ছবিঃ BMW
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত গাড়িটি যখন তার ৬০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করছে, ঠিক তখনই পরোক্ষভাবে তাকে ‘বোরিং’ বলে বসেছে জার্মান গাড়ি নির্মাতা BMW।
গত ২৯ অক্টোবর BMW তাদের নতুন গ্লোবাল মার্কেটিং ক্যাম্পেইন বা বৈশ্বিক বিপণন প্রচারণা, “Made Different. To Feel Different” চালু করেছে। এই প্রচারণায় গাড়ি চালানোর আনন্দকে BMW-র পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। তাদের দাবি—অনন্য প্রকৌশল, দৃষ্টিনন্দন নকশা এবং প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের নিখুঁত কাজই BMW-কে অন্য সব প্রতিযোগী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তোলে।
তবে তাদের সাম্প্রতিক ইনস্টাগ্রাম পোস্টগুলোর একটিতে এই বার্তা দেওয়ার পদ্ধতিটিই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে তৈরি ১৯৯০-এর দশকের নকশার একটি রুপালি গাড়ির সামনের অংশ দেখানো হয়েছে। এবং সঙ্গেএক শব্দের ক্যাপশন: "BORING."
সেই ‘বোরিং’ খ্যাত গাড়িটিতে রয়েছে আয়তাকার হেডলাইট, আলাদা অ্যাম্বার টার্ন সিগন্যাল এবং সাধারণ নকশার একটি গ্রিল। মূল চেহারা ১৯৯০-এর দশকের জাপানি পারিবারিক গাড়িগুলোর সঙ্গে বেশ মিলে যায়। বিশেষ করে মনে পড়ে যায় ষষ্ঠ প্রজন্মের Toyota Carina এবং Toyota Corolla E100-এর কথা। ছবিটির ব্যবহারে পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে BMW খুব বেশি কিছু বলেনি।
তবে গাড়িটির সঙ্গে Toyota-র মিল দর্শকদের চোখ এড়ায়নি। অনেকেই BMW-র মার্কেটিং বার্তায় কেন এমন গাড়ির নকশাই বেছে নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ আবার বিষয়টির বিদ্রূপাত্মক দিকও তুলে ধরেছেন। দামি গাড়ি এবং ধনী মালিকদের সঙ্গে পরিচিত একটি ব্র্যান্ড সাধারণ পারিবারিক সেডানকে নিয়ে কটাক্ষ করছে, এটা অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেনি।
স্বাভাবিকভাবেই, যে গাড়িটি লাখ লাখ মানুষ ব্যবহার করে এবং ভালোবাসেন , সেটি নিয়ে এক জার্মান নির্মাতার ঠাট্টা অনেকেরই পছন্দ হবে না—বিশেষ করে যাদের গাড়ি প্রায়ই ধনী, আর অনেক সময়ই বেয়াক্কেল চালকদের হাতে দেখা যায়।
BMW-র বৃহত্তর বার্তা হলো, একটি গাড়ি তৈরি করা মানে শুধু চারটি চাকা আর একটি ইঞ্জিন জুড়ে দেওয়া নয়। গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতার পেছনে থাকা প্রকৌশল, নিরাপত্তা, নকশা এবং ক্রেতাদের জন্য সেবার বিষয়গুলো নিয়ে মানুষকে ভাবাতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এই ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য আসন্ন ২০২৭ BMW X5-এর প্রচার। ফলে AI দিয়ে তৈরি একটি সাধারণ পারিবারিক সেডানের সঙ্গে একটি বিশাল বিলাসবহুল বৈদ্যুতিক SUV-টির অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করা হয়েছে।
ছবিঃ BMW
এখানে বিদ্রূপের আরও একটি স্তর রয়েছে। BMW এবং Toyota বহু বছর ধরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। BMW Z4 এবং Toyota Supra দুটো গাড়ি তৈরি হয়েছে দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ সহযোগিতায়। পাশাপাশি হাইড্রোজেন ফুয়েল-সেল প্রযুক্তি নিয়েও একসাথে কাজ করছে তারা। বলা বাহুল্য, BMW তাদের বিজ্ঞাপনে সরাসরি Toyota-র ব্যাজ পরিহিত কোনো গাড়ি ব্যবহার করেনি। তবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য Toyota-র মতো দেখতে AI-নির্মিত একটি গাড়ি বেছে নেবার সিদ্ধান্তটি প্রশ্নসাপেক্ষ।
BMW-র পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইলে বলা যায়, প্রচলিত গাড়ির বিজ্ঞাপনের তুলনায় এই ক্যাম্পেইন অনেক বেশি হাস্যরসাত্মক এবং উসকানিমূলক। ঝকঝকে স্টুডিওতে তোলা ছবি কিংবা পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে রসিকতার সাহায্য নিচ্ছে BMW।
অবশ্য সাধারণ একটি গাড়ির মধ্যে দোষের কিছু নেই। অনেক ক্রেতাই শুধু নির্ভরযোগ্য এবং অনুমানযোগ্য পরিবহন চান, যা কোনো ঝামেলা ছাড়াই তাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে। তাদের ধারালো হ্যান্ডলিং, স্পোর্টি ইঞ্জিন কিংবা এমন স্টিয়ারিং হুইলের প্রয়োজন নেই, যা প্রতিটি যাত্রাকে Nürburgring-এ কাটানো সাপ্তাহিক ছুটির মতো মনে করাবে।
ছবিঃ আকিফ হামিদ
এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও এই প্রচারণা কতটা কাজে আসবে, সেটি অন্য প্রশ্ন। কাউকে Instagram স্ক্রল করা থামিয়ে একটি পোস্টের দিকে তাকাতে বাধ্য করা এক ব্যাপার। আর অতিরিক্ত দাম, সাবস্ক্রিপশননির্ভর ফিচার এবং ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণের দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকা একটি গাড়ির বদলে BMW সত্যিই এবার আলাদা কিছু দিবে—এমন বিশ্বাস করানো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।
আপাতত ক্যাম্পেইনটি যে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে, তা নিশ্চিত। তবে BMW মানুষের সেই আলোচনার আসল বক্তব্য বুঝতে পারছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত গাড়িটি যখন তার ৬০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করছে, ঠিক তখনই পরোক্ষভাবে তাকে ‘বোরিং’ বলে বসেছে জার্মান গাড়ি নির্মাতা BMW।