গাড়ির কাচেও স্ক্রিন বসাচ্ছে Mercedes

ছবিঃ Mercedes-Benz

গাড়ির ভেতর ক্রমেই বড় ডিসপ্লে দিয়ে ভরাট করার পর এবার জানালার দিকে নজর দিয়েছে Mercedes-Benz।

জার্মান বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ প্রযুক্তি প্রদর্শনীতে এমন এক ব্যবস্থা উন্মোচন করা হয়েছে, যা গাড়ির কাচের ভেতরে থাকা LED ডিসপ্লে এবং সামনের উইন্ডস্ক্রিনকে হলোগ্রাফিক তথ্য ও বিনোদনের পর্দায় রূপান্তর করে। Mercedes-এর দাবি, এই প্রযুক্তি গাড়ি ও তার আশপাশের পরিবেশের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ আরও উন্নত করবে, সড়কে থাকা অন্যান্য যানবাহন ও পথচারীদের কাছে গাড়িকে করে তুলবে আরও দৃশ্যমান এবং দেখাতে পারবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সতর্কবার্তা ।

বড় ডিসপ্লের প্রতি Mercedes-এর এই ঝোঁক অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ডিজাইন প্রধান Gorden Wagener একসময় BMW ও Audi-র সমালোচনা করেছিলেন, কারণ তাঁর মতে, ব্র্যান্ড দুটি গাড়িতে যথেষ্ট বড় স্ক্রিন ব্যবহার করছে না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, গাড়ির কাচের তৈরি প্রতিটি অংশকে ডিসপ্লেতে পরিণত করার এক বড় লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে Mercedes।

প্রথম প্রযুক্তিটিতে LED উপাদান সরাসরি গাড়ির কাচের মধ্যে স্তর হিসেবে বসানো হয়। বন্ধ অবস্থায় এগুলো প্রায় অদৃশ্য থাকে, ফলে জানালার স্বাভাবিক চেহারা বজায় থাকে। এখানে Mercedes দুই ধরনের LED নিয়ে কাজ করছে: বড় ডিসপ্লে এলাকার জন্য Mini-LED এবং ছোট জায়গায় প্রদর্শনের জন্য আরও উচ্চ রেজল্যুশনের Micro-LED।

এর একটির সম্ভাব্য ব্যবহার হতে পারে পেছনের জানালায়, যেখানে ডিসপ্লেগুলো গাড়ির পেছনে থাকা চালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। দেখানো সম্ভব হবে ব্রেক লাইটের সংকেত, সতর্কবার্তার প্রতীক, ট্রাফিকসংক্রান্ত তথ্য, এমনকি চলমান গ্রাফিকসও। বড় ডিসপ্লে এলাকা ও সাধারণ সতর্কবার্তার জন্য Mini-LED ব্যবহার করা হবে। অন্যদিকে, Micro-LED আরও বিস্তারিত গ্রাফিকস ও অ্যানিমেশন দেখাতে পারবে।

দ্বিতীয় প্রযুক্তিটি ডিসপ্লের এই উন্মাদনাকে নিয়ে যাচ্ছে উইন্ডস্ক্রিনে। আরেকটি সাধারণ স্ক্রিন বা head-up display বসানোর বদলে Mercedes এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করছে, যেখানে instrument panel-এ ব্যবহার করা হবে ভেতরে বসানো একটি projector। এটি উইন্ডস্ক্রিনের মধ্যে স্তর হিসেবে বসানো বিশেষ স্বচ্ছ ফিল্মের ওপর ছবি প্রক্ষেপণ করবে। ফিল্মটির মধ্যে রয়েছে holographic optical elements, যা প্রক্ষেপিত আলোকে নির্দিষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। ফলে তীব্র সূর্যের আলোতেও তথ‍্যগুলো দেখা যাবে।

