আমেরিকায় ঢুকতে চায় চীনের Chery
ছবিঃ Chery
যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা যখন চীনা গাড়ির প্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন চীনের গাড়ি নির্মাতারা দেশটিতে ঢোকার বিকল্প পথ খুঁজছে।
আর চীনের ব্র্যান্ড Chery-র সেই পথ হতে পারে আমেরিকান গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে হাত মেলানো।
ইউরোপে বিক্রি হওয়া প্রতি ১০টি গাড়ির প্রায় একটিই এখন চীনা ব্র্যান্ডের। এবার ইউরোপের বাইরেও নিজেদের বাজার বাড়াতে চাইছে চীনের গাড়ি নির্মাতারা। নিজস্ব ব্র্যান্ডের পাশাপাশি Omoda ও Jaecoo ব্র্যান্ডের অধীনে গাড়ি বিক্রি করা Chery ২০২৭ সালের শুরুতে কানাডার বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী Mark Carney-এর সরকারের অধীনে এই বছরের জানুয়ারিতে হওয়া একটি বাণিজ্য চুক্তির ফলে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের জন্য কানাডার বাজারে প্রবেশের পথ খুলেছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি আলাদা। চীন থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক এবং চীনা সফটওয়্যারের ওপর বিধিনিষেধের কারণে সরাসরি দেশটিতে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। Geely-এর মালিকানাধীন Polestar-কে ইতিমধ্যেই ২০২৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এসকল বিধিনিষেধের বিকল্প পথ খুঁজছে বলে জানিয়েছেন Chery-র ভাইস প্রেসিডেন্ট Charlie Zhang। Reuters-কে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, অবশ্যই আমরা সেখানে বিভিন্ন বিকল্প খুঁজে দেখার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বিভিন্ন বিকল্পের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী, এমনকি আমেরিকান গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে সম্ভাব্য অংশীদারত্বের বিষয়টিও বিবেচনা করছি।”
Zhang আরও বলেন, “প্রযুক্তিগত দিক থেকে অবশ্যই আমরা হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে চীননির্ভর নয়, এমন একটি সমাধান খুঁজে বের করতে পারব।”
কোনো আমেরিকান গাড়ি নির্মাতার সঙ্গে অংশীদারত্ব Chery-কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে পারে। একই সঙ্গে সহজ হয়ে যেতে পারে স্থানীয় গাড়ি আমদানি ও সফটওয়্যারসংক্রান্ত নিয়মকানুন মেনে চলাও। প্রতিষ্ঠানটি তাদের গাড়ি Ford কিংবা General Motors-এর আমেরিকান কারখানায় তৈরি করতে পারে। তবে এমন চুক্তি রাজনৈতিক ও শিল্পখাতের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।
Chery-এর এই কৌশলী পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে যৌক্তিক কারণ। যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রতিষ্ঠানটির Jaecoo 7 মডেলটি দেখতে Range Rover-এর Velar মডেলের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় এর ব্যঙ্গাত্মক ডাকনাম “Temu Range Rover”। কিন্তু এসব বিদ্রূপ গাড়িটির বাজার সাফল্য আটকাতে পারেনি। গত মার্চ মাসে যুক্তরাজ্যের বিক্রির তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করা প্রথম চীনা গাড়ি হিসেবে রেকর্ড গড়ে এটি। এই ধারাবাহিকতায় Chery-এর নিজস্ব মূল ব্র্যান্ডটিও এখন ব্রিটেনের বাজারে পা রেখেছে এবং ক্রমান্বয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করছে।
আমেরিকান গাড়ি নির্মাতারাও এখন মেনে নিতে শুরু করেছে যে বর্তমান বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত চীনা প্রতিযোগীরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করবে। Ford-এর প্রধান নির্বাহী Jim Farley সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার চিরকাল বন্ধ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সম্প্রতি এক শিল্প সম্মেলনে তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের বলেন, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে এই সুরক্ষা বেষ্টনী ভেঙে পড়বে।
