চীনে গাড়ি তৈরি করবে Lexus

ছবিঃ Lexus

প্রায় তিন দশক ধরে চীনের বাজারে জাপানে তৈরি গাড়ি বিক্রি করে আসছে Lexus। এবার সেই ব্যবসায়িক কৌশলে আসতে যাচ্ছে বড় পরিবর্তন।

আর সেই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে বেশ বড় অঙ্কের বিনিয়োগ।

Autohome-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনে কারখানায় গাড়ি তৈরির প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে Toyota-র বিলাসবহুল ব্র্যান্ডটি। Lexus-এর চীনে উৎপাদিত প্রথম গাড়িটি হবে একটি ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক SUV। গাড়িটি তৈরি হবে সাংহাইয়ের Jinshan District-এ Toyota-র মালিকানাধীন নতুন এক কারখানায়।

তবে Lexus এখনও গাড়িটির নাম, দাম, ব্যাটারির ধারণক্ষমতা, মোটরের স্পেসিফিকেশন কিংবা রেঞ্জ সম্পর্কে কিছু জানায়নি। আপাতত গাড়িটিতে Lexus-এর ব্যাজ থাকবে, শুধু এটুকু জানা গেছে।

গাড়িটির ব্যাটারি নিয়েও রয়েছে রহস্য। Toyota এবং Idemitsu Kosan সালফাইড-ভিত্তিক সলিড-স্টেট ব্যাটারি তৈরিতে কাজ করছে। Toyota-র লক্ষ্য, ২০২৭ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়িতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করা। তবে বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু হবে আরও পরে। তাই এই সময়সীমার সঙ্গে নতুন Lexus SUV-টির সলিড-স্টেট ব্যাটারি ব্যবহারের কোনো নিশ্চয়তা নেই।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম মডেলটিতে সলিড-স্টেট ব্যাটারির পরিবর্তে প্রিজম্যাটিক টারনারি লিথিয়াম অথবা লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (LFP) সেল ব্যবহার করা হতে পারে। তবে ব্যাটারির ধরন, সরবরাহকারী কিংবা ধারণক্ষমতা—কোনোটিই Lexus নিশ্চিত করেনি।

ছবিঃ Lexus TZ

নতুন কারখানাটিতে বেশ কিছু নতুন উচ্চাভিলাষী উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যালুমিনিয়াম গিগাকাস্টিং, যার মাধ্যমে একাধিক ছোট যন্ত্রাংশকে একটি বড় কাঠামোতে একত্র করে গাড়ির সামনের ও পেছনের অংশ তৈরি করা হবে। এতে কমে আসবে যন্ত্রাংশের সংখ্যা এবং সংযোজনের ধাপ। কারখানাটিতে প্রচলিত কনভেয়ার বেল্টের পরিবর্তে ব্যবহার করা হবে বিশেষ অ্যাসেম্বলি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে গাড়িগুলো নিজে থেকেই এক কর্মস্থল থেকে অন্য কর্মস্থলে চলাচল করতে পারবে।

প্রাথমিকভাবে প্রতি মাসে প্রায় ১,০০০টি গাড়ি, অর্থাৎ বছরে প্রায় ১২,০০০টি গাড়ি উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই সংখ্যা কারখানাটির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা নয়। Toyota এখনও চূড়ান্ত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কিংবা উৎপাদন বাড়ানোর সময়সূচি ঘোষণা করেনি।

২০২৫ সালে কারখানাটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। এটি সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। ফলে Toyota চীনে তাদের বিদ্যমান দুটি যৌথ উদ্যোগের বাইরে স্বাধীনভাবে Lexus গাড়ি তৈরি করতে পারবে।

এই সিদ্ধান্ত চীনে Toyota-র ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব পুনর্গঠনের অংশ। ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর চীনা গাড়ি নির্মাতা GAC, আরেক চীনা গাড়ি নির্মাতা China FAW-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান FAW Co., Ltd.-এর মালিকানাধীন FAW Toyota-র শেয়ার কেনার প্রস্তাব দেয়। দুটি প্রতিষ্ঠানের সাথে Toyota-র যৌথ উদ্যোগের চুক্তি আছে। এরপর ৮ অক্টোবর FAW, GAC এবং Toyota গবেষণা ও উন্নয়ন, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ এবং উৎপাদনে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার জন্য একটি কৌশলগত জোটের কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষর করে।

ছবিঃ Lexus TZ

তবে প্রস্তাবিত এই লেনদেন এখনও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে FAW Toyota আগের মতোই একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। অন্যদিকে, FAW হবে GAC-এর কৌশলগত শেয়ারহোল্ডার হবে।

চীনে Toyota-র বিদ্যমান যৌথ উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠানটি। FAW Toyota bZ3-তে ব্যবহার করা হয়েছে BYD-এর ব্যাটারি প্রযুক্তি। অন্যদিকে, GAC Toyota bZ3X-এ রয়েছে Momenta-র সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ইন্টেলিজেন্ট ড্রাইভিং অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেম।

স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনে Toyota-র আগ্রহের পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। চীনে কমছে Lexus-এর বিক্রি। ২০২১ সালে প্রায় ২ লাখ ২৭ হাজার গাড়ি বিক্রির সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছিল ব্র্যান্ডটি। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৪৫৮ ইউনিটে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ES সেডান সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ৫৭ হাজার ৮০০টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম। পরিস্থিতি সামলাতে কিছু ডিলারশিপ ৫০ হাজার ইউয়ানেরও বেশি নগদ ছাড় দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এই ছাড়ের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার মার্কিন ডলার বা ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

স্থানীয়ভাবে গাড়ি তৈরি করলে Nio এবং Zeekr-এর মতো চীনা প্রিমিয়াম EV ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা Lexus-এর জন্য সহজ হতে পারে। পাশাপাশি এড়ানো যাবে আমদানি করা যাত্রীবাহী গাড়ির ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক। এতে গাড়ির দাম নির্ধারণেও আরও স্বাধীনতা পাবে প্রতিষ্ঠানটি।

ছবিঃ Denza

আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় চীনে Lexus-এর বিক্রয় কৌশল কিছুটা ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ার বাজারে ব্র্যান্ডটির ৯০ শতাংশ চাহিদাই হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির। কিন্তু চীনের বাজারে হিসাবটা আলাদা।

China Passenger Car Association-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির মোট যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রির প্রায় ৫৪ শতাংশই ছিল New Energy Vehicle (NEV)। এমন বাজারে Lexus অনির্দিষ্টকাল ধরে শুধু হাইব্রিডনির্ভর কৌশলে চলতে পারবে না।

তাই অবশেষে চীনে Lexus তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে Toyota। তবে চীনা ক্রেতারা যে Lexus সত‍্যিই কিনতে চাইবেন, এমন একটি গাড়ি তৈরি করতে পারবে কি না, সেটিই এখন বেশি আগ্রহের বিষয়।

Previous
Previous

ফিরে এল Ferrari 308-এর র‍্যালি স্পিরিট

Next
Next

ধুঁকছে বাংলাদেশের গাড়ির বাজার