চীনের রিকন্ডিশন গাড়ি কিনছে ইউরোপ
ছবিঃ China EV Marketplace (CEVM)
ব্যবহৃত জাপানি গাড়ি আমদানির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের গাড়ির বাজার। ইউরোপেও এখন একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে জ্বালানী চালিত গাড়ি কিনছেন না তারা, তাঁদের নজর চীনের ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে।
নতুন গাড়ির আমদানিতে শুল্ক বাড়ায় ব্যবহৃত চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ীর (EV) চাহিদা বাড়ছে ইউরোপে। China EV Marketplace (CEVM)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ক্রেতাদের কাছে ব্যবহৃত গাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮০ শতাংশ বেড়ে ৭,৯০০ ইউনিটে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে নতুন গাড়ির বিক্রি কমেছে ৪৪ শতাংশ।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালে EU-এর নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত। সে বছর চীন থেকে আমদানি করা ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক গাড়ির (BEV) ওপর সর্বোচ্চ ৪৫.৩ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে EU। ফলে এই অতিরিক্ত শুল্ক এড়াতে চীনা গাড়ি কিনতে আগ্রহী অনেক ক্রেতা নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড এবং ব্যবহৃত EV-এর দিকে ঝুঁকেছেন।
ছবিঃ ইমরান আবিদ
কিন্তু কিছুদিন আগে চীন থেকে আমদানি করা হাইব্রিড গাড়ির ওপর EU বছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার ইউনিটের নতুন সীমা আরোপ করায় নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিডের বিক্রিতেও চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে ব্যবহৃত গাড়ি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
China EV Marketplace-এর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা Jakub Geršl বলেন, “শুল্ক ইতিমধ্যে আমাদের ইউরোপীয় গ্রাহকদের মধ্যে নতুন চীনা BEV-এর চাহিদায় ভাটা তৈরি করেছে। আমরা ধারনা করছি, হাইব্রিড আমদানির সীমা নতুন PHEV-এর বিক্রিতেও চাপ সৃষ্টি করবে।”
Geršl আরও বলেন, “ব্যবহৃত গাড়ির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত BEV শুল্ক এবং নতুন হাইব্রিড (PHEV) আমদানি কোটা প্রযোজ্য নয়। এ কারণেই আমরা ইউরোপে আমাদের ব্যবসার মূল মনোযোগ ব্যবহৃত গাড়ির দিকে সরিয়ে নিচ্ছি।”
CEVM-এর ওয়েবসাইটে বর্তমানে ২,৬০০টিরও বেশি ব্যবহৃত EV-এর তালিকা রয়েছে, যা প্রতিদিন হালনাগাদ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে Xiaomi, BYD, iCar, Denza, Lynk&Co এবং Avatr-এর বিভিন্ন মডেল। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এসব গাড়ির নির্মাতা কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে।
ছবিঃ Geely
Geršl বলেন, “নতুন গাড়ির দাম কমে গেলে ব্যবহৃত গাড়ির দামেও প্রভাব পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সাংহাইভিত্তিক দল এসব সুযোগ খুঁজে বের করে। আমরা নিয়মিত এমন গাড়ি খুঁজে পাই, যেগুলো মাত্র ৬,০০০ কিলোমিটার চালানো হয়েছে, অথচ চীনে গাড়িগুলোর মূল তালিকামূল্যের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম দামে বিক্রি হচ্ছে।”