এতে Detroit-এর গাড়ি নির্মাতাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে এসেছে: চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য কোনো উপায়ে বাজারে প্রবেশ করার আগেই তাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব করা কি বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হবে, নাকি শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়াই ভালো?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump দাবি করেছেন, চীনা গাড়ি নির্মাতারা যদি আমেরিকান কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপন করে, তাহলে তিনি সেটিকে স্বাগত জানাবেন। তবে Detroit-এর গাড়ি নির্মাতারা এবং United Auto Workers শ্রমিক ইউনিয়ন এমন ব্যবস্থা সহজে গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না।
এ ধরনের পদক্ষেপের নজির অবশ্য রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল। এখন Honda, Nissan, Toyota ও Subaru যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা পরিচালনা করছে, আমেরিকান কর্মীদের চাকরি দিচ্ছে এবং দেশটির গাড়িশিল্পের স্বাভাবিক অংশে রূপান্তরিত হয়েছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা যে শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, Ford নিজেই তার প্রমাণ দিয়েছে। চীনের CATL-এর প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাটারি উৎপাদনের লাইসেন্স রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। অন্যদিকে ইউরোপেও Ford ও Geely ২০২৬ সালের জুলাইয়ে একটি যৌথ উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে। এর লক্ষ্য স্পেনের Valencia-তে অবস্থিত Ford-এর কারখানাতে ইউরোপীয় ক্রেতাদের জন্য বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করা। ২০২৮ সালে এই উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা।
এছাড়াও, কয়েকটি সংবাদ সংস্থার দাবি অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে Farley যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Trump ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, Ford-এর মতো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে চীনা গাড়ি নির্মাতারা উত্তর আমেরিকায় গাড়ি তৈরি করতে পারে।
Dodge, Jeep, Ram ও Fiat-এর মূল প্রতিষ্ঠান Stellantis ইতিমধ্যে ও চীনা গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ের বদলে সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে। তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি চীনের Leapmotor-এর ২১ শতাংশ শেয়ার কিনেছিল। একই সঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগ গঠন করা হয়, যেখানে Stellantis-এর নিয়ন্ত্রণকারী মালিকানা ৫১ শতাংশ। এই অংশীদারত্বের আওতায় এখন ইউরোপে Leapmotor-এর গাড়ি বিক্রি ও উৎপাদন করা হচ্ছে।
বর্তমানে, Stellantis কানাডার বাজারে চীন থেকে সরাসরি Leapmotor-এর গাড়ি আমদানির পরিকল্পনা করছে। Stellantis-এর আরেকটি ব্র্যান্ড Maserati-ও নিজেদের ব্যবসা স্থিতিশীল করতে চীনা গাড়ি নির্মাতা Maxxtero-এর গাড়ি নিজেদের ব্র্যান্ডের নামে বিক্রির কথা বিবেচনা করছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
বিষয়টি কিছুটা পরিহাসেরই বলা চলে। একসময় পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমেই চীনের গাড়িশিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। তাদের প্রযুক্তি আর উৎপাদন পদ্ধতি রপ্ত করে আজ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোই বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। আর এখন সময়ের পরিবর্তনে এই তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্বয়ং সেই পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোরই কোনো কোনোটির টিকে থাকার জন্য চীনা অংশীদারদের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে!
শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষকের ভূমিকায়। Detroit চাইলে দরজা বন্ধ রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে, অথবা দরজার বাইরে অপেক্ষা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে শিখতে পারে। যে পথই বেছে নেওয়া হোক, চীনের গাড়িশিল্প অনির্দিষ্টকাল অনুমতির অপেক্ষায় বসে থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা যখন চীনা গাড়ির প্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন চীনের গাড়ি নির্মাতারা দেশটিতে ঢোকার বিকল্প পথ খুঁজছে।