ছবিঃ Volkswagen
অবশেষে ভালো বিক্রি হচ্ছে Volkswagen-এর বৈদ্যুতিক গাড়ি। কিন্তু জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির সামনে এখন নতুন সমস্যা—মুনাফা।
প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, বর্তমানে তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে অর্জিত মুনাফার পরিমান, তাদের পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির তুলনায় অনেক কম। গ্রুপটির নয় মাসের আর্থিক ফলাফল প্রকাশের সময় দেওয়া এক বিবৃতিতে এই ব্যবধানের কথা স্বীকার করেন Volkswagen-এর CFO ও COO Arno Antlitz।
তিনি বলেন, “আমাদের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে এই সাফল্য মূলত আয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে; কারণ বর্তমানে আমরা পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে কম মুনাফা করছি।”
সমস্যাটি চাহিদার অভাব নয়। চীনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য Volkswagen-কে তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ির লাইনআপে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সামলাতে হচ্ছে কম মুনাফার হার এবং তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার চাপ। এর ফলে, EV বিক্রি বাড়ার সাথে সাথে মোট আয় বাড়লেও, তা থেকে আসা লাভ পেট্রোল বা ডিজেলচালিত গাড়ির কমতে থাকা মুনাফাকে পুষিয়ে দিতে পারছে না।
প্রতিষ্ঠানটির আসন্ন এন্ট্রি-লেভেল বৈদ্যুতিক গাড়ি পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে। ID. Every1 কনসেপ্টের উৎপাদন সংস্করণ ২০২৭ সালে বাজারে আসার কথা। গাড়িটি ID. Up নামটিও ফিরিয়ে আনতে পারে। আশা করা হচ্ছে, Volkswagen-এর সবচেয়ে সস্তা EV হিসেবে এটি বৈদ্যুতিক গাড়িকে আরও বেশি মানুষের নাগালে নিয়ে আসবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাশ্রয়ী গাড়ি মানেই যে ভালো মুনাফা, তা নয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক CO₂ নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং সম্ভাব্য বড় অঙ্কের জরিমানা এড়াতেও Volkswagen-কে আরও বেশি EV বিক্রি করতে হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছে: ক্রেতাদের বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে হবে, অথচ বর্তমানে এসব গাড়ি থেকেই তুলনামূলক কম অর্থ আসছে।
ছবিঃ Skoda
তবে অন্তত কিছু লক্ষণ বলছে, তাদের কৌশল কাজে লাগতে শুরু করেছে। বছরের প্রথম নয় মাসে Volkswagen Group-এর ইউরোপীয় অর্ডার বুকের ৪০ শতাংশই ছিল EV। তাদের Electric Urban Car Family-র বিভিন্ন গাড়ির জন্য অর্ডার এসেছে প্রায় ১,৫০,০০০টি। এর মধ্যে বিশেষ ভূমিকা রাখছে চারটি মডেল: Volkswagen ID. Polo, ID. Cross, Cupra Raval এবং Skoda Epiq।
তবে EV-র চাহিদা বাড়ার পেছনে প্রতিষ্ঠানটির কিছু পরোক্ষ খেসারত দিতে হতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্রেতা বাড়লে বেশি মুনাফা দেওয়া পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; পাশাপাশি প্রথাগত জ্বালানিচালিত গাড়ি তৈরির জন্য নির্মিত কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার বড় ঝুঁকি তৈরি হবে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির এই গ্যারাকলে Volkswagen ইতিমধ্যেই একইসঙ্গে সঙ্গে কয়েক দিক থেকে চাপে রয়েছে। একদিকে চীনের বাজারে তাদের অবস্থান ক্রমশই দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে চীনা নির্মাতারা ইউরোপে আরও আগ্রাসীভাবে বিস্তার করছে আর সাগরের অপরপ্রান্তে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের চাপ।
গ্রুপটির আর্থিক অবস্থা নিয়ে Arno Antlitz মন্তব্যটি ছিল বেশ সরাসরি।
তিনি বলেন, "নয় মাস শেষে আমাদের বিক্রয় আয়ের বিপরীতে পরিচালন মুনাফার হার মাত্র ৩.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ ইউরো বিক্রির বিপরীতে পরিচালন মুনাফা থাকছে ৪ ইউরোরও কম। দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই নয়। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও আমরা গ্রাহকদের জন্য অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে চাই। তবে মুনাফা না বাড়লে তা সম্ভব নয়।"
সমস্যা মোকাবিলায় প্রায় ৩১ বিলিয়ন ইউরো সাশ্রয়ের একটি ব্যয় কমানোর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে Volkswagen। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে মডেলের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য কমানো, ব্যবস্থাপনা কাঠামো সহজ করা, উৎপাদন খরচ ও পরিচালন ব্যয় কমানো, কারখানার দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা।
এই কাটছাঁট গ্রুপটির কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমান মডেলগুলোর অর্ধেকের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি যন্ত্রাংশের তালিকা সহজ করে বড় পরিসরে উৎপাদনের খরচ কমানোর প্রচেষ্টা চলছে। দীর্ঘদিনের SEAT ব্র্যান্ডটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১,০০,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের লক্ষ্যও নিয়েছে Volkswagen। জার্মানির চারটি কারখানা—Emden, Zwickau, Hanover এবং Neckarsulm-এর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০৩১ থেকে ২০৩৪ সালের পর এসব কারখানায় উৎপাদনের বরাদ্দ নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না তারা।
তবে তার মানে এই নয় যে কারখানাগুলো এখনই বন্ধ করে দেওয়া হবে। Volkswagen এসব স্থাপনার বিকল্প ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। তবে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা সামলাতে গিয়ে ভবিষ্যতে আরও কারখানা বন্ধ কিংবা উৎপাদন কমানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিষয়টি নিয়ে আরও সময় নষ্ট করতে রাজি নন Arno Antlitz।
তিনি বলেন, "সময় নষ্ট করার সামর্থ্য আমাদের নেই। দ্রুত এবং দৃঢ়ভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।"
Volkswagen-এর জন্য বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তর এখন আর শুধু বেশি গাড়ি বিক্রির বিষয় নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো, এই গাড়িগুলো বিক্রি করার পাশাপাশি কীভাবে সফলভাবে বাজারে টিকে থাকা যায়।
অবশেষে ভালো বিক্রি হচ্ছে Volkswagen-এর বৈদ্যুতিক গাড়ি। কিন্তু জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির সামনে এখন নতুন সমস্যা—মুনাফা।