বিশ্বজুড়ে জ্বালানি গাড়ির বিক্রিতে ধস
ছবিঃ Unsplash
শতাধিক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে নতুন পেট্রোল বা ডিজেলচালিত গাড়ি বিক্রির পরিমাণ অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।
Nikkei Asia-তে উদ্ধৃত Mobility Global-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বজুড়ে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির মাত্র ৪৯ শতাংশ ছিল সম্পূর্ণ জ্বালানি ইঞ্জিনচালিত। ১৯২০-এর দশকে জ্বালানি চালিত গাড়ি মূলধারায় পরিণত হওয়ার পর এই প্রথম বাজারে তাদের অংশীদারত্ব ৫০ শতাংশের নিচে নেমেছে।
এই পতন বেশ দ্রুত ঘটেছে। ২০২১ সালেও বিশ্বজুড়ে নতুন গাড়ির বাজারের ৭৩ শতাংশ ছিল প্রথাগত পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির দখলে। তবে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কাছে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ইঞ্জিনচালিত গাড়ি বিক্রি হয়েছে ২ কোটি ২৫ হাজার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ কম। বিপরীতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ইউনিটে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ মোট নতুন গাড়ি বিক্রির ১৭ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি। হাইব্রিড গাড়ির বিক্রিও বেড়েছে ১০ শতাংশ এবং মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২ লাখ ৭০ হাজার ইউনিটে।
তবে সব অঞ্চলে এই পরিবর্তন একই গতিতে ঘটছে না। চীন এখনও বিশ্বের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার, যেখানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ চালিত নতুন গাড়ি বিক্রি হয়। তবে জানুয়ারিতে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার পর দেশটিতে বিক্রি ৩ শতাংশ কমে ৩৪ লাখ ৪০ হাজার ইউনিটে নেমেছে।
ইউরোপে এই পরিবর্তনের গতি আরও বেশি। সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেড়ে ১৮ লাখ ১০ হাজার ইউনিটে পৌঁছেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি আরও উল্লেখযোগ্য—বিক্রি ৮১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার ইউনিটে। ওশেনিয়া অঞ্চলে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১ লাখ ১০ হাজার ইউনিটে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, উত্তর আমেরিকায় বিক্রি উল্টো ১৫ শতাংশ কমেছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির সাম্প্রতিক এই পুনরুত্থানের আগে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। Mobility Global-এর Associate Director Yoshiaki Kawano বলেছেন, “২০২৪ সালের দিকে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রয়ের গতি কমে গিয়েছিল। ভর্তুকি কমানোসহ বিভিন্ন কারণে হাইব্রিডের জনপ্রিয়তা বেড়েছিল। কিন্তু তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ির কম পরিচালন ব্যয়ের সুবিধা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে, আর এখন বিক্রিও আবার বাড়ছে।”
Kawano আরও মনে করেন, এই পরিবর্তন এখন সরকারি সহায়তার বদলে ক্রেতাদের প্রকৃত চাহিদার ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তাঁর ভাষায়, “খুব কম বৈদ্যুতিক গাড়ি ক্রেতাই আবার পেট্রোলচালিত গাড়ি বা হাইব্রিডে ফিরে যায়। তাই বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম যেভাবে ক্রমান্বয়ে কমছে, তাতে ভর্তুকির তুলনায় বরং ভোক্তাদের বাস্তব চাহিদাই আগামীতে এই বাজারকে আরও প্রসারিত করবে।”
Mobility Global-এর বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে মোট গাড়ি উৎপাদনের ৩০ শতাংশেরও বেশি হবে বৈদ্যুতিক। এই পূর্বাভাস সত্যি হলে বৈদ্যুতিক গাড়ি হাইব্রিড এবং প্রচলিত পেট্রোল-ডিজেলচালিত—দুই ধরনের গাড়িকেই ছাড়িয়ে যাবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জ্বালানি ইঞ্জিননির্ভর একটি শিল্পের জন্য এটি হবে বড় ধরনের পরিবর্তন।
বাংলাদেশেও এই পরিবর্তনের নিজস্ব একটি চিত্র দেখা যাচ্ছে, যদিও স্থানীয় পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জ্বালানির খরচ বাড়ায় হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে মাত্র কয়েক দিন আগে অকটেনের দাম প্রতি লিটার ১৬৫ টাকায় পৌঁছানোর পর জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়ের মুখে পেট্রোলের ব্যবহার কমাতে সক্ষম একটি হাইব্রিড গাড়ির আকর্ষণ উপেক্ষা করা কঠিন।
সম্পূর্ণ ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটি ভিন্ন। চালানোর খরচ আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের চার্জিং অবকাঠামো এখনও বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। যেসব চালক বাড়িতে কিংবা নিয়মিত যাতায়াতের পথে নির্ভরযোগ্য চার্জিং স্টেশন সুবিধা পান না, তাঁদের জন্য বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশ কঠিন । বিশেষ করে যাঁদের নিয়মিত দূরপাল্লার যাতায়াত করতে হয়, তাঁদের জন্য এখনই একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তটা প্রশ্নসাপেক্ষ।
তবে বিশ্ববাজারের পরিবর্তনটি এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশ্বজুড়ে প্রচলিত পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি এখন আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্রেতাদের স্বাভাবিক পছন্দ নয়। তারা এখন বৈদ্যুতিক বা বিদ্যুতাইয়িত গাড়িই পছন্দ করছেন।
আপনি যদি ইউরোপীয় গাড়ি বা ফরাসি নির্মাতাদের বিচিত্র সব পরীক্ষানিরীক্ষার অনুরাগী না হন, তাহলে সম্ভবত Peugeot RCZ-এর নামকখনও শোনেননি। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত Peugeot-এর জন্য Magna Steyr-এর তৈরি নজরকাড়া এই কুপে এমন এক সময়ে বাজারে এসেছিল, যখন অধিকাংশ গাড়ি নির্মাতাই প্রতিটি গাড়িকে হয় পারিবারিক হ্যাচব্যাক, নয়তো SUV-তে পরিণত করতে নেশায় আক্রান্ত ছিল।