ছবিঃ Geely
চীনের গাড়ি হয়তো বিশ্ববাজার দখল করে নিচ্ছে, কিন্তু নিজেদের দেশে মুনাফা অর্জন করতে সংগ্রাম করছে চিনা গাড়ি নির্মাতারা।
Geely-এর সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, কেন চীনা ব্র্যান্ডগুলো আগ্রাসীভাবে বিদেশে বাজারে সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। চীনের এই গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি ২৯ অক্টোবর ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করেছে। এ সময়ে তাদের আয় হয়েছে ৯৯ বিলিয়ন ইউয়ান (১৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা)। মূল কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রযোজ্য মূল নিট মুনাফা ছিল ৫.২১ বিলিয়ন ইউয়ান (৭৭৭.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা)।
প্রথম দেখায় সংখ্যাগুলো বেশ চমকপ্রদ। তবে একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসা চালানো কতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
প্রান্তিকটিতে রপ্তানিসহ মোট ৮১২,৫০০টি গাড়ি বিক্রি করেছে Geely। রপ্তানি করা গাড়ির সংখ্যা ছিল ৩৪৩,৭০০টি ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট বিক্রির প্রায় ৩৯.৮ শতাংশ এসেছে রপ্তানি থেকে।
প্রতিষ্ঠানটি তাদের বার্ষিক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রাও ৬৪০,০০০ থেকে বাড়িয়ে ৯২০,০০০ গাড়িতে উন্নীত করেছে। মুনাফার উৎস বিবেচনা করলে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণ বোঝা কঠিন নয়। CNstock-এর তথ্য অনুযায়ী, এই প্রান্তিকে রপ্তানি থেকে ৪.৮৪ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৭২২.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৯ হাজার ৩০ কোটি টাকা) নিট মুনাফা করেছে Geely। যা প্রতিষ্ঠানটির মূল নিট মুনাফার প্রায় ৯২.৯ শতাংশ।
Geely-এর মোট বিক্রির ৬০ শতাংশের বেশি এসেছে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে। অথচ মোট মুনাফায় এই বাজারের অবদান মাত্র ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের বাজারে প্রচুর গাড়ি বিক্রি করলেও তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে Geely-এর হাতে থাকছে খুব সামান্য অর্থ।
বদলে যাচ্ছে রপ্তানি ব্যবসার চিত্রও। ২০২৬ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে Geely বিদেশের বাজারে ৪৮৪,০০০টি New Energy Vehicle (NEV) সরবরাহ করেছে। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৩১ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, ২৯ অক্টোবর নিজেদের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করেছে BYD। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয়েছে ২২১.৪৯ বিলিয়ন ইউয়ান (৩৩.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ১৩ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা), যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.৫৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে নিট মুনাফা ২৮.০৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০.০২ বিলিয়ন ইউয়ানে (১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা)।
তবে Geely-এর মতো BYD তাদের মুনাফার কতটা সরাসরি রপ্তানি থেকে এসেছে, তা প্রকাশ করেনি। প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিদেশের বাজারে বিক্রির কথা উল্লেখ করেছে। শুধু সেপ্টেম্বরেই BYD ১৮০,৭০০টির বেশি NEV রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ১৫৩.৬ শতাংশ বেশি।
ছবিঃ BYD
এতেই বোঝা যায়, কেন চীনের গাড়ি নির্মাতারা দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দেশের বাজার থেকে মোট বিক্রির সিংহভাগ এলেও মুনাফায় অবদান থাকে সামান্য, তাই রপ্তানি হয়ে উঠেছে বেশ আকর্ষণীয় বিকল্প।
অবশ্য এই পরিস্থিতি অনির্দিষ্টকাল চলবে না। লাগামহীন মূল্যছাড় আর আগ্রাসী সম্প্রসারণের লড়াইয়ে ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে সিংহভাগ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। দ্রুত বেড়ে ওঠা অধিকাংশ শিল্পের মতো এখানেও একীভূতকরণ অনিবার্য। এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে হাতে গোনা কিছু ব্র্যান্ড।
বলা বাহুল্য, ইতোমধ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের জন্য এটি কোন স্বস্তির খবর নয়। তাদের বাজারে ইতিমধ্যেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চীনের তৈরি গাড়ি। অন্যদিকে নিজেদের বাজারে চীনা গাড়ির প্রবেশ ঠেকাতে একের পর এক আইনি বিধিনিষেধ তৈরি করছে যুক্তরাজ্য।
চীনা ব্র্যান্ডগুলো এখন মুনাফা লাভের জন্য পঙ্গপালের মত নতুন বাজার খুঁজছে। টিকে থাকার এই লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনুমতি নেওয়ার বিশেষ আগ্রহ তাদের আছে বলে মনে হচ্ছে না।
প্রায় তিন দশক ধরে চীনের বাজারে জাপানে তৈরি গাড়ি বিক্রি করে আসছে Lexus। এবার সেই ব্যবসায়িক কৌশলে আসতে যাচ্ছে বড় পরিবর্তন।