চালকেরাও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। পরে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়িতেও একই সমস্যার কথা জানান মালিকেরা।
ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, দ্রুত উন্নয়ন মানেই ভালো প্রকৌশল নয়। গাড়ির বেশিরভাগ কার্যক্রম যখন সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, তখন কোডের সামান্য ভুলও গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। China Speed নির্মাতাদের দ্রুত নতুন প্রযুক্তি বাজারে আনতে সাহায্য করছে ঠিকই, তবে যথাযথ পরীক্ষার অভাব বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ছবিঃ Xpeng
তারপরও AlixPartners সতর্ক করেছে, শুল্ক আরোপ করলেই চীনের মৌলিক সুবিধাগুলো দূর হবে না। আমদানি শুল্ক ইউরোপীয় নির্মাতাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কিছুটা অতিরিক্ত সময় দিতে পারে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান এখনও বেশি খরচে এবং ধীরগতিতে নতুন গাড়ি তৈরি করছে, তাদের অনির্দিষ্টকাল সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।
চীনা ইলেকট্রিক গাড়ি ইউরোপে তৈরি করলে উৎপাদন খরচের কিছু সুবিধা কমে যাবে। কারণ, সে ক্ষেত্রে নির্মাতারা চীনের প্রতিষ্ঠিত অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থার কিছু অংশের সুবিধা হারাবেন। তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, সহজ ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং দক্ষ উন্নয়নপ্রক্রিয়ার সুবিধাগুলো থেকেই যাবে।
ইউরোপীয় নির্মাতাদের সামনে তাই কঠিন কাজ অপেক্ষা করছে। নিরাপত্তা ও গুণমানের সঙ্গে আপস না করে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে, সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করতে হবে এবং গাড়ি তৈরির পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু সরকারকে বলে চীনা গাড়ির দাম বাড়িয়ে দিলে ইউরোপীয় গাড়ির উৎপাদন খরচ কমে যাবে না।
ছবিঃ BYD
চীনের ইলেকট্রিক গাড়ির সাফল্য কেবল সরকারি সহায়তার ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে উৎপাদন, ব্যাটারি, সরবরাহব্যবস্থা এবং উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর ধরে করা বিনিয়োগ। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সম্পদ আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারছে। ভর্তুকি কোনো শিল্পের বিকাশে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সেই বিনিয়োগকে প্রতিযোগিতামূলক পণ্যে রূপান্তর করার ক্ষমতাই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করে।
ইউরোপসহ বিশ্বের বাকি গাড়ি শিল্পের জন্য বার্তাটি অস্বস্তিকর হলেও স্পষ্ট। চীনা নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে কম খরচে গাড়ি তৈরি করা শিখতে হবে, উন্নয়নের গতি বাড়াতে হবে এবং ক্রেতাদের আরও ভালো মূল্য দিতে হবে। শুল্ক কিছুটা সময় কিনে দিতে পারে, কিন্তু সেই সময় তখনই কাজে আসবে, যদি নির্মাতারা তা কাজে লাগাতে পারে।
Toyota চায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) যেন কিছু পেট্রোলচালিত গাড়িকে শূন্য নিঃসরণকারী (Zero Emission) যান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সমস্যা হলো, এসব গাড়ির এক্সহস্ট দিয়ে ঠিকই কার্বন নির্গত হবে।