ছবিঃ সংগৃহীত
কঠিন সময় পার করছে বাংলাদেশের গাড়ির বাজার। গাড়ির দাম বৃদ্ধি, টাকার দরপতন এবং আরো বিভিন্ন কারণে গাড়ির বাজারে নেমেছে ধস।
The Daily Star-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ হাজার কোটি টাকার এই গাড়ির বাজারে মন্দা দেখা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং মানুষের ব্যয় সংকোচনের কারণে কমেছে গাড়ির চাহিদা। এর সঙ্গে বৈশ্বিক সংঘাত, জ্বালানি সংকট এবং বাণিজ্যযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের মতে, গাড়ি কেনার সামর্থ্য রাখেন এমন মানুষের সংখ্যা কমছে। একই সময়ে বাড়ছে বাংলাদেশে গাড়ি আমদানির খরচ।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (BARVIDA)-এর মহাসচিব রিয়াজ রহমান বলেন, “মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে গত দুই বছরে গাড়ি আমদানির খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।”
BARVIDA Car Expo 2026 সামনে রেখে সংগঠনটির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (BRTA) তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন সংখ্যার বিপুল অবনতি হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে মাত্র ৫,৪৫৮টি ব্যক্তিগত যাত্রীবাহী গাড়ি। অর্থাৎ প্রতি মাসে নিবন্ধিত হচ্ছে গড়ে প্রায় ৬৮২টি গাড়ি। একই ধারা অব্যাহত থাকলে বছরের শেষে নিবন্ধনের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮,১৮৭টিতে। ২০২৫ সালে নিবন্ধিত ৯,৩৮৭টি গাড়ির তুলনায় যা প্রায় ১৩ শতাংশ কম।
ছবিঃ Toyota
টানা তিন বছর ধরে এই পতন চলছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশে নিবন্ধিত হয়েছিল ১৬,৬৯৫টি ব্যক্তিগত যাত্রীবাহী গাড়ি। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১০,৭৮৪টিতে। ২০২৪ সালে নিবন্ধিত হয় ১০,৪৯৯টি এবং ২০২৫ সালে ৯,৩৮৭টি।
BARVIDA-এর সহসভাপতি-১ ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইফুল ইসলাম (সম্রাট) বলেন, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনের কারণে গাড়ি আমদানির খরচ অনেক বেড়ে গেছে। একপর্যায়ে ডলারের দাম বেড়েছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। এর ফলে একটি এন্ট্রি-লেভেল গাড়ির দাম ১৬ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়ে গেছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করের বোঝা। একটি নন-হাইব্রিড Toyota Axio আমদানি করতে শুল্ক ও কর বাবদ দিতে হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। একই গাড়ির হাইব্রিড সংস্করণটির ক্ষেত্রে এই খরচ প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গাড়ির দাম বাড়ার পাশাপাশি মানুষের আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে দৈনন্দিন খরচে। ফলে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের অনেকের পক্ষেই এখন ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
কমেছে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিও। ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছিল ২১,৩৩৭টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। আগের অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ২১,৫১৯টি। অন্যদিকে বাড়ছে জাপানে গাড়ি কেনার খরচ। দেশটির নিলামে গাড়ির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের এখন বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ফলস্বরূপ কমেছে সরকারের রাজস্ব আয়। ২০২৫ অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি থেকে সরকার ৩,৮৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ শতাংশেরও বেশি কম।
ছবিঃ Toyota
এই পরিস্থিতিতে ক্রেতা ও ডিলারদের এক জায়গায় আনতে তিন দিনব্যাপী গাড়ি প্রদর্শনীর আয়োজন করছে BARVIDA। ৫ থেকে ৭ নভেম্বর ঢাকার International Convention City Bashundhara (ICCB)-তে অনুষ্ঠিত হবে এই আয়োজন। উদ্দেশ্য জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ ফিরিয়ে আনা।
প্রদর্শনীতে Toyota Prius, Corolla Cross, Harrier, Noah, Voxy এবং Alphard-এর মতো জনপ্রিয় মডেল উপস্থিত থাকবে। দর্শনার্থীরা সুযোগ পাবেন একই ছাদের নিচে বিভিন্ন মডেলের বৈশিষ্ট্য, প্রযুক্তি এবং দাম তুলনা করার।
তবে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বাজারে আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে চীনা গাড়ির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা। এসব গাড়ির অনেকগুলোর দাম ব্যবহৃত জাপানি গাড়ির সমান, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও কম। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কোনো কোনো অংশ জাপানে তিন বছর চলা বা ৩০,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া একটি গাড়ির বদলে বেছে নিচ্ছেন নতুন গাড়ি।
ছবিঃ ইমরান আবিদ
পাশাপশি চীনা বেশিরভাগ গাড়িই হাইব্রিড অথবা সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক। যেখানে বর্তমানে প্রতি লিটার জ্বালানির সর্বোচ্চ দাম ১৬৫ টাকা সেখানে বিদ্যুতায়িত গাড়ির সাশ্রয়ের সম্ভাবনা এসব গাড়িগুলোকে করে তুলছে আরো আকর্ষণীয়।
তবে মূল সমস্যাটি কোন দেশের গাড়ি, তা নয়। গত এক দশকে বাংলাদেশে একটি নিজস্ব গাড়ি অর্জনের সক্ষমতা ক্রমশই নাগালের বাইরে চলে গেছে। চলমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির বাস্তবতায় বহু মানুষের একটি গাড়ির মালিক হবার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে।
কঠিন সময় পার করছে বাংলাদেশের গাড়ির বাজার। গাড়ির দাম বৃদ্ধি, টাকার দরপতন এবং আরো বিভিন্ন কারণে গাড়ির বাজারে নেমেছে ধস।