এই ব্যবস্থা আরও সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কে কোন তথ্য দেখবেন। চালক উইন্ডস্ক্রিনের নিজের পাশের অংশে থাকা তথ্য দেখতে পারবেন, আর যাত্রী দেখতে পারবেন তাঁর পাশের সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়বস্তু। অন্য পাশের ডিসপ্লেতে কী দেখানো হচ্ছে, তা কেউই দেখতে পারবেন না। এর সম্ভাব্য ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে নেভিগেশন, গাড়ি চালানোর প্রয়োজনীয় তথ্য, ভিডিও কল এবং সিনেমা দেখা। তবে উইন্ডস্ক্রিনজুড়ে সব সময় তথ্য প্রদর্শনের বদলে কেবল প্রয়োজন হলেই ডিসপ্লেটি চালু হবে।

তবে এই প্রযুক্তির সঙ্গে একটি বেশ ব্যয়বহুল প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। গাড়ির কাচের মধ্যে ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ সংযুক্ত থাকলে সেটি বদলানোর খরচ অনেক বেড়ে যেতে পারে। কাচে ফাটল, ছোটখাটো দুর্ঘটনা কিংবা কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু সাধারণ কাচ বদলালেই চলবে না। ভবিষ্যতে গাড়ির মালিকদের হয়তো নতুন জানালার পাশাপাশি তার মধ্যে বসানো প্রযুক্তির খরচও দিতে হবে।

রাস্তায় অন্য চালকদের সঙ্গে যোগাযোগের এই প্রযুক্তি নিয়ে শুধুমাত্র Mercedes-ই ভাবছে, তা নয়; গাড়ির লাইটিং ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে Audi। তাদের আসন্ন Q7 ও Q9 মডেলের গাড়িগুলো সরাসরি রাস্তায় অ্যানিমেটেড দিকনির্দেশক তীরচিহ্ন (turn-signal arrow) প্রক্ষেপণ করতে পারবে। হেডলাইট ও টেইললাইটের ভেতর থাকা প্রজেক্টরের সাহায্যে প্রচলিত ইন্ডিকেটরের পাশাপাশি এই আলোকিত তীরচিহ্নগুলো রাস্তায় ফুটে উঠবে। ফলে গাড়িটি কোন দিকে ঘুরতে যাচ্ছে, তা চারপাশে থাকা অন্যদের পক্ষে বোঝা আরও সহজ হবে।

এই প্রক্ষেপণব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে আশপাশের গাড়িচালক, সাইকেল আরোহী ও পথচারীদের সতর্ক করার জন্য । বিশেষ করে রাতে কিংবা প্রচলিত ইন্ডিকেটর সহজে দেখা না গেলে এটি কাজে আসতে পারে। Audi-র কিছু মডেলে ইতিমধ্যে OLED টেইললাইট ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পেছনের চালকদের সতর্কবার্তার প্রতীক দেখাতে পারে। এতে স্পষ্ট যে, গাড়ির পেছনের আলো এখন আর শুধু ব্রেক করা বা মোড় নেওয়ার সনাতনী সংকেতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এখন তারা পালন করছে তার চেয়েও বড় দায়িত্ব।

দুই প্রতিষ্ঠানই গাড়ির কাচ ও আলোকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের নতুন উপায় খুঁজছে। এসব ব্যবস্থা সড়কের নিরাপত্তা বাড়াতে পারে, যদিও প্রদর্শিত প্রতিটি প্রযুক্তিই যে উৎপাদিত গাড়িতে জায়গা পাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। আধুনিক গাড়িতে এমনিতেই ডিসপ্লের সংখ্যা হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে মেরামতের খরচ এবং অহেতুক প্রযুক্তির বাহুল্য নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোও এখন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

হয়তো আরেকটি নতুন জায়গায় ডিসপ্লে বসানোর আগে Mercedes-এর উচিত নিজেদের গাড়ির কেবিনের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ বন্ধ আর অন্যান্য গুণগত উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া। গাড়িপ্রেমীরা যে প্রযুক্তির চাকচিক্য দেখে কেনেন না, Mercedes-AMG কর্তৃপক্ষ এই নির্মম সত্যটি ইতিমধ্যেই বেশ ভালোভাবে টের পেয়েছে।

Previous
Previous

ফিরছে Toyota Celica, তবে রাস্তায় নয়

Next
Next

পুরোনো GTO-তে ৬৫০ হর্সপাওয়ারের তাণ্ডব!