ভবিষ্যৎ থেকে ফিরল Peugeot RCZ
ছবিঃ Peugeot
আপনি যদি ইউরোপীয় গাড়ি বা ফরাসি নির্মাতাদের বিচিত্র সব পরীক্ষানিরীক্ষার অনুরাগী না হন, তাহলে সম্ভবত Peugeot RCZ-এর নামকখনও শোনেননি। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত Peugeot-এর জন্য Magna Steyr-এর তৈরি নজরকাড়া এই কুপে এমন এক সময়ে বাজারে এসেছিল, যখন অধিকাংশ গাড়ি নির্মাতাই প্রতিটি গাড়িকে হয় পারিবারিক হ্যাচব্যাক, নয়তো SUV-তে পরিণত করতে নেশায় আক্রান্ত ছিল।
এবার ইউরোপের গাড়ি নির্মাতারা যখন নিজেদের গৌরবময় অতীত ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন Peugeot-ও তাদের RCZ Vision নিয়ে যোগ দিয়েছে রেট্রো গাড়ির এই পুনর্জাগরণে। Citroën 2CV এবং Alpine A310-অনুপ্রাণিত কনসেপ্টগুলোর পর এই বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কুপেও প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতের গাড়ি মানেই চাকার ওপর বসানো রেফ্রিজারেটরের মতো দেখতে কিছু হতে হবে না। তবে নস্টালজিয়াকে ঘিরে এই সব প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত এমন উৎপাদনমুখী গাড়িতে পরিণত হবে কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন।
২০২৬ সালের Paris Motor Show শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে উন্মোচিত RCZ Vision কনসেপটি Peugeot-এর ভবিষ্যৎ নকশা, প্রযুক্তি ও ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে একটি চলমান ঘোষণাপত্র। এতে প্রথমবারের মতো তুলে ধরা হয়েছে কোম্পানির “Feline Future” ডিজাইন শৈলী , যার ভিত্তি হলো পাঁচটি নীতি : স্বাধীনতা, নির্ভীকতা, আভিজাত্য, অভ্যন্তরীণ শক্তি এবং সহজাত প্রবৃত্তি।
নতুন এই নকশায় আসল RCZ-এর সবচেয়ে স্মরণীয় বৈশিষ্ট্যগুলো ধরে রাখা হয়েছে, তবে সেগুলোকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ভবিষ্যতের দিকে। নিচু গড়ন, পেশিবহুল কাঁধ এবং সরু কাচঘেরা কেবিন কুপেটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র চেহারা। ইতালীয় নকশা প্রতিষ্ঠান Zagato-র কাজ থেকে অনুপ্রাণিত ডাবল-বাবল ছাদটি সরাসরি মূল গাড়িটির নকশা থেকে নেওয়া হয়েছে।
RCZ Vision-এর দৈর্ঘ্য ৪.৬৫ মিটার, প্রস্থ ১.৯৪ মিটার এবং উচ্চতা ১.৩৫ মিটার। অর্থাৎ, এটি একটি যথাযথ স্পোর্টস কুপের অনুপাত ধরে রেখেছে। সামনে রয়েছে ২১ ইঞ্চির এবং পেছনে ২২ ইঞ্চির চাকা, যা গাড়িটিকে দিয়েছে বেশ নজরকাড়া উপস্থিতি। গাড়ি চলার সময় পেছনের অ্যাকটিভ স্পয়লারটি বেরিয়ে আসে, আর পার্ক করা অবস্থায় আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। অন্যদিকে, অতি সরু অনুভূমিক লাইটের মাধ্যমে Peugeot-এর পরিচিত তিনটি নখের আঁচড়ের (Claw) মতো আলোকসজ্জার নকশাকে নতুনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গাড়ির রঙেও এসেছে পরিবেশবান্ধব পরিবর্তন। Peugeot জানিয়েছে, রঙের ফিনিশে বিশুদ্ধ অ্যালুমিনিয়ামের পরিবর্তে পুনর্ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছে। উচ্চাভিলাষী প্রযুক্তিতে ভরা গাড়িটির এটি একটি ছোট বিষয়। তবে নতুন কাঁচামালের ব্যবহার কমানোর জন্য শিল্পজুড়ে যে প্রচেষ্টা চলছে, তার সঙ্গে এই উদ্যোগ মানানসই।
গাড়িটির ভেতরের কাঠামোয় রয়েছে Factorial Energy-এর সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি সলিড-স্টেট ব্যাটারি। মাত্র ১১০ মিলিমিটার পুরু এই ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ১,০০০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক স্থাপত্য। Peugeot-এর দাবি, গাড়িটি একবার চার্জে সর্বোচ্চ ৩৭৩ মাইল বা ৬০০ কিলোমিটার চলতে পারবে। আর ব্যাটারির চার্জ ১০ থেকে ৮০ শতাংশে তুলতে লাগবে মাত্র ১০ মিনিট।
প্রতি ১০০ কিলোমিটারে ১১.৫ kWh বিদ্যুৎ খরচের লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে কোম্পানিটি। ৫০০ hp ক্ষমতার একটি স্পোর্টস কুপের জন্য এটি বেশ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। গাড়িটির অ্যারোডাইনামিক গড়ন এবং পাতলা ব্যাটারি বিদ্যুৎ খরচ কম রাখতে সাহায্য করবে। তবে Peugeot এখনও জানায়নি, শক্তি পেছনের চাকায় পৌঁছাবে, নাকি চারটি চাকাতেই। ফলে গাড়িটি চালানোর অভিজ্ঞতা কেমন হতে পারে, সেই বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর একটি এখনো অজানা।