দামের এমন পতনের কারণে প্রায় নতুন অবস্থায় থাকা চীনা ব্যাবহৃত EV ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে চীনের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক গাড়ির বাজারে কত দ্রুত দাম কমে, সেটিও উল্লেখ্য। China Automobile Dealers Association (CADA) এবং Jingzhengu-এর তথ্য অনুযায়ী, কিছু মডেল মাত্র তিন বছরের মধ্যে তাদের ক্রয় মূল্যের ৪০ শতাংশেরও বেশী অর্থিক মান হারায়।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান দাবি করে, জনপ্রিয় ইলেকট্রিক গাড়িও বড় ধরনের মূল্যহ্রাসের শিকার হতে পারে। পর্যবেক্ষণ করা ১৫টি ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক মডেলের মধ্যে তিন বছর পর সবচেয়ে বেশি মূল্য ধরে রেখেছে Tesla Model 3—মূল দামের ৬১.৪ শতাংশ। এরপর রয়েছে Tesla Model X, যার অবশিষ্ট মূল্য ৫৯.৫ শতাংশ। Tesla Model Y ধরে রেখেছে মূল দামের ৫৩.৯ শতাংশ।
BYD Seagull তিন বছর পর মূল দামের ৫০.৫ শতাংশ ধরে রেখেছে। এরপর রয়েছে Zeekr 009, যার অবশিষ্ট মূল্য ৪৯.৯ শতাংশ, এবং Baojun Yep, যার অবশিষ্ট মূল্য ৪৯ শতাংশ। Porsche Taycan ধরে রেখেছে ৪৮.৫ শতাংশ, আর Nio ET5-এর অবশিষ্ট মূল্য ৪৭.৮ শতাংশ।
ছবিঃ Leapmotor
Roewe iMAX8 EV-এর অবশিষ্ট মূল্য ৪৭.৫ শতাংশ, Denza D9 EV-এর ৪৭.১ শতাংশ এবং Avatr 12-এর ৪৭ শতাংশ। Nio ES6 ধরে রেখেছে ৪৬.৭ শতাংশ, Leapmotor C11 BEV ৪৬.৫ শতাংশ, Xpeng G6 ৪৬.৪ শতাংশ এবং Wuling Bingo ৪৬.১ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র তিন বছরে Wuling Bingo তার মূল্যের ৫৩.৯ শতাংশ হারিয়েছে। এখানে অবশিষ্ট মূল্য বলতে তিন বছর পর গাড়িটির মূল দামের যে অংশ টিকে থাকে, তা বোঝানো হয়েছে। মূল দাম থেকে যত শতাংশ মূল্য কমেছে, মূল্য বিচ্যুতির পরিমাণ।
ইউরোপে চীনা EV কেনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করারও চেষ্টা করছে CEVM। প্রতিষ্ঠানটি চেক প্রজাতন্ত্রের Prague-এ একটি ডেলিভারি সেন্টার চালুর ঘোষণা দিয়েছে। শুরুতে সেখানে ২০টি ইলেকট্রিক গাড়ি মজুত থাকবে। ফলে চীন থেকে সরাসরি গাড়ি আমদানির জন্য প্রায় তিন মাস অপেক্ষা না করে ক্রেতারা তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি সংগ্রহ করতে পারবেন।
এখানে একটি অস্বস্তিকর পরিহাস রয়েছে। ইউরোপ বিশ্বের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে ঐতিয্যবাহী গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আবাসভূমি। অথচ সেই ইউরোপেরই কিছু ক্রেতা স্থানীয় শোরুমে যাওয়ার আগে ব্যবহৃত চীনা EV কিনতে আগ্রহী। কারণটা সহজ: চীনা গাড়িগুলোতে প্রায়ই অর্ধেক কম দামে অনেক বেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পাওয়া যায়।
ছবিঃ BYD
ইউরোপীয় নির্মাতাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শুল্ক আরোপ করে চীনা গাড়ির দাম বাড়ানো সম্ভব, কিন্তু দামের ব্যবধান, সরঞ্জামের পার্থক্য কিংবা উন্নয়নের গতিতে পিছিয়ে থাকার সমস্যা শুধু শুল্ক দিয়ে সমাধান করা যাবে না। ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হলে নিজেদের বাজারেই অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
একসময় ব্রিটেনের বিশাল গাড়ি শিল্প ছিল। দীর্ঘদিনের অবনতি ও নানা অস্থিরতার পর সেই শিল্পের বড় অংশ বিদেশি মালিকানায় চলে যায়। ইউরোপের গাড়িশিল্পের পরবর্তী অধ্যায়েও মালিকানায় এমন পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে এবার নতুন মালিকদের ভাষা জার্মান নয়, চীনা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা যখন চীনা গাড়ির প্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন চীনের গাড়ি নির্মাতারা দেশটিতে ঢোকার বিকল্প পথ খুঁজছে।