কেবিনে Peugeot-এর পরবর্তী প্রজন্মের i-Cockpit-এর সম্ভাব্য রূপ দেখানো হয়েছে। এর মূল আকর্ষণ Hypersquare স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যার সঙ্গে রয়েছে স্বচ্ছ Micro LED ডিসপ্লে। কেন্দ্রীয় ডিসপ্লেটি বন্ধ করে ড্যাশবোর্ডের মধ্যে অদৃশ্য করে ফেলা যায়। এমন এক সময়ে এই ব্যবস্থা বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়, যখন গাড়ির কেবিনগুলো ক্রমেই ইলেকট্রনিকসের দোকানের মতো হয়ে উঠছে।
Hypersquare-এ ব্যবহার করা হয়েছে স্টিয়ার-বাই-ওয়্যার প্রযুক্তিও। প্রচলিত ব্যবস্থায় স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও চাকার মধ্যে যান্ত্রিক সংযোগ থাকে। এখানে তার বদলে ইলেকট্রনিক সিস্টেম স্টিয়ারিংয়ের অনুপাত ও প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। পরবর্তী প্রজন্মের E-208-এও একই স্টিয়ারিং ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। RCZ Vision-এ আরও রয়েছে ব্রেক-বাই-ওয়্যার প্রযুক্তি, যেখানে প্রচলিত হাইড্রোলিক সংযোগের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবহৃত হয়।
Peugeot-এর দাবি, এই কনসেপ্টে হাত না রেখেও গাড়ি চালানোর সুবিধাসহ Level 2++ স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। তবে এখানে দেখানো অন্যান্য প্রযুক্তির মতো এটিও উৎপাদিত গাড়িতে আদৌ পাওয়া যাবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।
কেবিনে চারজনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। ভেতরে ব্যবহার করা হয়েছে Alcantara, পুনর্ব্যবহৃত চামড়া এবং নিখুঁতভাবে খোদাই করা অ্যালুমিনিয়াম। এর সঙ্গে রয়েছে হালকা নীল রঙের সমন্বয়। পেছনের আসন দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে লাগেজ রাখার জায়গা বাড়াতে সেগুলো ভাঁজ করে রাখা যাবে। এমনকি ফরাসি ঘড়ি নির্মাতা SERICA-এর সঙ্গে তৈরি একটি ঘড়িও রয়েছে এতে।
RCZ Vision-এ পুরোনো দিনের স্পোর্টস কুপের অনুপাতের সঙ্গে এমন কিছু প্রযুক্তি মিশিয়েছে, যা Peugeot-এর ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারে। সলিড-স্টেট ব্যাটারি, উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং স্টিয়ার-বাই-ওয়্যার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সবই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। অন্যদিকে, ডাবল-বাবল ছাদ ও পেশিবহুল বডিওয়ার্ক গাড়িটিকে মূল RCZ-এর সঙ্গে একটি দৃশ্যমান যোগসূত্রে বেঁধে রেখেছে।
কিন্তু এসবের মধ্যে সেই পরিচিত সমস্যাটিও রয়ে গেছে। Peugeot এখনও নিশ্চিত করেনি যে RCZ Vision গাড়িটি আদৌ উৎপাদনে আসবে কিনা। সুতরাং আপাতত এটি একটি নকশাবিষয়ক গবেষণা, ক্রেতাদের কাছে গাড়ি বাজারে আনার প্রতিশ্রুতি নয়।
বিষয়টি হতাশাজনক। মূল RCZ বাজারে ব্যবহারিক গাড়ির আধিপত্যের মাঝে আলাদা কিছু উপহার দিয়েছিল। এর একটি বৈদ্যুতিক উত্তরসূরি Peugeot-কে এমন সময়ে স্বতন্ত্র একটি মডেল দিতে পারত, যখন অনেক বৈদ্যুতিক গাড়িকেই দেখতে প্রায় একই রকম লাগে। প্রযুক্তিটি ব্যয়বহুল হতে পারে, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা অনিশ্চিত হতে পারে এবং উৎপাদনের চ্যালেঞ্জও কম নয়। কিন্তু ঠিক এই কারণেই তো এমন কনসেপ্ট উৎপাদনে আনা হয়।
আপনি যদি ইউরোপীয় গাড়ি বা ফরাসি নির্মাতাদের বিচিত্র সব পরীক্ষানিরীক্ষার অনুরাগী না হন, তাহলে সম্ভবত Peugeot RCZ-এর নামকখনও শোনেননি। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত Peugeot-এর জন্য Magna Steyr-এর তৈরি নজরকাড়া এই কুপে এমন এক সময়ে বাজারে এসেছিল, যখন অধিকাংশ গাড়ি নির্মাতাই প্রতিটি গাড়িকে হয় পারিবারিক হ্যাচব্যাক, নয়তো SUV-তে পরিণত করতে নেশায় আক্রান্ত ছিল।